সুপার মারিও: হতাশা আর মাদকে হারিয়ে যাওয়া তারকা

১.

২৫ আগস্ট, ২০০০; উয়েফা সুপার কাপে মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ ও গালাতাসারাই। ফুটবল বিশ্বের চোখ ছিল ম্যাচটির দিকে। কারণ ওইদিন মঞ্চস্ত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ট্রান্সফার লুইস ফিগোর নতুন ক্লাবের হয়ে অভিষেক। বিতর্ক ছাড়াও ওই মুহুর্তে সেই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফুটবলার, তাই ফিগোর জন্য ম্যাচটা নিয়ে বাড়তি উত্তেজনা আর আগ্রহ ছিল।

কিন্তু সেই ম্যাচে ফিগোর কোন ম্যাজিক ছিলনা, উলটো সব আলো কেড়ে নিয়েছিল গালাতাসারই এ নতুন যোগ দেয়া আরেকজন – গোলমুখে ছিলেন একেবারে নির্দয়, শিকারির মত উঁত পেতে থাকতেন সুযোগের অপেক্ষায় । ওই ম্যাচ রিয়াল মাদ্রিদ হারে ১-২ গোলে, গালাতাসারাই এর নতুন স্ট্রাইকার করে দুই গোল। প্রথমটি পেনাল্টি থেকে, পরেরটা স্বভাবসূলভ স্ট্রাইকিং ইনস্টিংট এর ফসল – ডান পাশ থেকে আসা ক্রসকে প্রথম টাচেই পরিণত করেন গোলে ।

২.

গত সপ্তাহে নেইমারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পারফর্মেন্সের পর এই চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রাজিলের টপ স্কোরারদের একটা লিস্ট আসে সামনে। কাকা, রিভালদো এবং হালের নেইমারের পরের নামটা দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। এটা কে? ফেনোমেনন রোনালদোর গোল যেখানে ২০টাও নাই সেখানে এরকম অচেনা কিভাবে ২৫ গোল নিয়ে লিস্টে চার নাম্বারে থাকে। গুগল করলাম, স্ট্যাট দেখলাম আর অবাক হলাম।

পুরা মাথা নষ্ট করা স্ট্যাট, অন্তত ওই সময়ের জন্য। ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত খেলেন পোর্তো, গালাতাসারাই আর স্পোর্টিং সিপি তে। এই সময়ে ২৭৫ ম্যাচে করেন ২৬৯ গোল। এর মধ্যে ইউরোপের টপ স্কোরার ছিলেন তিনবার। দুইদিন আগে মেসি যেই গোল্ডেন বুট ট্রফি জিতেছেন সেটা এই ফুটবলারটা জিতেছেন দু’বার। অথচ এমন একজনের নামই জানা নাই অনেকের।

মারিও জার্দেল – একজন প্রোলিফিক গোল স্কোরার। কখনোই সুযোগ হয়নি ইউরোপের এলিট দলে খেলার। সেই সাথে যুক্ত হয় জাতীয় দলে ক্রমাগত অবহেলা।  আর সেটািই তাকে ঠেলে দেয় চরম হতাশায়। পরবর্তীতে মাদকে ডুবে অনাকাঙ্খিত ভাবে শেষ হয় ফুটবল ক্যারিয়ারের।

রিয়ালমাদ্রিদের সাথে সেই ম্যাচে জার্দেলের সামান্য ঝলকই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু নিজের পিকে জার্দেল ছিলেন ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকার। অসাধারন ফিনিশিং দক্ষতা তাকে যেখানে খেলেছে সেখানেই লিগের সেরা স্কোরার বানিয়েছে। কিন্তু ওই ফিনিশিং দক্ষতাই তাকে আবার সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকার ট্যাগও দিয়েছিল কারণ ও ফিনিশিং ছাড়া অন্যভাবে দলকে সহায়ত করতো খুব কমই। বাস্তবতা হচ্ছে, ও জাস্ট পোচার ছিলনা – ওর খেলায় বৈচি্ত্রও ছিল অনেক। ২৫ গজ দূর থেকে লেফট ফুটেট ভলি থেকে একেবারে টপ কর্নারে গোল থেকে শুরু করে ডিবক্সে ঠান্ডা মাথায় ক্লিনিক্যাল ফিনিশ কিংবা বুলেট গতির হেডার – এগুলা ছিল ওর ট্রেডমার্ক।

৩.

ভাস্কো দা গামা আর গ্রেমিও তে খেলার পর আসেন পোর্তোতে। সেখানে তিনি ছিলেন ফেনোমেনন। প্রথম দুই সিজনে পোর্তোর হয়ে করেন ৩৭ করে ৭৪ গোল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ওর হেডের শিকার হয় বার্সেলোনা আর বায়ার্ন। ১৯৯৯-২০০০ ছিল পোর্তোর হয়ে তার সবচেয়ে সফল মৌসুম। ওইবার ৪৯ ম্যাচে ৫৪ গোল করে বসেন, অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে। সেবার ১০ গোল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টপস্কোরারও ছিলেন।

তবে ওই মৌসুমে পর্তুগিজ লীগের গোল পয়েন্ট কম থাকায় ইউরোপ টপ স্কোরার হয়েও গোল্ডেন বুট জিতা হয়নি। কিন্তু তার আগের মৌসুমে (১৯৯৮-৯৯) অবশ্য ইউরোপীয়ান গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। আর পর্তুগিজ লিগে টানা চারবার ছিলেন টপ স্কোরার। কিন্তু ইউরোপের টপ ফাইভ/সিক্স লিগে নিয়মিত পারফর্ম করেও সেলেসাও দলে নিয়মিত উপেক্ষিত হচ্ছিলেন। এমনকি রোনালদোর ইনজুরির কারণে বাইরে থাকার সময়ও তাকে দলের জন্য উপযুক্ত মনে করেনি ব্রাজিল। তার চেয়ে রোমারিও রিভালদোদেরই বেশি প্রেফার করত ব্রাজিল। এটাই হয়ত তাকে পোর্তো ছাড়ার জন্য ততপর করে তুলেছিল।

৪.

২০০০ এর গ্রীষ্মে জার্দেল ইউরোপ এলিটের একেবারে দাড়গোড়ায় চলে এসেছিলেন। ইউরোপের টপ স্কোরার, পর্তুগীজ লীগের নিয়মিত টপ স্কোরার, ব্রাজিলিয়ান। সব মিলিয়ে হয়ত কোন বড় দলে এবার চলে যাবে এবং সেই সাথে ব্রাজিলেও ডাক পাবেন – তার স্বপ্ন ছিল এরকমই। তাকে কেনার জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল ইন্টার মিলানের। বিশেষ করে রোনালদোর অবর্তমানে ফরোয়ার্ড লাইন শক্তিশালী করতে ও ছিল একটা ভাল অপশন।

কিন্তু, দুর্ভাগ্য বলেন আর যাই বলেন সেবার ইন্টার শেষ পর্যন্ত কিনে নেয় তুর্কি স্ট্রাইকার হাকান সুকারকে। ওইবারই বড় ক্লাবের সবচেয়ে কাছে যেতে পেরেছিলেন জার্দেল। ঘটনাক্রমে সেই হাকান সুকারের জায়গাতেই গালাতাসারাইয়ে আসেন । কিন্তু যেই আশা নিয়ে তিনি পোর্তো ছেড়েছিলেন সেটা আসলে তুরস্কে থেকে পূরণ করা কঠিন। সেখানে নিজের প্রথম ম্যাচেই করেন পাঁচ গোল। ওই সিজনে সব মিলিয়ে ৩৪ গোল করলেও তুরস্কে জীবনের সাথে ঠিক মানিয়ে নিতে পারেননি। তাই ওই সিজন শেষেই ছাড়েন গালাতাসারাই।

৫.

এরপর আবারো ইন্টারে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। টানা দুই সিজনে ব্যার্থ ইন্টার বোর্ড দলকে নতুনভাবে গুছাতে মরিয়া। মার্চেই তারা জার্দেলের গালাতাসারাই তারকা এবং সতীর্থ এমরে বেলুজগলু আর ওকান বুরুক কে সাইন করায়। হাকান সুকারও ভাল খেলছিলনা দেখে হয়ত জার্দেলকেও কিনতে পারে এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

সাথে গুঞ্জন ছিল হয়ত গালাতাসারাই কোচ ফেতিহ টেরিমকেও চুক্তিভূক্ত করতে পারে ইন্টার। কিন্তু আবারো তার ইন্টার মুভটা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি – হৃদয়বিদাড়ক বলা যায়। এদিকে ফেতি টেরিম ঠিকই মিলান ক্লাবে যোগ দেয়, তবে এসি মিলানে। ইন্টারে জায়গা না পেয়ে আবারো পর্তুগালে ফিরে যেতে হয় তাকে – তবে পোর্তো না, স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে।

২০০১-০২ মৌসুমে জার্দেল তার একেবারে পিকে ছিলেন। প্রায় দুই যুগ পর তার নতুন ক্লাবকে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় লিগ জেতান। বরাবরের মত সেবারও লীগের টপ স্কোরার ছিলেন – অবিশ্বাস্য হলেও সত্য তার গোলসংখ্যা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ছিল দ্বিগুণ। লীগে মোট ৩০ ম্যাচে ৪২ গোল করেন জার্দেল, সব প্রতিযোগীতা মিলিয়ে করেন ৫৫ গোল। ইউসিএল এ ৬ গোল। ইউরোপের টপস্কোরার আবারো জিতে নেয় গোল্ডেন বুট।

৬.

বিশ্বকাপ সমাগত, এদিকে বার্সেলোনা থেকেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাকে কেনার। এমন একটা মৌসুমের পর সব ঠিকঠাক চলছেই বলা যায়। কিন্তু ওর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ এবং দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে ইউরোপে নিয়মিত গোল করেও কখনো জাতীয় দলে সেটার মুল্যায়ন না পাওয়া। সেলেসাও শার্টে খেলেছেন মোটে ১০ ম্যাচ, গোল একটা। দলে ঢুকার জায়গাও আসলে সীমিত ছিল রোনালদো রিভালদো রোমারিও এবং তরুণ রোনালদিনহোদের ভিড়ে।

কিন্তু তারপরও ইউরোপের নিয়মিত গোল্ডেন বুট জয়ী খেলোয়াড় অনেকটা নিয়মিতই জাতীয় দলে উপেক্ষিত হয়েছেন। অনেকের মতে তার টেম্পারমেন্টে নিয়ে কোচদের আস্থা ছিলনা। তাই গুছানো স্কোয়াডে তার অন্তর্ভুক্তি বাড়তি ঝামেলা তৈরি করতে পারে এমন আশংকা ছিল তাদের। তার উপর ২০০১ কোপা আমেরিকার ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলেন – হুন্ডুরাসের সাথে সেই ম্যাচ ব্রাজিল ২-০ গোলে হারলে তাকে দাড় করানো হয় কাঠগড়ায়।

তবে সে যাই হোক, স্পোর্টিং এ ওইরকম একটা মৌসুম কাটানোর পর বিশ্বকাপ দলে ডাক পাবেন ধরেই নিয়েছিলেন। আবার আশংকাও ছিল। রেকর্ড ব্রেকিং সিজনের পর জার্দেলের মন্তব্য ছিল ‘যদি আমি বিশ্বকাপে না যাই আমি’ “ট্রমাটাইজড” হয়ে যাব।’ এটা বুঝায় জাতীয় দলে খেলার জন্য কতটা উন্মুখ ছিলেন ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত লুইস ফিলিপে স্কলারির স্কোয়াডে ব্রাজিল লীগের মধ্য সারির স্কোরার লুইজাও, এডিলসন চান্স পেলেও জায়গা হয়নি জার্দেলের। ফাইনালে রোনালদোর জোড়া গোলে বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল সেই সাথে তার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট চলে যায় পরিত্যাক্তের খাতায়। এখানেই শেষ তার স্বপ্ন যাত্রা। মানসিকভাবে এত বেশি ভেঙ্গে পড়েন যে একসময় মাদকাসক্তও হয়ে পড়েন।

লিসবনের ক্লাবও এক সিজন শেষে তাকে বেঁচে দেয়। গোল্ডেন বুট জয়ের পরের সিজনে তার গোল ছিল ১২, খেলেন ২০ ম্যাচ। এর মধ্যে আবার স্ত্রীর সাথে হয়ে যায় ছাড়াছাড়ি। অবশ্য জার্দেলের আনপ্রেডিক্টেবল মেন্টালিটি সবার জানা ছিল। এতদিন যেহেতু গোল আসছিল তাই খেলেও গেছেন ক্লাবের আপত্তি ছাড়া। এই জিনিসটা হয়ত ইন্টার কিংবা বার্সেলোনার মত ক্লাব গ্রহণ করেনি যে কারণে ইউরোপের দাপুটে স্ট্রাইকারের কখনো খেলা হয়নি বড় ক্লাবগুলোতে।

কিন্তু তার পরিসংখ্যান বলছে যে বড় কোন ক্লাবে যেতে পারলে হয়ত তাকে আজ আমরা একজন কিংবদন্তি হিসেবে চিনতে পারতাম। স্পোর্টিং লিসবনের ওই সিজন পর ফিটনেস সমস্যা ও ব্যাক্তিগত সমস্যা মিলিয়ে আর কখনোই ফর্মে ফিরতে পারেনি। এরপর ধীরে ধীরে তার ক্যারিয়ারের শেষ হয়ে অগোচরে।

৭.

এমন গিফটেড স্ট্রাইকারের এরকম পরিণতি আসলে দুঃখজনক। খেলার স্টাইল আর সমসাময়িক রোনালদো রিভালদোদের মতো আরো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সাথে জাতীয় দলের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন নি, তবে হয়ত আরো যত্ন, সুযোগ ও গুরুত্ব পেলে হয়ত ব্রাজিলের কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারতেন। দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়নি কিন্তু পোর্তো এবং স্পোর্টিং লিসবনের ফ্যানরা ব্রাজিলিয়ানকে ‘সুপার মারিও’ হিসেবেই মনে রাখবে, নিজের সেরা সময়ে যিনি ছিলেন অপ্রতিরুদ্ধ শক্তি।

এক নজরে মারিও জার্দেল

কোপা লিবার্তোদোরেস টপ স্কোরারঃ ১৯৯৫;

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টপ স্কোরারঃ ১৯৯৯-২০০০;

ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটঃ ১৯৯৮-৯৯, ২০০১-২০০২;

ইউরোপীয়ান টপ স্কোরারঃ ১৯৯৮-৯৯, ১৯৯৯-২০০০, ২০০১-০২।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।