সেদিন এক স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছিল

কি অদ্ভুত, দারুণ গতিতেই না সময় এগিয়ে যায়।

বলছি, আজ থেকে ঠিক ১১ বছর আগের কথা। সেদিন এক স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছিল, এই নগরীতে। কেউ একজন চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে পৃথিবী তাকে ধরে রাখতে পারেনি।

স্বপ্নের কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি, মনের কথা বলতে চেয়েছিলেন। সবটা বলা হয়নি, বড় অবেলায় চলে গিয়েছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। তার অনেকগুলো পরিচয় – তিনি মূলত ছিলেন সংগীতশিল্পী ও শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক।

জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড দল ‘দলছুটের’ অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। বাপ্পা মজুমদারের সাথে তার ‍জুটিটা বেশ জমে গিয়েছিল ওই সময়। দলছুটের চারটি অ্যালবামে গান গেয়েছেন, গান লিখেছেন, সুরও দিয়েছেন।

তিনি ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। সঞ্জীব চৌধুরীর আমি তোমাকেই বলে দেবো, গাড়ি চলে না, বায়োস্কোপ, কোন মেস্তিরি বানাইয়াছে নাও, আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ, সাদা ময়লা রঙিলা পালে, চোখ, কথা বলবো না – ইত্যাদি গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। কে জানতো ‘গাড়ি চলে না’ বলে আক্ষেপ করা লোকটির গাড়িই এত আগে চলে যাবে!

যেকোনো শ্রোতার কাছেই সঞ্জীব চৌধুরী মানেই ছিল এক আলাদা কণ্ঠস্বর! স্বপ্নবাজি নামে একটি একক অ্যালবামও মুক্তি পায় তার।

হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দি গ্রামে তিনি ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা গোপাল চৌধুরী এবং মাতা প্রভাষিনী চৌধুরী। নয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম।

ছোটবেলায় হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ও এরপরে ঢাকার বকশী বাজার নবকুমার ইন্সটিটিউটে নবম শ্রেণীতে এসে ভর্তি হন ও এখান থেকে ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান পাওয়ার কৃতীত্ব দেখান তিনি। কতটা মেধাবী ছিলেন সেটা এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট।

১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

সংবাদপত্র আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায়যায়দিনে কাজ করেন। সর্বশেষ কাজ করতেন যায়যায়দিন পত্রিকাতে। তিনি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একজন কর্মীও ছিলেন।

সঞ্জীব চৌধুরী একটা মন খারাপের নাম, বুকের ভেতর জমানো এক চাপা দীর্ঘশ্বাস, একটা বুক ফেঁটে বের হওয়া হাহাকার। বড্ড বেশি অভিমানি ছিলেন সঞ্জীব দা, তাঁর জীবন দর্শন, তার চিন্তাও ছিল অন্যরকম।

১১ বছর আগের সেদিনটাতে কি সেই চিন্তারও মৃত্যু হয়েছিল? কে জানে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।