স্যার ডন ‘সবার সেরা’ ব্র্যাডম্যান

ক্রিকেট সম্পর্কে যারা খানিকটা খোঁজখবর রাখেন তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে? তবে কোনো প্রকার চিন্তা ভাবনা ছাড়াই তাদের উত্তর হবে স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান। কেননা এই উত্তরটি দেবার জন্য কোনো মহাপণ্ডিত হবার প্রয়োজন নেই।

টেস্ট ক্রিকেটে কোনো ব্যাটসম্যানের গড় ৫০ ছুঁলেই রীতিমতো সেরা ব্যাটসম্যানদের কাতারে চলে যায় একজন। আর সেই টেস্ট ক্রিকেটেই ব্র‍্যাডম্যানের গড় ৯৯.৯৪! তাই স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যানকে শুধুমাত্র সেরা ব্যাটসম্যানের উপমা দিলে এক প্রকার অপরাধই হবে হয়ত কেননা তিনি শুধুমাত্র নিজের সময়ের একজন সেরা ব্যাটসম্যানই ছিলেন না বরং তিনিই এখন পর্যন্ত সর্বকালের সেরা!

  • টেস্ট ক্রিকেটে ব্র‍্যাডম্যানের বিবর্ণ সূচনা

১৯২৮ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যানের। তাঁর পুরো ক্যারিয়ার যতোটা রঙিন ঠিক ততোটাই যেন ধূসর ছিল টেস্ট অভিষেক ম্যাচটি। প্রথম ইনিংসে ১৮ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১ রানেই সাজঘরে ফিরতে হয়েছিল সেবার। নিজের এমন দুর্দিনে অস্ট্রেলিয়াকেও হারতে হয়েছিল ৬৭৫ রানের বিশাল ব্যাবধানে! ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় পরের ম্যাচে দল থেকে ছিটকে পরতে হয়েছিল ব্র‍্যাডম্যানকে।

এমন মলিন সূচনার পর কেউ কি তখন আদৌ কল্পনা করতে পেরেছিল একদিন এই ব্র‍্যাডম্যানই ৯৯.৯৪ গড়ে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানিবেন? তবে সেই সিরিজেই সবাইকেই খানিকটা আঁচ করাতে পেরেছিলেন ব্র‍্যাডম্যান। প্রথম টেস্টের পর সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে থাকলেও পরের টেস্টগুলোতে আবারো দলে জায়গা পান তিনি। তবে এবার সুযোগের সদ্ব্যবহারই করেছিলেন বটে। প্রথম ম্যাচসহ সিরিজের বাকি ম্যাচগুলো মিলিয়ে ৬৬.৮৬ গড়ে মোট ৪৬৮ রান করেছিলেন তিনি। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

টেস্ট ক্রিকেটের এক বিরল প্রতিভার নাম ডন ব্র‍্যাডম্যান‚ অথচ ১৯২৮ সালে অভিষিক্ত এই ক্রিকেটারের দীর্ঘ ২০ বছরের ক্যারিয়ারে খেলেছেন কেবল ৫২ টি টেস্ট ম্যাচ! সংখ্যার বিচারে একদম সামান্যই বলা যায়। তবে এর পেছনের মূল কারণটি হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫)! যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে হয়ত ব্র‍্যাডম্যানের ব্যাট দিয়ে লেখা হয়নি অসংখ্য রেকর্ডের কথা‚ ক্রিকেট বিশ্ব হয়ত দেখেনি অবিশ্বাস্য কিছু ভুতুড়ে ইনিংস।

৫২ টি টেস্ট খেললেও ব্যাট হাতে মাঠে নেমেছিলেন ৮০ টি ইনিংসে। আর এই ৮০ ইনিংসেই ৯৯.৯৪ গড়ে ২৯টি শতক এবং ১৩টি অর্ধশতকে করেছেন ৬৯৯৬ রান! টেস্ট ক্রিকেটে ২৯টি সেঞ্চুরি করা হয়ত অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে এ আর এমন কি? কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখবো এই ২৯টি শতক হাঁকাতে তিনি সময় নিয়েছেন কেবল মাত্র ৫২টি ম্যাচ! যা এখন পর্যন্ত সকল ক্রিকেটারের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। এমনকি এর ধারে কাছেও কোনো খেলোয়াড় ঘেঁষতে পারেন নি।

একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান লক্ষ্য করা যাক‚ টেস্টে সবথেকে বেশি শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যানটির নাম শচীন টেন্ডুলকার। শচীন টেন্ডুলকার তার টেস্ট ক্যারিয়ারে যতগুলো টেস্ট ইনিংস খেলেছেন তার মাঝে ইনিংসগুলোকে সেঞ্চুরিতে রুপান্তরের পরিমান ১৫.৫০ পার্সেন্ট।অন্যদিকে ব্রাডম্যানের ৩৬.২৫ পার্সেন্ট। ডাবল সেঞ্চুরির দিক দিয়েও এই পরিসংখ্যানে তিনি সবার উপরে যা ১৫ পার্সেন্ট। অন্যদিকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শ্রীলংকার কুমার সাঙ্গাকারা যা ৪.৭২ পার্সেন্ট। ব্যবধান দেখলেই বোঝা যায় টেস্ট ক্রিকেটে রীতিমতো ঈশ্বর ছিলেন স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান।

  • ব্র‍্যাডম্যানের অতিদানবীয় কিছু কীর্তি

– টেস্ট ক্রিকেটে এক সিরিজে ৮০০+ রান করা চাট্টিখানি কথা নয়।টেস্ট ক্রিকেটে এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা কেবল মাত্র ৯জন। এর মধ্যে অন্য কোনো ক্রিকেটারই কাজটি একাধিকবার করতে পারেন নি। অথচ স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান তিন তিনবার এই রেকর্ড গড়েন।

– টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ট্রিপল সেঞ্চুরি হয়েছে ৩০টি। যার মাঝে কেবল মাত্র চারজন খেলোয়াড় পুরো ক্যারিয়ারে দু বার করে ট্রিপল সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন। এই চারজনের মাঝে অন্যতম হলেন স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান। তবে এক দিক থেকে এই চারজনেরও সেরা তিনি। কেননা তিনি মাত্র এক দিনের মাঝেই একবার ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিলেন। যা অন্য কোনো ক্রিকেটার আজ পর্যন্ত করতে পারেন নি। তাছাড়া ব্র‍্যাডম্যানই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি কিনা ২৯৯ রান করে অপরাজিত ছিলেন।

– ১১ জুলাই, ১৯৩০ তারিখে লডসে অনুষ্ঠিত এশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেটের ইতিহাসে পাঁচ ব্যাটসম্যানের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে মধ্যাহ্নবিরতীর পূর্বেই সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন। অন্যরা হচ্ছেন –  ভিক্টর ট্রাম্পার( ১৯০২)‚ চার্লি ম্যাককার্টনি (১৯২৬)‚ মজিদ খান (১৯৭৬) এবং ডেভিড ওয়ার্নার (২০১৬)।

  • সম্মাননা

স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান তার জীবদ্দশায় বেশ কিছু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যেমন ১৯৪৯ সালে অর্জন করেছিলেন সম্মানসুচক ‘নাইটহুড’। তাছাড়া উইজডেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পুরস্কারটি তিনি একাই দশবার এবং অন্যদিকে গ্যারি সোবার্স পুরষ্কারটি আটবার লাভ করেছিলেন। যা অন্য কোন খেলোয়াড়ই তিনবারের বেশি লাভ করতে পারেননি। ২০০০ সালে শতাব্দীর সেরা অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড দলে তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ক্রিকেট বিশ্বের এই মহাতারকা ২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সমস্ত ক্রিকেট ভক্তদের কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান। তবে রেখে গিয়েছেন অমর কিছু কীর্তি। যা কোনো ক্রিকেটারের পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব হবে কি না তা সত্যিই অজানা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।