আমি ‘সো কলড’ ভদ্র ঘরের সন্তান

আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। ধরেন, আজকে আমার টাকার দরকার, মাসে গোটা হাজার পাঁচেক। কিন্তু সেটার জন্য আমি যদি আমার হাতের কাছেই অ্যাভেইলেবল একটা কাপড় বা মোবাইলের শো রুমে পার্ট টাইম সেলসম্যানশিপ করতে চাই সেটা করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

কেন? কারণ আমি সো কলড ‘ভদ্রঘরের’ ‘বড়ঘরের সন্তান’… আমাকে হয় এই বয়সেও বাপের কাছে হাত পেতে থাকতে হবে। অথবা টিউশনি, ফ্রিল্যান্সিং, ইন্টার্নশিপ জাতীয় ‘স্ট্যাটাসের সাথে যায়’ টাইপ ‘সফেসটিকেটেড’ জব খুজতে হবে। কার, ‘যে কোনো কিছু’ আমি করতে পারব না, আমার আর্থিক টানাপোড়েনের চেয়ে আমার ‘পরিবারের সম্মান’কেই আমাকে এগিয়ে রাখতে হবে।

অনেক ছেলেমেয়েকে টিউশনিটাও পর্যন্ত করতে দেয়া হয়না! ‘ভদ্রঘরের মেয়েরা রাত আটটার পর বাড়ির বাইরে থাকে না’ বা ‘তুই আমার পোলা/মাইয়া হয়া বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়াবি?’ জাতীয় কথা বলা এই বাবা মা গুলা সবাই যে একেবারে লাখপতি কোটিপতি তাও না। সন্তানের স্বাবলম্বনের চেয়ে তাদের ‘ফ্যামিলি স্ট্যাটাস’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা টেকনিক্যাল কাজকর্ম শিখতে চাই না! থিওরিটিক্যাল শিখতে চাই না, পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটগুলা, যেখানে হাতে কলমে সত্যিকারের কাজ শিখানো হয়, যারা পড়ে তাদের বলি ক্ষ্যাত-ছোটলোক। একেবারে যারা কোথাও চান্স পায়না, বা যারা এতটাই গরিব যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সামর্থ্য নেই তারা না পারতে পলিটেকনিকে পড়ে!

আর বাকি বিপুলসংখ্যক সো কল্ড ‘বড় ঘরের’ ছেলেমেয়েগুলাকে পাঠান হয় পাবলিক ভার্সিটি আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে গজায়ে উঠা প্রাইভেট ভার্সিটিগুলাতে সিএসই, ট্রিপলই, বিবিএ পড়াতে! বাবা-মায়েরা লাখ লাখ টাকা অকাতরে খরচ করবে ছেলেমেয়েগুলাকে এক গাঁদা থিওরি মুখস্ত করে পরীক্ষার হলে ঝেড়ে দিয়ে একটা স্ট্যান্ডার্ড সিজিপিএ নিয়ে একটা টেকনিক্যাল লেভেলের জ্ঞানশূন্য কর্পোরেট গাধা বানানোর জন্য!

অথচ লাগার সময় সবচেয়ে বেশী লাগে কিন্তু ওই ফিল্ড লেভেলের কাজই, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ না!

১৮ কোটির ম্যান পাওয়ারের সবাই কর্পোরেট টেবিলে বসে হুকুম দিলে গ্রাউন্ডওয়ার্ক করার মানুষকে থাকবে! – এই সামান্য ব্যাপারটা আমাদের মাথাতেই আসে না।

আমাদের সহজ হিসাব, ‘স্ট্যাটাস’ – পড়তে হবে সেটা যেটা ‘ফ্যামিলি স্ট্যাটাসের সাথে যায়’। যেটায় একটা ‘সম্মানজনক চাকরি’ পাওয়া যায়। সেটা না যেটা প্রয়োজন বা ইচ্ছা। না হলে সম্মান থাকবে না, বা ‘সমাজ ভালো চোখে নিবে না’।

চারুকলার ট্যাবুটা আজও গেল না। ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ছেলেমেয়েরা আজও উচ্ছন্নে যাওয়া বখে যাওয়াই থেকে গেল। শখ করে ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া পড়তে যাবা? তোমার শখ ইচ্ছা বা নেসেসিটির কোন মুল্য নাই! তখনও শুনতে হবে – ‘চাকরি কই করবা?’ ‘মানুষ কি বলবে?’

স্ট্যাটাস… সম্মান… ভদ্র ঘর… বড় ঘর… সফেসটিকেশন… হ্যান্ডসাম চাকরি… স্যালারি… লোকে কি বলবে… – এসব কিছুর মাঝে আমরা আটকে আছি। একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর বাইরে গিয়ে আমরা ভাবতেই পারি না, স্বপ্ন দেখা তো অনেক দূরের কথা।

আমাদের তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট একটা দেশের মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মারা এসব নিয়া যত চিন্তা করে, ততটা মাথাব্যাথা ইংল্যান্ড আমেরিকার ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেনদেরও নেই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।