সৌম্য ২.০

এক ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে ২৬ অক্টোবর ২০১৮। ব্যবধানটা ঠিক কতদিনের?

সৌম্য সরকারকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে যাবেন না। এক ক্রিকেটারের জীবনের যাবতীয় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, প্রশংসা-কুৎসা, সমর্থন-গালাগাল, সব অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছেন মাঝের এ সময়কালেই। তিনি তাই উত্তর করতেই পারেন, ‘ব্যবধান? অনন্তকাল!’

মোটে এক ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের পেস-সুইংকে কাবু করেছিলেন, একের পর এক কাভার ড্রাইভে, কাটে মুগ্ধ করেছিলেন তাবৎ দুনিয়াকে। এক নতুন বাংলাদেশের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসেডর-ই যেন হয়ে গিয়েছিলেন, যে বাংলাদেশ ‘ভয়ডরহীন ক্রিকেট’ খেলে।

বিশ্বকাপ কাঁপিয়ে ফিরে কাঁপিয়েছিলেন পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তার ব্যাটেই তো লেখা হয়েছিলো দৈত্যবধের কাব্য, রচিত হয়েছিলো দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সফলতম বছর।

মুদ্রার উল্টোপিঠও দেখেছিলেন খুব সহসাই। ২০১৬-সালের টি-২০য়ের রমরমা মৌসুমে সেই যে তার রঙ হারানোর শুরু, তারপরে আর ব্যাট হাসেনি বহুদিন। মাঝেমাঝে হুটহাট আয়ারল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর এসে হাজির হয়েছিলো বটে, ৮০-ঊর্ধ্ব কিংবা চল্লিশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেওছিলেন হুটহাট। সমর্থকদের মনে আশাও জাগিয়েছিলেন, ‘এই বুঝি ফর্মে ফিরলেন!’ কিন্তু সে আশা হতাশায় মিলিয়ে যেতে সময় লেগেছিলো আর একটি ম্যাচ-ই।

সাধারণ দর্শক হতে শুরু করে ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট, তার খারাপ সময়ের দোলায় দুলেছেন বোধহয় সবাই। একজন ব্যাটসম্যান রান পাচ্ছেন না, তাকে বাদ দেয়াটাই নিয়ম। কিন্তু সাবেক কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে এই নিয়মের বিরুদ্ধচারণ করেছেন বহুদিন। রান না করেও অবলীলায় সুযোগ পেয়েছেন দলে। হাতুরুসিংহের ভাষায়, ‘এমন ট্রু স্পোর্টসম্যানকে সু্যোগ দেয়াই যায়।’

তার জন্যে কোচকে জনতার শুলে চড়তে হয়েছে বেশ ক’বার। নির্বাচক প্যানেলে বেঁধেছে দ্বন্দ্ব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়েছে লেখালেখি, টেলিভিশনে হয়েছে আলোচনা, তার চেয়েও বেশি সমালোচনা। মাঝখানে গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন সৌম্য। কখনো ওপেনিং, কখনো সাত নম্বরে নেমেছেন, রান আর পাননি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দল থেকে বাদ পড়েছেন, কিছু না করেই দলে ফিরেছেন, আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। খেলা দেখতে দেখতে ক্রিকেটবোদ্ধাদের কখনো বোধহয় এমনও মনে হয়েছে, ‘সৌম্য! ফুরিয়ে গিয়েছেন।’

আজকের ম্যাচের আগেও কত নাটকীয়তা। জাতীয় লিগে ভালো খেলছিলেন, তার ফল পেলেন প্রস্তুতি ম্যাচে ডাক পেয়ে। ভালো খেললেন সেখানেও। যেই সৌম্যকে মনে হচ্ছিলো গ্রিক রূপকথার কোনো চরিত্র, সেই সৌম্যের দেখা যেন নির্বাচকেরা পেয়ে গেলেন সেদিন বিকেএসপির মাঠে। ফলাফল? ঘরোয়া চারদিনের ম্যাচের মাঝপথে স্কোয়াডে ডেকে আনা হলো তাকে। নিয়মবিরুদ্ধ বলবেন? কিংবা নিয়মলঙ্ঘন? সৌম্যের বেলায় বরাবর যে সেটাই নিয়ম হয়ে এসেছে। তার আগে কোন বাংলাদেশি ওপেনারকেই-বা এমন দুর্দমনীয় ভঙ্গিতে দেখা গিয়েছে!

প্রথম বলটা মাঝ ব্যাটেই লাগলো, দ্বিতীয় বলে খুললো রানের খাতা। প্রথম চার এলো পঞ্চম বলে, খুব সম্ভবত হারানো আত্মবিশ্বাসটাও। সমর্থকেরাও বোধহয় নড়েচড়ে বসেছিলেন। বহুদিন বাদে সেই কাট শটের দেখা মিললো যে!

এর আগের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও লোপ্পা হাফভলি বল পেয়েছিলেন, গ্যালারির বদলে যার স্থান হয়েছিলো ফিল্ডারের হাত। এবারে আর আগের ভুল করেননি। লাইন-লেংথে বরাবরই অধারাবাহিক ছিলেন জিম্বাবুয়ের বোলাররা, তার পূর্ণ ফায়দা নিয়েই হাঁকিয়েছেন একের পর এক বাউন্ডারি। খেয়াল করুন, ওভার বাউন্ডারি নয়। প্রথম ছক্কা ৫৪তম বলে, ফিফটিতে পৌঁছুতে। কাইল অ্যাবোটকে মারা সেই ছক্কার কথা আপনি-আমিই ভুলিনি, সৌম্য নিজে ভোলেন কি করে! ছক্কাটি যে ওই একই পথে! এর চেয়ে রাজসিক ভঙ্গিতে নিজের পুনর্জাগরণের বার্তা দেয়া বোধকরি সম্ভব হতো না।

ফিফটি করার পথে কিছু প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন। ডানহাতি অফ স্পিনে তার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো বাদ পড়ার সময়ে। জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজার মুখোমুখি হওয়া ২১ বলে ২২ রান তুলে সে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। রাজাকে দুটো ছয় যেমন মেরেছেন, ১০ সিঙ্গেলও নিয়েছেন।

তেমনি প্রশ্ন উঠেছিলো, প্রান্ত বদলে খেলতে পারেন না সৌম্য সরকার। এর আগে খেলা ৩৩ ইনিংসে যে ১০০০ রান করেছিলেন, তার মাঝে ৬৯২-ই এসেছিলো কেবল চার আর ছয় হতে, শতকরা হিসেবে যা ৬৯.২ শতাংশ। প্রথম পঞ্চাশ পেরোতে তাই ২৬ বার বাইশ গজ দৌড়েছেনও। দলে জায়গা হারিয়ে যে ভালোই কাজ করেছেন, তা বোঝাতেই যেন।

ফিফটির আগের পর্ব যদি হয় নিজেকে নতুন করে পরিচিত করবার কাব্য, তো তার পরের পঞ্চাশ নিশ্চিতভাবেই সেই সৌম্যের গল্প। মিড উইকেট আর লং অনের মাথার উপর দিয়ে অনায়াসে বল উড়িয়েছেন। টাইমিং তার বড় শক্তি, ওয়েলিংটন মাসাকাদজাকে টানা দুই ছক্কা মারার সময় সে প্রমাণ দিয়েছেন। বারেবারে স্পিন বলে সামনে এগিয়েছেন। উইকেটের দু’পাশে প্রতিমুহূর্তেই সিঙ্গেল নিয়েছেন, ৮১ বলে সেঞ্চুরি করেছেন। গ্যালারিতে বহুদিন বাদে ধুয়া তুলতে বাধ্য করেছেন, ‘সৌম্য! সৌম্য!’ ২৮৭ রানের লক্ষ্যকে মামুলি বানিয়ে ছেড়েছেন, যেমন বানিয়েছিলেন ২০১৫ সালটায়।

নিজেকে যেবার প্রথম চিনিয়েছিলেন, সেবারও এমন বিশ্বকাপের আগের বছরটাই ছিলো। এমনই শেষ ওয়ানডে-ই ছিলো, এমন ওয়ান ডাউনেই নেমেছিলেন। মিল এখানেই শেষ নয়, সেবারও প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়েই ছিলো।

এখন তো বলতে হচ্ছে, সেবারও এমন সৌম্য-ই ছিলেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।