সেলুলয়েডে মহান মুক্তিযুদ্ধ: নির্মাতারা কতটা সফল?

বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই দেশের মানুষের আবেগ ও অনুভূতি একটু বেশিই। স্বৈরাচারী পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে আমাদেরকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পেয়েছি আমাদের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

একজন বাঙালি হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেশের আপামর জনতা সব সময়ই হৃদয়ের গভীরে লালন করেন। তেমনি প্রতিটি শিল্পী তার নানা কাজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন ভিন্নমাত্রায়। আমাদের গণমাধ্যমও এর ব্যতিক্রম নয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যেমন

আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছে তাদের নানা পরিবেশনার মাধ্যমে, তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশ বেতার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় পরিবেশন করেছে নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে। পাশাপাশি একই অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বিশেষ করে আমাদের টিভি নাটকে মুক্তিযুদ্ধকে অনেক যত্নের সাথে তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। তবে, আমাদের অহংকারের মুক্তিযুদ্ধকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যম হিসেবে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে দেশীয় চলচ্চিত্র।

বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা এগারো জন’। স্বাধীনতার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির অধিকাংশ কলাকুশলী ছিলেন সদ্য মুক্তিযুদ্ধ ফেরত বাংলার সূর্যসন্তান। দর্শক টান টান উত্তেজনা নিয়েই উপভোগ করেছে ছবিটি। এ ছাড়াও ১৯৭২ সালেই মুক্তি পায় সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ছবিটিতে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের প্রতি সহিংসতা দেখানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের তান্ডবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সবাই তখন পর্দায় উপভোগ করে তাদের কীর্তিগাঁথা।

১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’, যৌথ প্রযোজনার এই ছবিটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। এই বছরেই মুক্তি পায় খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’। যুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ জীবনে

ফিরে এসে দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত হওয়ার আহ্বান করা হয়েছে এ ছবিতে। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নারায়ন ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’, দর্শকনন্দিত এই ছবিটিতে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট বেশি প্রাধান্য ছিল। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় হারুনুর রশীদ পরিচালিত ‘মেঘের অনেক রং’, ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রসহ পাঁচটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

ওরা এগারো জন

 

১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় আলমগীর কবিরের আরেকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি সিনেমা ‘রুপালী সৈকতে’। এছাড়া সত্তরের দশকেই নির্মিত হয় ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, এস আলীর ‘বাঙালির ছাব্বিশ বছর’,মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’, আনন্দের ‘কার হাসি কে হাসে’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘সংগ্রাম’ সহ বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা।তবে এইগুলোর বেশিরভাগই দূর্বল নির্মানের কারনে সমালোচিত হয়েছিল।

সত্তরের দশকের প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মানের আগ্রহ দেখা গেলেও ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে,যার রেশ আশির দশকেও বহমান থাকে।এই সময়ে মুক্তি পায় শহিদুল হক খানের ‘কলমি লতা (১৯৮১) ও মতিন রহমানের ‘চিৎকার’ (১৯৮২) নামে মাত্র দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা! তাও ছবিদুটি সেভাবে আলোচিত হতে পারেনি।

নব্বইয়ের দশকে এসে বেশ কিছু গুণী চলচ্চিত্রকার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ ভালো কিছু  চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। প্রায় এক যুগ পর ১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় ‘একাত্তরের যীশু’। ছবিটির কাহিনী নেয়া হয়েছিল শাহরিয়ার কবিরের একটা উপন্যাস থেকে।

নিজের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে হুমায়ূন আহমেদ। নির্মান করেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘আগুনের পরশমণি’। দর্শকপ্রিয় ও প্রশংসিত এই ছবিটি ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়। জুরি বোর্ডের রায়ে ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট ৮টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। তানভীর মোকাম্মেল ১৯৯৫ সালে নির্মান করেন ‘নদীর নাম মধুমতি’। ‘সর্বমহলে প্রশংসিত এই ছবিটি একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার ও লাভ করে। সেলিনা হোসেনের আলোচিত উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তৃতীয় ছবি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’।

দর্শকনন্দিত ও প্রশংসিত এই ছবিটিও একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৯৭ সালেই মুক্তি পায় খান আতাউর রহমানের শেষ সিনেমা ‘এখনো অনেক রাত’। মুক্তিযুদ্ধের এই ছবিটিতে সেন্সরবোর্ড কাঁচি কেটেছিল। জুরি বোর্ডের রায়ে ছবিটি একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে বেশকিছু ছবি নির্মিত হয়, এর মধ্যে কাজী হায়াতের দাঙ্গা (১৯৯১), সিপাহি (১৯৯৪), মুহম্মদ হান্নানের বিক্ষোভ (১৯৯৪), উত্তম আকাশের মুক্তির সংগ্রাম (১৯৯৫), সোহানুর রহমান সোহানের আমার দেশ আমার প্রেম(১৯৯৭) উল্লেখযোগ্য। তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯) ছবিটি ছিল মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ১৯৬০ এর দশকের দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপট নিয়ে,ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট সাতটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

আগুনের পরশমনি

২০০০ পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের দুরবস্থায় ও বেশকিছু প্রশংসিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।২০০২ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। ছবিটিতে মুক্তিযুদ্ধ ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটে উঠেছিল, এই ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের অস্কারযাত্রা শুরু হয়। ২০০৪ সালে মুক্তি পায় তিনটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা। আমজাদ হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে তৌকির আহমেদ নির্মান করেন ‘জয়যাত্রা’।

সর্বমহলে প্রশংসিত এই ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট সাতটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।হুমায়ূন আহমেদ নির্মান করেন ‘শ্যামল ছায়া’। জনপ্রিয় এই ছবিটি বাংলাদেশের হয়ে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের চতুর্থ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘মেঘের পরে মেঘ’। আলোচিত এই ছবিটি ১ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র ‘খেলাঘর’। এতে মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি দেখানো না হলেও, যুদ্ধের উত্তাপ ছিল প্রতি মুহূর্তে। মাহমুদুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম, একই বছর রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস নিয়ে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মান করেন ওনার পঞ্চম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধ্রুবতারা’।পরিচালকদের মধ্যে উনি সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মান করেন।

বীরশ্রেষ্ট মতিউর রহমানের জীবনী নিয়ে খিজির হায়াত খান ২০০৭ সালে নির্মান করেন ‘অস্তিত্বে আমার দেশ’। এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে আরো কিছু চলচ্চিত্র নির্মান হয় এর মধ্যে শাহজাহান চৌধুরীর উত্তরের ক্ষেপ (২০০০), দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর বীর সৈনিক (২০০৩), শহিদুল ইসলাম খোকনের লাল সবুজ(২০০৫), তানভীর মোকাম্মেলের রাবেয়া (২০০৮) অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ১৯৬৯ এর প্রেক্ষাপট নিয়ে শহিদুল ইসলাম খোকন নির্মান করেন বাঙলা (২০০৬)। ছবিটির গল্প নেয়া হয়েছিল আহমদ ছফার উপন্যাস থেকে। তবে গাজী জাহাঙ্গীরের জীবন সীমান্তে (২০০৫) ছবিটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল।

আমার বন্ধু রাশেদ

২০১০ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘গেরিলা’। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ও পরিচালকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১১ সালে ছবিটি নির্মান করেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। দর্শকপ্রিয় ও প্রশংসিত এই ছবিটি আর্ন্তজাতিক পুরস্কার ও সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট ১০ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পায়।

একই বছর মুক্তি পায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে দেশের প্রথম কিশোর মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত এই ছবিটিও একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ২০১৪ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প নিয়ে জাহিদুর রহিম অঞ্জন নির্মান করেন ‘মেঘমল্লার’ ও নির্মলেন্দু গুনের কবিতা অবলম্বনে মাসুদ পথিক নির্মান করেন ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়ান’।

ছবি দুটিরই জাতীয় পুরস্কারে জয়জয়কার ছিল।এছাড়া এই সময়ে মুক্তি পাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হিসেবে খালিদ মাহমুদ মিঠুর গহীনে শব্দ (২০১০), মাসুদ আখন্দের পিতা(২০১২), মোরশেদুল ইসলামের অনিল বাগচীর একদিন (২০১৫) উল্লেখযোগ্য। তবে এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু দূর্বল নির্মান দর্শকদের হতাশ করেছে, এর মধ্যে সোহেল আরমানের এইতো প্রেম (২০১৫), দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর বায়ান্ন থেকে একাত্তর(২০১৬) অন্যতম। এছাড়া রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজান (২০১১) ছবিটি মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কভাবে উপস্থাপনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে সর্বশেশ সংযুক্তি ফাখরুল আরেফিনের ভুবন মাঝি (২০১৭)) ছবিটি দর্শকমহলে বেশ সাড়া ফেলেছে। মুক্তির অপেক্ষায় আছে জাহিদ হোসেনের ‘লীলা মন্থন’ সহ বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই চার দশকের বেশি সময় ধরে নির্মান হওয়া চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই বিশ্বমানের চলচ্চিত্র হিসেবে নির্মিত হয়নি, দর্শকরা প্রত্যাশামাফিক সেই মাপের চলচ্চিত্র পর্যাপ্তমানের পায়নি। সেটা নিয়ে দর্শকরা হতাশা ব্যক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো বিশ্লেষনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মান হোক এটাই প্রত্যাশা!

মাটির ময়না

 

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে এই লেখাটি শেষ করছি এমন একটি সিনেমার নাম দিয়ে যেটি নির্মান হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আগে, যে সিনেমা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল স্বাধীনতাকামী মানুষদের, যে সিনেমা নাম লিখিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জহির রায়হান পরিচালিত সেই সিনেমাটির নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।