স্লোয়ার ডেলিভারি: ছলনার শৈল্পিক কৌশল

ক্রিকেটের জন্মলগ্ন থেকেই খেলাটির এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে ফাস্ট বোলিং। ক্রিকেটের সৌন্দর্যপিপাসুদের কাছে ফাস্ট বোলিং একটি শিল্পের নাম। একজন ফাস্ট বোলার তার গতি ও বাউন্স দিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন! ক্রিকেট মাঠে এর চাইতে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে?

খুব বেশিদিন আগের কথাও না; যখন টেস্ট ক্রিকেটের পাশাপাশি সীমিত ওভারেও ফাস্ট বোলারদের মূল অস্ত্র ছিল গতি, সুইং, বাউন্সার, ইয়র্কার, কন্সিস্টেন্ট লাইন অ্যান্ড লেন্থ আর অ্যাগ্রেসন। আলাদা কোন ভ্যারিয়েশনের দরকার পড়ত না। তবে দিন বদলানোর সাথে সাথে খেলাটির ধরনও বদলে যেতে থাকে। ওয়ানডে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক প্রসার ও টি-টোয়েন্টি’র প্রভাবে খেলাটি ক্রমশ ব্যাটসম্যান কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফাস্ট বোলিংয়ের সহজাত শক্তিমত্তার জায়গাগুলো ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়তে শুরু করে।

শর্ট বাউন্ডারি, বিগ ব্যাট, ফ্রি হিট, পাওয়ার-প্লে আর ইম্প্রোভাইজেশনের এই যুগে ব্যাটসম্যানরা এখন আগের চেয়ে অনেক সাহসী। ঝুঁকিপূর্ণ ক্রস ব্যাটেড শটে তারা এখন অনেক বেশি সাবলীল ও দক্ষ। ফাস্ট বোলারদের ফেস করা নিয়ে তাদের মনে যে একটা ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ ছিল সেটা এখন আর নেই।

আজকাল সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পিচ বলতে আমরা বুঝি নিখাদ ‘ব্যাটিং স্বর্গ’। যেখানে বোলারদের বিশেষ করে পেসারদের জন্য ‘সাহায্য’ বলতে কিছুই থাকে না। বোলারদের আক্রমণের চাইতে বরং নিজেদের আত্মরক্ষা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। এরকম কন্ডিশনে ফাস্ট বোলারদের প্রধান সম্পদ ‘গতি’ই হয়ে দাঁড়ায় উল্টো সর্বনাশের কারণ। গতির উন্মত্ততা দিয়ে ব্যাটসম্যানকে আর যখন বেঁধে রাখা যায় না, তখন প্রয়োজন পড়ে গতিটাকে কমিয়ে আনার। গতি কমাতে গিয়েই আবিষ্কৃত হয় বোলিংয়ের নিত্য নতুন কলাকৌশল। রানের নেশায় মত্ত ব্যাটসম্যান গতির কাছে হার না মানলেও হার মানে গতিবৈচিত্র‍্যের ছলনাময়ী চাতুর্যের কাছে।

ফাস্ট বোলারদের ‘স্লোয়ার ডেলিভারি’ এক প্রকার ডিসেপ্টিভ আর্ট। এটা বোলারদের জন্য একদিকে যেমন আত্মরক্ষার উপায়, আবার অন্যদিকে ব্যাটসম্যানকে ধোঁকা দিয়ে ভুল শট খেলিয়ে আউট করার কৌশলও বটে। একটা নিখুঁত স্লোয়ার বল তাই যেকোন মুহূর্তে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। ব্যাটসম্যানকে বোকা বানানোর অস্ত্র হিসেবে আধুনিক ক্রিকেটে স্লোয়ার বলের কোন বিকল্প নেই।

আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ফাস্ট বোলারদের ‘সারপ্রাইজ এলিমেন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত স্লোয়ার বলের বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন এবং সেগুলোর ব্যবহার।

  • রিডাকশন ইন দ্য স্পিড অব অ্যাকশন

স্লোয়ার ডেলিভারি দেয়ার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে ক্লাসিক এবং সহজবোধ্য টেকনিক। নিয়মটা হল, একজন ফাস্ট বোলার স্বাভাবিকভাবে রানআপ থেকে প্রথমে তার ডেলিভারি স্ট্রাইডে ঢুকে মোমেন্টাম গেইন করবেন, কিন্তু বল রিলিজের ঠিক আগমুহূর্তে তার বোলিং আর্মের ‘রোটেশন স্পিড’ খানিকটা স্লো করে দিবেন যেন বলটা ব্যাটসম্যানের কাছে দেরিতে পৌঁছায়। ব্যাপারখানা অনেকটা স্লো মোশন একশন রিপ্লে’র মত।

আধুনিক ক্রিকেটে স্লোয়ার বলের এই টেকনিকের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। নব্বইয়ের দশকের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এই ডেলিভারিটি জনপ্রিয় করেছিলেন সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গ্রেট কোর্টনি ওয়ালশ ও কার্টলি অ্যাম্ব্রোস।

  • স্লো অফ কাটার

ফাস্ট বোলিংয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ভ্যারিয়েশনের নাম ‘স্লো অফ কাটার’। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের পেসাররা ব্যাপক হারে এর ব্যবহার প্রচলন করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কপিল দেব, আকিব জাভেদ, ইমরান খান ও মনোজ প্রভাকর। আর ইংলিশ কাউন্টিতে সর্বপ্রথম ‘অফ কাটার’ ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছিলেন ক্যারিবিয়ান পেসার ফ্রাংকলিন স্টিফেনসন।

অফ কাটার বোলিংয়ের কার্যকারিতা নির্ভর করে বলের লাইন এন্ড লেংথ এবং পিচের কোয়ালিটির ওপর। অমসৃন, শুকনো ও ধুলোময় ফাটল ধরা পিচে ‘অফ কাটার’ খেলা অত্যন্ত কঠিন। একদম স্পিনারদের মতই বল গ্রিপ করে সেখানে।

‘স্লো অফ কাটার’ দেখতে অনেকটা ফিঙ্গার স্পিনারদের ‘অফ ব্রেক’ বোলিংয়ের মতই; পার্থক্য কেবল গ্রিপিং এবং আর্ম স্পিডে। ফাস্ট বোলিংয়ে আর্ম স্পিড থাকে অনেক হাই; পাশাপাশি বলের গ্রিপও স্পিনারদের তুলনায় ‘লুজ’ থাকে যেন ঠিকমতো বলটা রিলিজ করতে সুবিধা হয়।

সাধারণ ‘সিম আপ’ ডেলিভারি ও অফ কাটারের গ্রিপের মধ্যে পার্থক্য হল দুই আঙুলের অবস্থানগত দুরত্ব। সাধারণ সিম আপ’ ডেলিভারির ক্ষেত্রে তর্জনী ও মধ্যমা থাকে সিমের ওপর; প্রায় একসাথে জোড়া লাগানো অবস্থায়। অন্যদিকে অফ কাটার দেয়ার নিয়ম হল, তর্জনী থাকবে সিম বরাবর, কিন্তু মধ্যমা থাকবে সিম থেকে অন্তত দুই সেন্টিমিটার দূরে। বল রিলিজের সময় আঙুলের মুভমেন্ট হবে বাম থেকে ডানে নিচের দিকে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকে।

ফলে বলটা পড়ার পর ডানহাতি ব্যাটসম্যানের অফ থেকে লেগের দিকে ‘হরাইজন্টাল অ্যাক্সিস’ বরাবর সাইড স্পিন করবে অর্থাৎ সাধারণ অফ ব্রেকের মতই আচরণ করবে।

অফ ব্রেকের মত অতটা টার্ন না করলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অফ কাটারের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘চেঞ্জ অফ পেসের’ সাথে ‘সাটল মুভমেন্ট অফ দ্য পিচ’ এবং বাউন্সের তারতম্যের কারণে বিশেষত ডেথ ওভারে ‘অফ কাটার’ অত্যন্ত কার্যকরী একটি ভ্যারিয়েশন।

খুব অল্প সংখ্যক বোলারই আছেন যারা অফ কাটার বোলিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মধ্যে অফ কাটার ইউজ করে বিভিন্ন সময়ে যাঁরা সফলতা অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে ফ্রেড ট্রুম্যান, স্যার রিচার্ড হ্যাডলি, ওয়াকার ইউনুস, গ্লেন ম্যাকগ্রা, ওয়াসিম আকরাম, ক্রিস কেয়ার্নস, ল্যান্স ক্লুজনার, ব্রেট লি ও মুস্তাফিজুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শ্রীলঙ্কার লাসিথ মালিঙ্গা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডোয়াইন ব্রাভো, ও বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও দারুণ অফ কাটার দিতে পারেন।

মুস্তাফিজ আবার একই সাথে ‘ফাস্ট’ এবং ‘স্লো’ দুই ধরনের অফ কাটার দিতে পারেন। নিখুঁত অফ কাটারের সাথে বুদ্ধিদীপ্ত গতির পরিবর্তন; কখনো স্লোয়ার কখনও ফাস্টার পেস ভ্যারিয়েশন যা মুস্তাফিজের কাটারকে করেছে অন্য সবার চেয়ে আলাদা; আরো ভয়ংকর।

মুস্তাফিজুর রহমানের অফ কাটারের গ্রিপও অন্য সবার চেয়ে আলাদা; সিম পজিশন থাকে কিছুটা স্ক্র‍্যামবলড অবস্থায়। মুস্তাফিজের সাফল্যের মূলে রয়েছে ওর কব্জির নমনীয়তা। বল রিলিজের ঠিক আগমুহূর্তে কব্জির মোচড়ে বলটাকে স্কুইজ/ফ্লিক করেন তিনি।

  • স্লো লেগ কাটার

অফ কাটারের মত লেগ কাটারও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দারুণ এক সংযোজন। ক্রিকেটে এর ব্যবহার বহু পুরনো হলেও এটা জনপ্রিয়তা পায় মূলত আশি-নব্বই দশকের দিকে।

লেগ ব্রেকের সাথে নামের মিলের মত লেগ কাটারের মেকানিজমেও রয়েছে যথেষ্ট মিল। রিস্ট স্পিনারদের স্টক ডেলিভারি ‘লেগ ব্রেকের’ ন্যায় লেগ কাটারের মুভমেন্টও লেগ থেকে অফের দিকে।

অফ কাটারের তুলনায় লেগ কাটার আয়ত্ত করা বেশ কষ্টসাধ্য। ঠিক একই কারণে অফ স্পিনের তুলনায় লেগ স্পিন শেখা কঠিন।

লেগ কাটার করার নিয়ম হল, মধ্যমা থাকবে বলের সিমের ওপর আর তর্জনীর অবস্থান হবে সিম থেকে অন্তত দুই সেন্টিমিটার দূরে। বল রিলিজের সময় আঙুলের মুভমেন্ট হবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে অর্থাৎ ডান থেকে বামে।

ফলে বলটা পড়ার পর ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের লেগ থেকে অফের দিকে ‘হরাইজন্টাল এক্সিস’ বরাবর সাইড স্পিন করবে অর্থাৎ সাধারণ লেগ ব্রেকের মতই আচরণ করবে।

অফ কাটারের মত লেগ কাটারও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বিশেষত ডেথ ওভারে দারুণ ইফেক্টিভ একটি ভ্যারিয়েশন।

লেগ কাটার বোলিং ব্যবহারের শুরুটা হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে ফজল মাহমুদ, অ্যালেক বেডসারদের হাত ধরে। আর তাদের সেই প্রচেষ্টাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন আশির দশকে ডেনিস লিলি ও ম্যালকম মার্শালরা। পরবর্তীকালে ক্রিস হ্যারিস, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ, আব্দুল রাজ্জাক, মুনাফ প্যাটেল, জেমস ফকনার, আবুল হাসান রাজুরাও লেগ কাটার ব্যবহারে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

  • ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড স্লোয়ার বল

সম্ভবত স্লোয়ার ডেলিভারি দেয়ার সবচাইতে কঠিন উপায় এই ‘ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড’ টেকনিক। ‘ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড’ থেকে রিলিজ করা হয় বলে এই বলটিকে অনেক সময় ‘কুইকার গুগলি’ নামেও ডাকা হয়। অবশ্য গুগলির মত টার্ন করে না এটি।

এই ডেলিভারি ছোঁড়ার নিয়ম হল, বলটাকে সাধারণ ‘সিম-আপ’ ডেলিভারির মতই ধরতে হবে কিন্তু রিলিজের সময় আর্ম থাকবে ‘টুইস্টেড’ অবস্থায় যেন হাতের তালু ব্যাটসম্যানের দিকে মুখ করে থাকে। ডেলিভারি স্ট্রাইড ও আর্মের ‘রোটেশন স্পিড’ একই থাকবে। বলের রিলিজ দেরিতে হওয়ায় বলটা ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছবে একটু দেরিতে।

ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড’ স্লোয়ার বলের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হল এর ‘সাডেন ডিপ’ করার ক্ষমতা। ‘ডিপ’ বলতে ওপর থেকে নিচে আচমকা পড়ে যাওয়া বুঝায়। ফলে ফ্লাইটেড অবস্থায় বলের হাইট অনুমান করাটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ব্যাটসম্যান একে ফুলটস ভেবে ভুল করে বসে, কিন্তু বলটা হঠাৎ ‘ডিপ’ করার কারণে ব্যাটের নিচ দিয়ে স্টাম্পে আঘাত হানতে পারে। এই ধরনের বলের বিপক্ষে তাই ‘হরাইজন্টাল’ কিংবা ‘ক্রস ব্যাটেড’ শট খেলা খুবই বিপজ্জনক।

‘ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড’ স্লোয়ার ডেলিভারির উদ্ভাবক অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্যাপ্টেন স্টিভ ওয়াহ। আর এই বোলিংকে রীতিমতন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার আরেক মিডিয়াম পেসার ইয়ান হার্ভে।

পরবর্তীতে রানা নাভিদ, ক্লিন্ট ম্যাকাই, জেড ডার্নবাখ, ড্যানিয়েল ক্রিশ্চিয়ান, জেমস ফকনার, টাইমাল মিলস, টম কুরান, মোহিত শর্মা, নুয়ান কুলাসেকারা, থিসারা পেরেরাসহ অনেকেই এই ডেলিভারিটি সফলতার সাথে ব্যবহার করেছেন।

  • ডিপ ইন দ্য ফিঙ্গার গ্রিপ

ফাস্ট বোলিংয়ের কনভেনশনাল ‘টিপ অফ দ্য ফিঙ্গার গ্রিপের’ থেকে ‘ডিপ ইন দ্য ফিঙ্গার গ্রিপ’ কিছুটা আলাদা। এটা করার নিয়ম হল, বলটাকে এমনভাবে ধরতে হবে যেন সেটা আঙুল ও হাতের তালুর মাঝখানে অবস্থান করে। ছড়িয়ে থাকা তিন আঙুলের (ইনডেক্স, মিডল ও রিং ফিঙ্গার) সমন্বয়ে গ্রিপ হবে বেশ টাইট, তবে আর্ম স্পিড একই থাকবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বলের রিলিজ পয়েন্টকে স্লো করে দেয়া।

বিশেষ ধরনের এই বলটির কার্যকারিতা অনেকটা ‘ব্যাক অফ দ্য হ্যান্ড স্লোয়ার বলের মতই। এটাও ফ্লাইটেড অবস্থায় স্টাম্পের কাছে গিয়ে আচমকা ডিপ করতে পারে।

‘ডিপ ইন দ্য ফিঙ্গার’ স্লোয়ার ডেলিভারির জন্য বিখ্যাত ছিলেন সাবেক অজি ফাস্ট বোলার ব্রেট লি। পাকিস্তানের আব্দুল রাজ্জাক ও শোয়েব আখতারকেও এটা নিয়মিতই করতে দেখা গেছে। তবে স্লোয়ার বলের এই ভ্যারিয়েশনটি এখন আর দেখা যায় না বললেই চলে।

  • স্প্লিট ফিঙ্গার গ্রিপ

নব্বই দশকে ক্রিকেটের সেরা উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে ‘স্প্লিট ফিঙ্গার বল’ অন্যতম। স্পেশাল এই ডেলিভারির উদ্ভাবক সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক অ্যাডাম হোলিওক। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফলতা লাভের দিক থেকে কৃতিত্বটা শ্রীলংকান পেসার দিলহারা ফার্নান্ডোর প্রাপ্য। ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে এটা করে দেখিয়েছেন গ্লেন ম্যাকগ্রাও।

স্প্লিট ফিঙ্গার বলের আরেক নাম ‘স্পাইডার’। অসাধারণ এই ডেলিভারিটি করার নিয়ম হল, নরমাল ‘সিম আপ’ ডেলিভারির মতই সিম পজিশন থাকবে স্ট্রেট কিন্তু এক্ষেত্রে তর্জনী ও মধ্যমার মাঝে যথেষ্ট ফাঁক থাকবে। তার মানে দুই আঙুল সিমের দুইদিকে ‘স্প্লিট’ অর্থাৎ দ্বিধাবিভক্ত অবস্থায় থাকবে। ফলে একই আর্ম স্পিডে বলটার রিলিজ কিছুটা দেরিতে হবে যা ব্যাটসম্যানের পক্ষে খালি চোখে পিক করা এককথায় অসম্ভব।

‘স্প্লিট ফিঙ্গার গ্রিপ’ টেকনিকটি আয়ত্ত করা কঠিন বলে এখনকার যুগের পেসারদের মধ্যে তেমন একটা জনপ্রিয় নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এর ব্যবহার একেবারেই কদাচিৎ।

  • নাকল বল গ্রিপ

স্লোয়ার ডেলিভারির জগতে সাম্প্রতিক সংযোজন এই নাকল ডেলিভারি। নাকল বল গ্রিপের টেকনিকটা এসেছে মূলত বেসবল থেকে। ক্রিকেটে নাকল বলের আবিষ্কারক সাবেক প্রোটিয়া ফাস্ট বোলার চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট।

তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাকল বলের ব্যবহারে সর্বপ্রথম কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন ভারতীয় পেসার জহির খান। ২০১১ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মাইক হাসি এবং ফাইনালে চামারা কাপুগেদারাকে একই ধরনের চমৎকার দুটো ‘নাকল ডেলিভারি’ দিয়ে আউট করেছিলেন জহির।

নাকল বলের গ্রিপিংয়ের কায়দাটা বড়ই অদ্ভুত; কিছুটা অস্বাভাবিকও বটে। সিম আপ বোলিংয়ের প্রচলিত নিয়মানুসারে, একটা বলকে গ্রিপ করতে হয় সোজা অবস্থায় আঙুলের অগ্রভাগের সাহায্যে। কিন্তু নাকল বলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আঙুল সোজা রাখার পরিবর্তে বলটাকে ধরা হয় আঙুল ভাঁজ করা অবস্থায় (ক্রুকড ফিঙ্গার); ‘নাকল’ কিংবা ‘ফিঙ্গার জয়েন্ট’ দ্বারা। এখানে নাকলের সাহায্যে বলকে শক্তভাবে স্কুইজ করা হয় অর্থাৎ চেপে ধরা হয়।

নাকল বলের বৈশিষ্ট্য হল, এটা স্টাম্পের কাছে গিয়ে আচমকা ডিপ করবে এবং পড়ার পরে ‘স্কিড’ করবে। নাকল বল একই সাথে ‘ডিসেপ্টিভ’ এবং ‘ডিফিকাল্ট টু হিট’। জহির খান নাকল বলের গ্রিপটাকে নন বোলিং হ্যান্ডের (ডান হাত) দ্বারা লুকিয়ে রাখতেন যেন ব্যাটসম্যান বুঝতে না পারে।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আবির্ভাবের পর অনেক বোলারই নাকল বল গ্রিপ ইউজ করতে আরম্ভ করেছেন। এদের মধ্যে শ্রীলঙ্কার নুয়ান কুলাসেকারা, অস্ট্রেলিয়ার এন্ড্রু টাই, কেন রিচার্ডসন, ইংল্যান্ডের ম্যাট কোল, ভারতের ভুবনেশ্বর কুমার, জসপ্রীত বুমরাহ অন্যতম।

  • স্লো বল ইয়র্কার

এটা আসলে নরমাল ইয়র্কার বলেরই ‘স্লোয়ার ভার্সন’। প্রথম দেখায় ফুলটস মনে হওয়া বলটাই যখন স্টাম্পের কাছে গিয়ে আচমকা ডিপ করে তখন সেটাকে ‘স্লো বল ইয়র্কার’ বলে। এটা আসলে স্লো বলের নির্দিষ্ট কতকগুলো ভ্যারিয়েশনের একটা এন্ড রেজাল্ট মাত্র যা ওপরের আলোচনায় ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে।

ওপরের আলোচনায় উল্লিখিত ব্যাক অফ দ্য হ্যান্ড স্লোয়ার বল, নাকল বল, স্প্লিট ফিঙ্গার, ডিপ ইন দ্য ফিঙ্গার গ্রিপ ইত্যাদি স্লো বলের ভ্যারিয়েশনগুলো যদি ইয়র্কার লেংথে পড়ে তখনই সেটাকে স্লোয়ার বল ইয়র্কার বলা হবে।

ক্রিকেটে স্লো বল ইয়র্কারের সর্বপ্রথম কার্যকর প্রয়োগ দেখিয়েছিলেন ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ খ্যাত সাবেক গতিতারকা শোয়েব আখতার। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ‘আনএক্সপেক্টেড’ এই ডেলিভারি দিয়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন শোয়েব।

স্কিলের বিচারে বর্তমান যুগের দুই টি-টোয়েন্টি স্পেশালিষ্ট ডোয়াইন ব্রাভো এবং লাসিথ মালিঙ্গাকে মনে করা হয় স্লো বল ইয়র্কারের মাস্টার।

  • স্লো বল বাউন্সার

‘স্লো বল বাউন্সার’ জিনিসটাও সাধারণ ফাস্ট বাউন্সারেরই একটি স্লোয়ার ভার্সন মাত্র। বোলারের রানআপ, আর্ম একশন ও ফলোথ্রু একই থাকবে, বলও আসবে একই হাইটে কিন্তু ১০-১৫ কি.মি. কম স্পিডে। এই ‘সাটল চেঞ্জ অব পেস’ এর কারণেই খেলতে গিয়ে ব্যাটসম্যান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

নাম দেখেই বুঝতে পারছেন স্লো বল বাউন্সার একটা লেংথ নির্ভর ডেলিভারি। বলটাকে অবশ্যই শর্টার লেংথে ফেলতে হবে। একে বলা যেতে পারে ‘হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড’ ডেলিভারি। সঠিক উচ্চতায় বলটাকে ওঠাতে না পারলে সোজা ভাষায় এটা একটা ‘মারার বল’।

স্লো বল বাউন্সারের জন্য আলাদা কোন গ্রিপ নেই। অনেক বোলার অনেকভাবে এটা করে থাকেন। সেগুলোর মধ্যে অফ কাটার গ্রিপ, স্প্লিট ফিঙ্গার গ্রিপ, ডিপ ইন দ্য ফিঙ্গার গ্রিপ এবং ক্রস সিম গ্রিপ উল্লেখযোগ্য।

স্লো বল বাউন্সার আয়ত্ত করা অত্যন্ত কঠিন। শুকনো, অমসৃন উইকেট অর্থাৎ যেখানে বল পড়ার পর কিছুটা হোল্ড এবং গ্রিপ করে, সেসব জায়গায় স্লো বল বাউন্সার অধিক কার্যকর। ঠিকমত ইউটিলাইজ করতে পারলে ‘ডেথ ওভার’ বোলিংয়ে এর চাইতে কার্যকরী অস্ত্র আর কিছু হতে পারে না। উইকেটে না ফেলতে পারলেও একটি মূল্যবান ‘ডট বল’ ঠিকই আদায় করা সম্ভব।

স্লোয়ার বল বাউন্সারের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক প্রি-মেডিটেটেড শট খেলতে গেলে ভুল/ মিসহিটের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, বোলারের অ্যাকশন দেখে আগেভাগে এটাকে পিক করবার কোন উপায়ই নেই।

বিশ্ব ক্রিকেটে ‘স্লো বল বাউন্সার’ ব্যবহারে যারা ইতিমধ্যেই পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে স্টুয়ার্ট ব্রড, ব্রেট লি, ডোয়াইন ব্রাভো, আন্দ্রে রাসেল, লাসিথ মালিঙ্গা, প্যাট কামিন্স, কেন রিচার্ডসন, কেসরিক উইলিয়ামস, ক্রিস মরিস, বিউরান হেনড্রিক্স উল্লেখযোগ্য।

বাটারফ্লাই বল

বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশি পেসার রুবেল হোসেন মিডিয়ার সামনে বলেছিলেন তার শেখা নতুন একটা ‘পেস ভ্যারিয়েশন’ নিয়ে। যেটার নাম বলা হয়েছিল ‘বাটারফ্লাই’! ২০১১ সালের বিশ্বকাপের আগে একই কথা শোনা গিয়েছিল আরেক পেসার শফিউল ইসলামের কন্ঠে। যদিও, সেসবের বাস্তব প্রয়োগ আজ পর্যন্ত চোখে পড়ে নি।

মজার ব্যাপার হল, বাটারফ্লাই বলের আবিষ্কারক একজন নারী! ইংল্যান্ডের মিডলসেক্স কাউন্টি দলের হয়ে খেলা ২৪ বছর বয়সী নারী ক্রিকেটার ক্যাথরিন ডাল্টন সম্প্রতি এটা উদ্ভাবন করেছেন।

বাটারফ্লাই বলের কার্যকারিতা অনেকটা ‘ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড’ স্লোয়ার বলের মতই। এর আবিষ্কারক মিস ডাল্টনের মতে, বলটা প্রজাপতির (বাটারফ্লাইয়ের বাংলা অর্থ প্রজাপতি) মত বাতাসে ভাসবে কিন্তু পাথরের মত টুপ করে হঠাৎ নিচে পড়বে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত কোন বোলার এটা ব্যবহার করেছে বলে জানা যায়নি। তবে টেকনিক্যালি যেহেতু এটা পসিবল, তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের ডেলিভারি দেখার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।