স্বাধীনতার স্বপ্নে উড়াল দেওয়া সুপারহিরো

‘সুপারহিরো’ – এই শব্দটার সাথে আমরা কমবেশি পরিচিত। হলিউডের বিস্তর অ্যাকশন, থ্রিলার সিনেমার সৌজন্যে পর্দার নায়কদের আমরা সুপারহিরো বলে মনে করি। অথচ, আমাদের বাস্তবেই সত্যিকারের কিছু সুপারহিরো আছেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন অনেক সত্যিকারের সুপারহিরো ছিলেন যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, শহীদ হয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান। তিনি নিজের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য অনেকের মত নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে।

২০ আগস্ট ১৯৭১ শুক্রবার। সকাল ১১.১৫ মিনিট।

পাকিস্তানি পাইলট রশিদ মিনহাজ টি-থার্টি থ্রি জঙ্গি বিমান ব্লু বার্ড ১৬৬ বিমানের সামনের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসছে। মতিউর তখন হাত তুলে বিমান থামালেন, হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বিমানের পাখায় সমস্যা।

রশিদ মিনহাজ বিমানের ‘ক্যানোপি’ খুলতেই মতিউর তাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে লাফিয়ে বিমানের পেছনের সিটে উঠে বসলেন। তবে জ্ঞান হারাবার আগে মিনহাজ বলে ফেললেন, ‘আই হ্যাভ বিন হাইজ্যাকড’।

এরপর অজ্ঞান রশিদকে পেছনে ঠেলে বিমানটিকে দ্রুত ভারত সীমান্তের দিকে নিতে চাচ্ছিলেন মতিউর রহমান। উদ্দেশ্য একটাই, নিজের মাতৃভূমির জন্যে লড়াই করা। ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার শব্দ শুনতে পেল।

বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতিউর বিমান নিয়ে ছুটে চললেন। রাডারকে ফাঁকি দেবার জন্য নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন তিনি। যদিও ততক্ষণে এফ ৮৬ ও একটি হেলিকপ্টার তাঁকে ধাওয়া করা শুরু করে কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশে।

বিমানটি যখন ভারতীয় সীমান্তের দিকে যাচ্ছে তখন রশিদের জ্ঞান ফিরে আসে ও সে বাঁধা দিতে চেষ্টা করে। একপর্যায়ে রশিদের সাথে মতিউরের হাতাহাতি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রশিদ ইজেক্ট সুইচ টিপলে মতিউর রহমান বিমান থেকে ছিটকে যান।

প্যারাশুট না থাকায় সীমান্ত থেকে মাত্র দুই মিনিট দূরত্বে সিন্ধু প্রদেশের জিন্দা গ্রামে বালির ঢিবির উপর আছড়ে পড়েন তিনি এবং সাথে ব্লু বার্ড ১৬৬ বিমানটিও। হারিয়ে যান মতিউর চিরদিনের জন্য।

মতিউরের বিমান হাইজ্যাকের স্বপ্ন সফল হলো না। এরপর মতিউর রহমানের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং কোন প্রকার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া মসরুর বিমান ঘাঁটিতে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে মতিউরের মৃতদেহ দাফন করা হয় এবং তার কবরের সমাধি ফলকে পাকিস্তানিরা লিখে রেখেছিল – ‘ইয়াহা সো রাহাহে এক গাদ্দার!’ ২০০৬ সালে তার দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।

মতিউর রহমানের স্বাধীনতার স্বপ্ন অবশ্য পূরণ হয়েছিল। তিনি দেখিয়ে গেলেন স্বাধীনতার স্পৃহা মানুষকে কি পরিমান দুঃসাহস এনে দেয়। শুভ জন্মদিন দা ব্রেভ হার্ট বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।