স্মৃতি || ছোটগল্প

জলিল সাহেব গিয়েছিলেন বন্ধুর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেতে। উঠানে প্যান্ডেল করে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জলিল সাহেব চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে পড়লেন প্রথম কাতারেই। এসব বিয়ের ঝামেলা থেকে যত দ্রুত পারা যায় কেটে পড়াই উদ্দেশ্য। খাওয়া শুরু হলো।

কিছুক্ষণ পর একদম গায়ে গা ঘেষে পাশের চেয়ারে বসে মুরগির ঠ্যাং চিবুনো লোকটা জলিল সাহেবের দিকে তাকিয়ে পরিচিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘কি ব্যাপার ভাই, সেদিন দাবা খেলায় হারলেন না জিতলেন?’

কথাটার অর্থ বুঝতে জলিল সাহেবের কয়েক মুহুর্ত সময় লাগলো। তারপর পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কিসের দাবা খেলা? আমি তো কিছুই বুঝছিনা। আর আমি কি আপনাকে চিনি?’

লোকটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, ‘না আপনি আমাকে চিনেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। এইতো গত শুক্রবার আপনি আপনার বন্ধু অলোক নাথের ড্রয়িংরুমে বসে তার সাথে দাবা খেলছিলেন মনে আছে? আমি তখন একটা কাজে অলোক নাথ সাহেবের কাছে গেছিলাম। সেখানে আপনাকে দেখেছি। কিন্তু আপনি দাবা খেলায় এতোটাই মনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন যে আমার দিকে খেয়াল করেননি।’

– ‘হ্যা, সেটা হতে পারে। একবার দাবা খেলার ভেতরে ঢুকে পড়লে আমি আর আশেপাশে মনোযোগ দিতে পারি না। কিন্তু ওয়েট ওয়েট, আমি তো গত শুক্রবার কেন, অন্তত একমাস অলোকের বাসায় যাইনি। এমনকি আমি কখনো তার বাসায় দাবা খেলেছি বলেও তো মনে পড়েনা।’

– ‘আরে নাহ, আমার স্পষ্ট মনে আছে আপনাকেই দাবা খেলতে দেখেছি। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন।’

– ‘সেটা তো হওয়ার কথা না। আমার স্মৃতিশক্তি যথেষ্ট ভালো। আপনি অন্য কাউকে দেখেননি তো? জলিল সাহেবের কন্ঠে সন্দেহ।’

– ‘উহু আমার কোনো ডাউট নেই সেটা আপনি ছিলেন।’ লোকটা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। ‘আপনার এই কাচাপাকা গোফ, টাক মাথা, এতো সহজে কি করে ভুলি? তাছাড়া ঐদিন রাতেই আবার আপনার সম্পর্কে আপনার বন্ধুর সাথে কথা হলো। আপনি যে সরকারি কলেজের কেমিস্ট্রি প্রফেসর আর অনেকদিন পর বন্ধুর বাসায় দাবা খেলতে গিয়েছিলেন সেদিন সেটাও আপনার বন্ধু জানালো।’

জলিল সাহেব এবং অপরিচিত লোকটার মধ্যে সেদিনকার কথোপকথন ঐ পর্যন্তই স্থগিত ছিলো। বাসায় আসার পর রাতে হঠ্যাৎ করেই বিষয়টা উনার মাথায় পাকাপোক্ত ভাবে আসন গেড়ে বসলো। মাত্র এক সপ্তাহ আগের কথা এইভাবে উনি বেমালুম ভুলে যাবেন সেটা তো হতেই পারে না। উনার নিজের স্মৃতিশক্তির উপর যথেষ্ট ভরসা। ছোটবেলার অনেক কথাও মনে আছে স্পষ্ট। আচ্ছা লোকটা কোনো ধান্ধাবাজ টাইপের কেউ না তো? আন্দাজে ঢিল ছুড়েছে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে। বিষয়টা মনের মধ্যে কাটার মতো বিধতে লাগলো। পুরো রাত ঘুম হলো না ঠিকমতো জলিল সাহেবের।

পরদিন সকালে হঠ্যাৎ করে মনে পড়লো, আরেহ! প্রতি শুক্রবার বিকালে তো উনি কলেজের একটা দরিদ্র ছেলেকে ফ্রিতে টিউশন দেন। এবং উনার মনে হচ্ছে গত শুক্রবারেও ছেলেটাকে পড়িয়েছিলন। তার কাছে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। কলেজে গিয়ে জালাল সাহেব ছেলেটাকে খুঁজে বের করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘গত শুক্রবারে পড়তে এসেছিলে?’

ছেলেটা উনার দিকে অবাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে বললো, ‘না স্যার, আপনিই তো বললেন শনিবারে আসতে। শুক্রবারে কোন বন্ধুর বাসায় আপনার দাবা খেলার দাওয়াত ছিলো।’

– ‘আচ্ছা ঠিক আছে যাও, ছেলেটাকে বিদায় করে দিয়ে জালাল সাহেব গভীর চিন্তায় পড়লেন। সেই লোকটা তো সত্যিই বলেছিলো মনে হচ্ছে। তাইলে মাত্র একসপ্তাহ আগের ঘটনা উনার মস্তিষ্ক থেকে এইভাবে মুছে গেলো কেন? উনি কি পাগল হয়ে যাচ্ছেন?’

জলিল সাহেব পরপর দু’দিন দু’রাত বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করে কাটালেন। কিন্তু কোনোভাবেই দাবা খেলার ঘটনা মনে করতে পারলেন না। তারপর হঠ্যাৎ করে একটা সন্দেহ হলো। এমনও তো হতে পারে যে ছাত্রকে আসতে মানা করলেও পরে উনি কোনো কারনে দাবা খেলতে যাননি। এজন্য মনে করতে পারছেন না। আচ্ছা সেটা তো অলোকনাথের কাছে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। নিজের বোকামির জন্য নিজেরই লজ্জা লাগলো। এই সিম্পিল ব্যাপারটা মাথায় আসলো না এদ্দিন।

ফোন করলেন অলোক নাথকে, ‘আচ্ছা অলোক গত শুক্রবারের কথা তোমার মনে আছে?’

ওপাশ থেকে বলা হলো, ‘হ্যা ঐ যে তুমি দাবা খেলতে আসলে ঐদিনের কথা তো? মনে থাকবেনা কেন? কি হয়েছে, কিছু ভুলে রেখে গেছ নাকি আমার এখানে?’

জালাল সাহেব ‘না’ সূচক উত্তর দিয়ে ফোন রেখে দিলেন।

এখন উনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন যে কোনো এক বিচিত্র উপায়ে পুরো একটা বিকালের স্মৃতি উনার মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে। উনি খুব সম্ভবত পাগল হয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপারটা নিয়ে প্রচুর টেনশন করছেন। শেষপর্যন্ত ভাবলেন ডাক্তার দেখাবেন।

তবে তার আগেই হঠ্যাৎ করে মাথায় একটা চিন্তা আসলো। মনে পড়লো অনেকদিন আগে উনি সত্যজিৎ রায়ের একটা ছোটগল্প পড়েছিলেন। যেটাতে কয়েকজন মিলে এক বন্ধুকে বোকা বানানোর জন্য একটা কাল্পনিক ঘটনা সৃষ্টি করে। তারপর সবাই মিলে বন্ধুকে সেই ঘটনার কথা বলে বোকা বানায়। আর বন্ধু ভাবে তার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। আচ্ছা অলোক নাথ তাঁর সাথেও এমন কোনো গেম খেলছে না তো? ভাবলেন পরদিন বিকালেই অলোক নাথের বাসায় গিয়ে ঘটনা খোলাসা করবেন।

সেদিন রাতে অনেকদিন পর একটু ঠিকমতো ঘুম হলো জালিল সাহেবের। স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার চিন্তায় গত একসপ্তাহ নির্ঘুম কাটানোর পর এই ঘুমটা খুব দরকার ছিলো উনার শরীরের জন্য। পরদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে কলেজে যাচ্ছিলেন। পথে বাসে এক অপরিচিত লোকের সাথে দেখা হলো। উনার পাশের সিটেই বসা।

লোকটা জলিল সাহেবের দিকে তাকিয়ে পরিচিত ভঙ্গিতে মুচকি একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি ব্যাপার ভাই, কিছু মনে পড়েছে?’

জলিল সাহেব জানতে চাইলেন, ‘কিসের কথা বলছেন?’

– ‘আরেহ, আপনি গত শুক্রবারের আগের শুক্রবারে আপনার বন্ধুর বাসায় দাবা খেলতে গেছিলেন, সেকথা যে ভুলে গেছেন বেমালুম।’

– ‘হ্যা শুক্রবার বিকালেই গেছিলাম, আর সেকথা আমি কেন ভুলবো? আপনি কে মশাই বলুনতো?’

লোকটা অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বললো, ‘আমার সাথে তার পরে শুক্রবার আপনার বন্ধু আজাদ সাহেবের মেয়ের বিয়েতে দেখা হলো। আপনাকে আমি দাবা খেলার কথা জিজ্ঞেস করলাম। আপনি বললেন মনে নেই।’

জলিল সাহেব মাথা নাড়লেন, ‘আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি গত শুক্রবারে কোথাও বিয়ে খেতে যাইনি। আর আমার বন্ধু আজাদের বাসায় তো যাওয়া হয়না সে বছরখানেক হলো। আমি আপনাকে চিনিনা ভাই। কখনো দেখিওনি কোথাও!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।