স্মিথদের মত যদি মাশরাফিরাও ‘বিদ্রোহ’ করতেন!

সমঝোতা অনুযায়ী ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার রাজস্ব আয়ের ২৭.৫ শতাংশ পাবেন ক্রিকেটাররা। আগামী পাঁচ বছরে ৪৫৯ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাওয়ার নিশ্চয়তা ক্রিকেটাররা পেয়েছেন। বোর্ডের রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে অন্তত ১.৬৭ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। আরও বেশিও হতে পারে, কম হওয়ার শঙ্কা নেই।

‘ক্রিকেটাররা’ মানে চুক্তিতে থাকা ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক সব ক্রিকেটার। রাজস্ব ভাগাভাগির মডেল থাকছে, তাতে আগের মতই ঘরোয়া ক্রিকেটাররাও অন্তর্ভুক্ত থাকছে। পাশাপাশি ভাগটা বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে আগের চেয়ে।

নতুন চুক্তি হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা পাবেন অস্ট্রেলিয়ার সব দলীয় খেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক!

মেয়েদের পারিশ্রমিক আগে ছিল ৭৫ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এখন সেটি বেড়ে হতে যাচ্ছে পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ডলার!

গত এক জুলাই থেকে চুক্তির বাইরে ছিল ২৩০ জনের বেশি ক্রিকেটার। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া জোর দিয়ে বলছিল, নতুন চুক্তি হলেও আর পেছনে ফিরে চুক্তিবিহীন সময়টায় পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না ক্রিকেটারদের। সেই অবস্থান থেকেও সরতে বাধ্য হয়েছে বোর্ড। নতুন চুক্তি হলেই আগের চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক দেওয়া হবে হারানো সময়টায় জন্য!

রাজস্ব ভাগাভাগি মডেল টিকে থাকল, বরং আরও বাড়িয়ে নেওয়া হলো। যাদের জন্য এত আন্দোলন, সেই ঘরোয়া ক্রিকেটাররাও চুক্তিতে থাকলেন এবং বেশি পাচ্ছেন। মেয়ে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ল অবিশ্বাস্য রকম। চুক্তিবিহীন সময়ের পে-ব্যাকও পাওয়া হচ্ছে। সমঝোতায় ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের জয়জয়কার!

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মূল চাওয়া ছিল যেটি, ঘরোয়া ক্রিকেটারদের রাজস্বের ভাগ না দিয়ে সেই টাকা তৃণমুল ক্রিকেটে বিনিয়োগ করা, সেটিরও একটি উপায় বের হয়েছে। ১৬৭ কোটির ওপরে বোর্ডের রাজস্ব হবে (যেটি হবে বলে একরকম নিশ্চিত), সেটি থেকে ১৯ শতাংশ নেবেন ক্রিকেটাররা। বাকিটা তৃণমূলে যাবে। মানে নিজেদের বাড়তি ভাগ থেকে তৃণমূলে দিচ্ছেন ক্রিকেটাররা। আগামী পাঁচ বছরে যেটি হতে পারে দুই কোটি ৫০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত।

মজার ব্যাপার হলো, ক্রিকেটারদের সমপরিমাণ অর্থ বোর্ডও দেবে তৃণমূলে। সেই অর্থের জোগানটা তারা দেবে আগামী পাঁচ বছরে বোর্ডের প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে!

চুক্তি বিতর্কে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভাবমূর্তিতে টান পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান যেভাবে হয়েছে, সেটায় আরও একবারও প্রমাণিত হয়েছে, ক্রিকেট আর ক্রিকেটাররাই সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; বোর্ড কর্তারা নয়, হাওয়াই কথার ফুলঝুরি নয়। প্রমাণ হয়েছে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের জন্য অন্যরা, অন্য সব কিছু!

নিউজটা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, বাংলাদেশে যদি এমন হতো! এই যে জাতীয় ক্রিকেটারদের বেতন জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম, প্রতিবারই ঢাকা লিগে ক্রিকেটাররা টাকা-পয়সা পুরো পায় না, প্রথম শ্রেণির চুক্তিতে ক্রিকেটার সংখ্য কমানোই হচ্ছে কেবল, পুরোপুরি বাদ দেওয়ার ভাবনাও আছে!

আমাদের ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন ‘কোয়াব’ যদি এতটা শক্তিশালি হতো, যদি সবাই এভাবে এককাট্টা হতো, তাহলে কেমন হতো? অন্তত মাঝারি মানের ক্রিকেটারদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় পড়তে হতো না, পয়সার জন্য বোর্ডে বা নানান অফিসে ধর্ণা দিতে হতো না, নিজের ন্যায্য টাকা চাইতে গিয়ে কাচুমাচু হতে হতো না।

ভাবছিলাম, যদি এমন হতো, প্রতি সফরে বোর্ড পরিচালকরা পাঁচ হাজার ডলার হাত খরচ না নিয়ে সেই টাকায় মেয়েদের জাতীয় লিগে ম্যাচ ফি ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০০ করা হতো! যদি বিসিবির প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে তৃণমূলে খরচ করা হতো! কিংবা কিছুই না কমিয়ে, যত আয় বোর্ডের হয়, তার যতটুকু ক্রিকেটের উন্নয়নে ব্যয় করার কথা, ততটা অন্তত করা হতো; তাহলে?

মাঠে আজ একজনের সঙ্গে এমনিই ভাবনাটা বলছিলাম, যদি এমন হতো! শুনে তিনি কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘আস্তে বলেন, এসব শুনলে স্টেডিয়ামের গেটের ওই পাথরের মূর্তি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে পারে, বিসিবি অফিসের ইট-প্লাস্টার খসে পড়তে পারে!’

পুনশ্চ:

বোর্ড বা ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন নিয়ে কী বলব, টাকা বাড়ানোর দাবীতে আন্দোলন করলে, আন্তর্জাতিক সিরিজ বয়কটের মত অবস্থা হলে, সবার আগে ফুঁসে উঠবে আমাদের জাগ্রত ক্রিকেটপ্রেমী জনতা। ক্রিকেটারদের মাধ্যমে বোর্ড যে আয় করে, সেই টাকার ন্যায্য ভাগ ক্রিকেটাররা দাবী করতেই পারে। প্রফেশনাল ব্যাপার। কিন্তু আমরা মুখে পেশাদারীত্বের কথা বললেও আদতে পেশাদারীত্বের মা-বাপ করে ছাড়ব। দেশপ্রেমের ধুয়া তুলে ক্রিকেটারদের দেশদ্রোহী বানিয়ে ছাড়ব। ক্রিকেটাররা তখন বলতে বাধ্য হবে, ‘মা-জননী ছাইড়া দ্যাও, বাপজান ছাইড়া দ্যাও, আমরা কাইন্দা বাঁচি’!

ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।