সুপারম্যান সমাচার

র‍্যাংকিংয়ের ৯ নম্বর দলের সদস্য হয়ে সাধারণত  একজন ক্রিকেটার  আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের ৩ বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার হতে পারেন না। ঠিক তেমনি প্রথমবার বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হবার পর টানা দুই বছর সহজেই এ অবস্থান অক্ষুণ্ণও রাখতে পারেন না একজন ক্রিকেটার। তবে যিনি এমনটি পারেন তাকে বোধহয় সাকিব আল হাসান বলে।

২২ জানুয়ারি, ২০০৯ – শের এ বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লড়ছিলো বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ২ উইকেটের জয়ে ৩ ম্যাচ সিরিজে ১-০ তে এগিয়ে ছিলো জিম্বাবুয়ে। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে তাঁরা দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশের সামনে। ওই ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ৬ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে সমতায় ফেরায় কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমিদের মাঝে। তবে সেদিন বাংলাদেশের জয়কে ছাপিয়ে ভক্তকুলে সবচেয়ে বেশি উদযাপিত হয় একটি ব্যক্তিগত সাফল্য।

পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে সেদিন তাক লাগিয়ে আইসিসি ওয়ানডে অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থানে উঠে আসেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান। ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রথমবারের মত কোন বাংলাদেশি খেলোয়াড় স্বাদ পান বিশ্বসেরা হওয়ার।  সাকিবের ব্যক্তিগত সে অর্জনে বাঁধভাঙা উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশে। বিশ্বমিডিয়ার সবটুকু আলো এসে পড়ে সাকিবের ওপর। তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ২১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারকে নিয়ে। সাকিব আল হাসান হয়ে যান বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

সেদিন থেকে সাকিব আল হাসানকে নতুন করে চিনতে শুরু করে ক্রিকেটবিশ্ব। ক্রিকেটের মহাকাশে সাকিব আল হাসান উদয় হন নতুন নক্ষত্র হয়ে যা সময়ের সাথে সাথে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে থাকে। পেশায় একজন ক্রিকেটার হলেও  ছোটবেলা থেকে ফুটবলের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিলো সাকিবের। তখন ফুটবলই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ফুটবলের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এত বেশি পরিমাণে ছিলো যে পড়ার টেবিলে এমনকি ঘুমানোর সময় বিছানায়ও ফুটবল সঙ্গে রাখতেন তিনি।

পারিবারিকভাবেও ফুটবল আবহে বেড়ে উঠেছেন সাকিব। বাবা মাশরুর রেজা ছিলেন মাগুরার কৃতি ফুটবলার, খেলেছেন খুলনা বিভাগের হয়ে। নিকটাত্মীয় মেহেদি হাসান উজ্জ্বল ছিলেন জাতীয় দলের ফুটবলার। তাই সাকিবের প্রথম প্রেম ফুটবল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। বাবা মাশরুর রেজাও চাইতেন ছেলে ফুটবলার হোক। সেজন্য ছোট্ট সাকিবকে প্রতিদিন নিয়ে যেতেন স্টেডিয়ামে।

কিন্তু সেই সাকিবই একসময় হয়ে গেলেন ক্রিকেটার। শৈশবে ফুটবলের পাশাপাশি মাগুরায় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেও দ্যুতি ছড়াতে থাকেন সাকিব। তারপর একদিন বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ পরীক্ষায়  অংশগ্রহণ করেন এবং যথারীতি পাসও করেন। সেদিন থেকেই ক্রিকেটার হবার পথে যাত্রা শুরু হয় সাকিব আল হাসানের। এরজন্য কৃতিত্বটা অবশ্য তাঁর বাবারও। কারণ তিনি সবসময় নিজের চেয়ে ছেলের ইচ্ছাকে প্রাধান্যকে দিয়ে এসেছেন। তা না হলে হয়ত ক্রিকেটার সাকিবকে আমরা নাও দেখতে পেতাম।

আজ থেকে ১১ বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করেন সাকিব আল হাসান। বয়সভিত্তিক দলগুলোতে ভালো করেই জাতীয় দলে খেলার সুযোগ মেলে তাঁর। খেলেছেন ২০০৪ অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে। ২০০৫-২০০৬ সময়টাতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে বেশ কয়েকটি নজরকাড়া পারফরম্যান্সে জাতীয় দলে ঢুকার পথ মসৃণ করেন তিনি।

তবে তিনি যখন জাতীয় দলে সুযোগ পান তখন দলের অবস্থা ছিলো বেশ নড়বড়ে। স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫ ম্যাচ সিরিজ খেলতে নেমে প্রথম ৪ ম্যাচের ৩টিতে হেরে সিরিজ খুইয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। তৎকালিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন হারে সমালোচনার তোপের মুখে পড়েছিল খেলোয়াড়রা।

এমতাবস্থায় শেষ ম্যাচটি জিতে সিরিজটি মোটামুটিভাবে  শেষ করার উদ্দেশ্যে হারারেতে খেলতে নামে বাংলাদেশ। আগের ম্যাচ থেকে এসেছিলো তিনটি পরিবর্তন। বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল অভিজ্ঞ অলক কাপালি, মোহাম্মদ রফিক ও শাহাদাত হোসেনকে। তাদের বদলে দলে প্রথমবারের মত দলে সুযোগ পান মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসান।

প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে নেমেই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে সবাইকে মুগ্ধ করেন মাগুরার লিকলিকে গঠনের এ তরুণ। বল হাতে ১০ ওভার বল করে ৩৯ রান খরচায় তুলে নেন এলটন চিগুম্বুরার উইকেট। আর ব্যাট হাতে ৪৯ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের বন্দরে ভেড়ান তিনি।

সেদিন থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাননি সাকিব আল হাসান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে দিনকে দিন পরিণত ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, দলের বিপর্যয়ে ব্যাট ও বল হাতে বার বার হয়েছেন বিশ্বস্ত কান্ডারি। রেকর্ড ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মেতে উঠে ২০১৫ সালে তিনি এমন এক রেকর্ড করে বসেন যা ১৪০ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে কেউ করতে পারেনি।

২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে তিন সংস্করণে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হবার গৌরব অর্জন করেন তিনি। ১১ বছরের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত খুব কম সময় বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে দেখা গেছে তাকে। এ সময় বড়দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের অধিকাংশ জয়ে অবদান রাখেন তিনি। ২০০৯ সালে ৩৮০ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থান থেকে জ্যাকব ওরাম ও অ্যান্ড্রু ফ্লিনটপকে টপকে তিনি যখন ওয়ানডেতে প্রথম বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার নির্বাচিত হন তখন ৬১ ম্যাচ খেলে ৩২.২১ গড়ে তাঁর সংগ্রহে ছিল ১৫৪৬ রান ও ৬৫ উইকেট।

তারপর আইসিসি টেস্ট অলরাউন্ডার র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করতে সাকিবকে খেলতে হয় ২৬ ম্যাচ। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান সিরিজ শেষ হবার পর প্রথমবারের মত আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়েরও শীর্ষস্থান দখল করেন সাকিব আল হাসান। এই সময় ২ টি সেঞ্চুরিসহ ৩৭.০৪ গড়ে নিজের ঝুলিতে সাকিব যোগ করেন ১৬৩০ রান ও ৯৬টি উইকেট।

আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১১ বছর পূর্ণ করলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আল হাসান। ১১ টা বছর অনেক লম্বা সময়, মালিক হয়েছেন কতশত রেকর্ডের, দেশকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জয়। এখনও দেশকে অনেক কিছু দেয়ার আছে সাকিবের। শুধু দেশের ক্রিকেট নয়, বিশ্বক্রিকেটও তাঁর কাছ থেকে কম কিছু পায়নি। কারণ এই বিশ্বসেরার গাড়ি তো ছুটছে বাংলাদেশকে ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন পারফরম্যান্সে বহির্বিশ্বেও বেশ খ্যাতি অর্জন করেন সাকিব আল হাসান। তারই ফলস্বরূপ ২০১১ সালে প্রথমবারের মত তিনি সুযোগ পান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি  টুর্নামেন্ট আইপিএলে। আইপিএলে সফলতার পর তিনি একে একে খেলেন কাউন্টি ক্রিকেট, সিপিএল,বিগ ব্যাশ ও পিএসএলে।

এই ১১ বছর নিজের বিভিন্ন কাজকর্মে অনেক সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। তবে কখনোই এসব গায়ে মাখেননি বা এসব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না। বরাবর সুসময়ের সখ্য পাওয়া সাকিব এসব পেছনে ফেলে মাঠে বারবার  ফিরে এসেছেন দুর্ধর্ষ ক্রিকেটারের রূপে। এসব ক্ষেত্রে অনেক ক্রিকেটারই নিজেদের মনোবল হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু সাকিব আল হাসান এখানেও অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। বরাবরই তিনি ফিরে এসেছেন সামর্থ্যের সেরাটা মেলে ধরে। অলরাউন্ড নৈপুন্য, র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাব বাদ দিয়ে তাঁর এই মানসিকতাই এক্ষেত্রে তাকে অন্যদের চেয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছে।

সাকিব আল হাসানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মনের জোর। তাঁর সবচেয়ে সেরা গুণ হলো তিনি চাপের মধ্যে কখনো ভেঙে পড়েন না। ২২ গজের লড়াইয়ে সবসময় ইতিবাচক থাকেন তিনি। আর এজন্যই তিনি আজ বিশ্বসেরা, তিনি একজনই। তিনি অনন্য, তিনি সাকিব আল হাসান, আমাদের সুপারম্যান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।