সেই শ্রীদেবী, এই শ্রীদেবী

শ্রীদেবী – সৌন্দর্য ও মেধার এক বিরল সমাবেশ। নতুন করে কিছু না বললেও হবে। রূপালী জগতের পাশাপাশি একজন আদর্শ মা হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ৩০০ ছবিতে অভিনয় করা এই অভিনেত্রীর জন্ম ১৯৬৩ সালে তামিলনাড়ুর শিবাকাসিতে। তামিল, তেলেগু থেকে শুরু করে কন্নড়, মালয়ালাম ও হিন্দি— সব জায়গায়ই সমানভাবে সফল। ভারতীয় সিনেমা আকাশে স্ব-মহিমায় জ্বলজ্বল করা একটি নাম।

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের প্রায় ৪০ বছর পর ১৯৭৯ সালে ‘সোলভা সাওয়ান’ ছবিতে হিন্দি ছবির নায়িকা হিসেবে অভিষেক হলেও বড় সাফল্য আসে ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হিম্মতওয়ালা’য়। এরপর ১৯৮৬ সালে ‘কার্মা’ ‘নাগিনা’ ‘জানবাজ’ কিংবা ‘মি. ইন্ডিয়া’ ছবিগুলোর মাধ্যমেই কার্যত বলিউডে জয়যাত্রা শুরু হয়। এ ছাড়া ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সদমা’, ১৯৮৬ সালের ‘আখেরি রাস্তা’ নামক দক্ষিণের নির্মিত হিন্দি ছবিতেও অনবদ্য অভিনয় করে সমালোচক-দর্শকদের প্রশংসা কুড়ান।

১৯৮৯ সাল। অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র, ঋষি কাপুর, অনিল কাপুররা ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ পার করছেন, তখনও শ্রীদেবী সাহসিকতার সাথে ‘চাঁদনী’ ‘চালবাজ’ ছবিতে দ্বৈত চরিত্র অভিনয়ে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখান এবং নিজেকে একজন নারী সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৯০ সালে ‘লামহে’ ‘খুদা গাওয়া’ ‘রুপ কি রাণী চরণ কা রাজা’ ও লোভী গৃহবধূ কাজলের চরিত্রে ‘জুদাই’-সহ বিচিত্ররূপে নানা ধরনের চরিত্রে তাঁর পারফরমেন্স ছিল দুর্দান্ত। এসব কিছু ছাপিয়ে শ্রীদেবী বনি কাপুরের স্ত্রী। বিয়ে এবং মাতৃত্বের স্বাদ নেয়ার জন্য অনেক দিন যাবৎ রঙিন দুনিয়ার বাইরে ছিলেন।

কয়েক বছর পর তিনি প্রযোজক হিসেবে আবির্ভূত হন। শক্তি: দ্য পাওয়ার, রান, বেওয়াফা এবং টিভি সিরিজ প্রযোজনা করেন। রঙিন দুনিয়ায় দীর্ঘ অনুপস্থিত থাকার পর ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ ছবিটির মধ্য দিয়ে আবার রুপালি পর্দায় ফিরে আসেন শ্রীদেবী। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবিটি একজন গৃহিণীর ইংরেজি শেখার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। সমালোচক ও দর্শকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত এ ছবির পর তেলেগু ছবি ‘পুলি’ ব্যবসায়িকভাবে তেমন সাফল্য না পেলেও তার স্বামী বনি কাপুর প্রযোজিত নতুন হিন্দি ছবি ‘মম’ বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছে।

একজন মা হিসেবে বাস্তব জীবনে শ্রীদেবী দুই মেয়ে জানবি ও খুশিকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সাথে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তার নতুন দুই হিন্দি ছবিতেও মা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অবশ্য, রিল কন্যার সাথে তার চরিত্র ও সম্পর্ক অনেকটা ভিন্ন। শুনেছি আপনার এই ছবিটি ভেন্ডেটা থ্রিলার, এটা কি সত্য? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি এখানে সবকিছু খুঁজে পেতে পারেন, এটা ইমোশন, ড্রামা, থ্রিলস এবং অন্য সবকিছু!’

তার সর্বশেষ দুটি হিন্দি ছবির মধ্যে একটি পরিচালনা করেছেন গৌরী শিন্ডে, অন্যটি রবি উদয়াওয়ার। যশ চোপড়া, সুভাষ ঘাই, কে বিশ্বনাথ, বালু মহেন্দ্রর মতো লিজেন্ডদের সাথে কাজ করার পর নতুন দুজনের মধ্যে কোনো ভিন্নতা খুঁজে পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওরা অভিজ্ঞ পরিচালক হিসেবে ভাল ছিল। তবে সময়ের সাথে তাদের অগ্রসরটা হয়তো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। রবি আমার চরিত্রটি কীভাবে উপস্থাপন করবে, তা নিয়ে ওর স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এবং সেটি বেশ শক্তিশালী।’

‘মম’ ছবির কন্যা পাকিস্তানি অভিনেত্রী সজল আলী সম্পর্কে তিনি জানান, তার নিজের মেয়ের জাহ্নবীর মতো পাকিস্তানি শিশুশিল্পী সজলও তাঁর মেয়ে হয়ে উঠেছে অল্প ক’দিনেই। মা-মেয়ের এই সম্পর্ক এখন রিল লাইফের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক সুন্দর ও গভীর। তিনি আরো বলেন, ‘ মুভি প্রমোশনের সময় সত্যিই তাকে খুব মিস করেছি। সে আমার তৃতীয় কন্যার মতো ছিল।’

এবার শ্রীদেবীর আসল মেয়েদের কাছে আসা যাক, শ্রীদেবী জানিয়েছেন মেয়েদের ইচ্ছার ওপর সবকিছুই ছেড়ে দেয়া হবে। মেয়েরা যাতে খুশি হবে, ভাল থাকবে, সেই কাজে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমি অভিনেত্রী হতে চেয়েছি আমার পিতামাতা উভয়েই উৎসাহিত করেছেন। বনি এবং আমি হলে জাহ্নবীর ক্ষেত্রে ঠিক একই কাজ করতাম। আজকে আমার ৩০০ ফিল্ম হয়েছে, ওর বয়েসে থাকতেই আমার ৬০ এর অধিক ফিল্ম হয়ে গিয়েছিলো!’

জানবির বাবা-মা উভয়ই সেলিব্রিটি। বনি একজন সফল প্রযোজক। কেন তারা তাদের কন্যাকে লঞ্চ করতে এত দেরী করলেন? শ্রীদেবীর স্পষ্ট উত্তর ছিল, ‘আমরা চাই জানবি আত্মনির্ভরশীল হোক।’ আসছে জুলাইয়ে আসছে জানবির প্রথম বলিউড সিনেমা ‘ধাড়াক’।

তার স্বামীর প্রোডাকশনের কাজে শ্রীদেবী খুব উপভোগ করে থাকেন, সুতরাং, বাইরের কাজ থেকে হোম প্রোডাকশনে পার্থক্যটা কেমন? জবাবে বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম সবসময় একই রকম। একমাত্র পার্থক্য হলো, আমি ২০ বছর পর আমার স্বামী নির্মিত একটি ছবিতে অভিনয় করছি— স্পেশালিটি এটাই। আর বনি তাঁর কাজ এবং প্রত্যেক অভিনেতার প্রতি খুবই ডেডিকেটেড।’

একটি সিক্রেট বলতে গিয়ে শ্রীদেবী বলেন, ‘ইংলিশ ভিংলিশ ছবির প্রযোজক আর আমার স্বামী ভালো বন্ধু। ওই ছবিতে বনিরও অনেক কন্ট্রিবিউশন আছে। আমেরিকায় আমরা একসাথে ছিলাম, যেখানে ছবির বেশিরভাগ শুটিং হয়েছিলো।’

নওয়াজউদ্দিন ও অক্ষয় খান্না দুজনেই বলেছেন তারা আপনার জন্যই ‘মম’ ছবিতে সাইন করেছে, বিষয়টি কিভাবে দেখেন? শ্রীদেবী বলেন, ‘আমি খুব খুশি যে অক্ষয় আমাদের ফিল্ম করতে রাজি হয়েছে আর নওয়াজউদ্দিনের অন্য কাজ শেষ করার জন্য আমরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছিলাম, যাতে সে আমাদের ছবিটি করতে পারে। তারা উভয়ই ভাল।’

শ্রীদেবী জানান, অভিনয় ছাড়া তিনি আর কিছু বুঝেন না। মাত্র চার বছর বয়সে মা-বাবার সিদ্ধান্তে সিনেমাজগতে পা দিতে হয়েছিল। ওই সময় তিনি অভিনয়টা আসলে কি জানতেন না এবং কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাও সম্ভব হতো না। তার বাবা-মা তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে জোর করেননি।

আজকের শ্রীদেবীর কাছে অভিনয়টাই ধ্যান-জ্ঞান। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এটি অত্যন্ত সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনে পরিপূর্ণ। আমি নানারকম ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেছি, এটা সবচেয়ে ভালো দিক।’

একজন অভিনেতার আদৌ কোনও পরিবর্তন হয় না, যদি না সে অতীত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, ‘আমার কোনো পাগলামি নেই এবং কিছুই বদলাই না!’ তাঁর সহজ স্বীকারোক্তি ছিল, ‘আমাকে হিম্মতওয়ালা করতে বললে, আমি আমার প্রযোজককে জিজ্ঞেস করলাম কেন আমাকে নিচ্ছেন? যেখানে আমার প্রথম হিন্দি ফিল্ম (সোলভা সাওয়ান) ফ্লপ। তবে আমি এখন খুব খুশি, এরপর আসলে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল।’

নিজের কি কোনও পছন্দের সিনেমা আছে? উত্তরে শ্রীদেবী বলেন, ‘আমার সব চলচ্চিত্রই আমার কাছে প্রিয়। তবে হিন্দিতে যশ চোপড়া  ‘লামহে’ এবং ‘চাঁদনী’র মধ্যে  সত্যিই আমাকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করেছেন। সাদমা, মি ইন্ডিয়া ও চালবাজও স্পেশাল।’

আর, পরবর্তীতে নতুন কি আসছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আপাতত জানি না। আমি ভালো মানের মুভি করতে চাই, বেছে বেছে। শুটিংয়ের সময় আমার পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। আর আমি কোনো পরিকল্পনা করতে পারি না।’

পরিবারের সাথেই একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন তিনি দুবাইয়ে। ইনস্টাগ্রামে ঝলমলে ছবিও পোস্ট করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু, এর মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। বিদায় শ্রীদেবী!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।