সেই গেছে হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে

শুনতে পাচ্ছ হিউজি ?

ব্রিসবেনের মিঠে রোদের সকালে আকাশের দিকে তাকিয়ে আজ তোমায় খুঁজেছে অসংখ্য চোখ। খুঁজে পাবে কি তোমায়? অথচ দেখো, আজ এই মাঠে তোমার থাকার কথা ছিল প্রিয় ব্যাগি গ্রিনটা মাথায় চাপিয়ে। দূর আকাশ থেকে নয়, মাঠের সবুজ ঘাসে উদযাপনের উল্লাসে মাতার কথা ছিল প্রিয় ডেভের সাথে। দেখো সবকিছু সেই তেমনই আছে, শুধু তুমি নেই। বিষাদে ভাসিয়ে কোথায় চলে গেছ ক্যিড? কেমন আছ?

‘সবচেয়ে যে অল্পে ছিল খুশি,

খুশি ছিল ঘেষাঘেষির ঘরে,

সেই গেছে হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে,

দিয়ে গেছে জায়গা খালি করে’

এত কেন চমকে দাও তুমি বলতে পার? কি দরকার ছিল নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই জোড়া সেঞ্চুরি করার! কি দরকার ছিল প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচেই সেঞ্চুরি হাঁকানোর? রেকর্ডগুলো তো পারেনি তোমাকে ধরে রাখতে। বরং তুমি চলে গেলে দুর আকাশের তারা হয়ে, হয়ত বড় অভিমান বুকে নিয়ে, সবাইকে শেষবারের মত চমকে দিয়ে। দলের সবথেকে ছোট্ট ফিলির সময় সবার আগেই ফুরিয়ে গেল! কেমন বিচার হে তোমার বিধাতা, এ যে অন্যায়, এ যে হৃদয়বিদারক!

ব্যাগি গ্রিন ক্যাপে সাদা পোশাকের তোমাকে শেষবার দেখেছি এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই। আজও তো তোমার এই ড্রেসিংরুমে বসে জাতীয় সঙ্গীত গাইবার কথা। তুমি কি আজ গাইবে ফিল? তুমি কি শ্যাম্পেনের ওই ছিপিটা খুলে সেই আগের মতোই ছিটিয়ে দেবে অধিনায়কের মুখে? আহা, ক্লার্ককে বড্ড মিস করবে বুঝি? নাকি অভিমানে চোখ মুছে দুর আকাশ থেকেই দেখছ অস্ট্রেলিয়ার জয় উদযাপন! খুব মিস কর ক্রিকেটকে, তাই না ফিল?

দেখো আজ চারিদিকে তোমার শোকের মাতম, ব্রিসবেনের সবুজ ঘাস আজ তোমার স্পর্শ পাবার জন্য ব্যাকুল, বাইশ গজে আজও ওয়ার্নারের ব্যাট তোমার ব্যাটের স্পর্শ খোঁজে। তবুও তুমি ফিরে আসবে না? এত নিষ্ঠুরতা কি তোমাকে মানায়? তুমি যে তোমার ছোট্ট বোনটার কাছে হিরো, তোমার বাবার কাছে পৃথিবীর সেরা ছেলে, বড় ভাইয়ের কাছে সেরা বন্ধু, মায়ের কাছে সবথেকে আদরের। কিভাবে পাশ কাটিয়ে গেলে এত মায়া? ওই গ্যালারির গর্জনেও কি তোমার হৃদয় গলবে না আজ? কেন না ফেরার দেশে যাবার জন্য তোমার এই ধনুকভাঙ্গা পন? কেন ফিল, কেন?

কতবারই তো বাদ পড়েছ দল থেকে, কিন্তু ফিরে এসেছ বারবার। আর কেউ না জানুক, তুমি তো জান কিভাবে ফিরে আসতে হয়। তোমার সেই ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ, সেই ব্যাট, সেই গ্লাভস এখনো তেমনি আছে। অভিমান ভুলে আরও একটিবার ফিরে এস। আরও একটিবার চমকাতে আমার খারাপ লাগবে না। কিন্তু আমি জানি, তুমি ফিরবে না। বড্ড একগুঁয়ে স্বভাব তোমার!

 

সবাই যখন ভাবছিল তুমি দলে আসবে ওই বন্ধু ক্লার্কের জায়গায়, ঠিক তখনই সবাইকে ফাকি দিলে। জীবনের শেষ ইনিংসে তোমায় কেউ আউট করতে পারেনি, কিন্তু ওই একটি বলেই থেমে গেল অসংখ্য গল্প, হাজারো স্বপ্ন! হায় নিয়তি! আর মাত্র তিনটি দিন কি অপেক্ষা করতে পারতে না? অচেতন হাতেই নাহয় কেকে ছুরিটা চালাতে, চলে যাবার জন্য এত তাড়া কেন তোমার বন্ধু!

আমাদের স্বপ্নের মূল্য হয়ত নেই ওই উপরে বসে থাকা বিধাতার কাছে, তবুও স্বপ্ন দেখতে পিছপা হবে না ওই নিউ সাউথ ওয়েলসের ম্যাকসভিল গ্রামের কিশোররা। তোমার দেখানো পথেই পা রাখবে ওরা হৃদয়ে তোমার নামটিকে লিখে নিয়ে। গত তিন বছরে অসংখ্যবার বদলেছে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনিং জুটি, তুমি থাকলে কি বদলানো লাগত? হয়ত লাগত, হয়ত লাগত না। শুন্যতা পূরণ হয়ে যায়, কিন্তু তোমার শুন্যতা যে অসীম।

ওই যে অ্যাবটের বলটা, সেটা কিন্তু তোমার শরীরে নাও লাগতে পারত। এমন কত হাজারো বল তুমি অবলীলায় সীমানা ছাড়া করেছ। কিন্তু দেখো, এই বলটা ঠিকই লেগে গেল! যে আঘাত ক্রিকেটে কখনো কারো লাগেনি, সেই আঘাত ঠিকই তোমার লাগলো। তোমাকেই কেন সবকিছুতে প্রথম হতে হবে হিউজি বলতে পার? বলতে পারলেও যে তুমি বলবে না সেটা এতক্ষনে বুঝে গিয়েছি।

দিন, মাস, বছর, শতাব্দি পেড়িয়ে এই ক্রিকেট নামক খেলাটি এগিয়ে যাবে। এই প্রজন্মের পরেই হয়ত তুমি হারিয়ে যাবে স্মৃতি থেকে। তবুও তুমি থাকবে কিছু মানুষের হৃদয়ে, কিছু পরিবারের ব্যাথায়, কিছু ভক্তের হতাশায় অথবা কিছু লেখকের কলমে। সময়ের পরিক্রমায় একদিন তোমার সাথে দেখা হবে বন্ধু ওয়ার্নার, ক্লার্কদের।

তবে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে হিউজি, অভিমান বুকে চেপে তোমাকে বারবার ফিরে আসতে হবে গ্যাবা কিংবা ওয়াকায়! প্রতিবার ওই ৬৩ সংখ্যাটা পার করে যখন ওয়ার্নাররা আকাশের দিকে তোমার পানে ব্যাট তুলবে, তখন প্লিজ মনটা নরম কর। ওরা জানে, তুমি দেখছ! ওরা জানে, তুমি আছো! ওরা জানে, তুমি হেঁটে বেড়াও ওই অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটা সবুজ ঘাসের মাঠে।

ভাল থেকো হিউজি, দেখা হবে বন্ধু!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।