সুদর্শন নায়ক, চৌকশ অভিনেতা

সময়টা সম্ভবত আশির দশকের শুরুর দিকে। আর্মেলিন ইনডেনবার্কেন নামের এক অন্তঃসত্ত্বা ভদ্রমহিলা ইতালির ফ্লোরেন্সে গিয়েছিলেন, উফিজি মিউজিয়ামে পেইন্টিং দেখতে। তো তিনি যখন একে একে বিখ্যাত সব শিল্পীদের চিত্রকর্ম পরিদর্শন শেষে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’র সামনে এসে দাঁড়ালেন, ঠিক তখনই অবাক কাণ্ডটি ঘটলো! কেউ একজন তাকে লাথি মারলেন! মানে, ভদ্রমহিলার পেটে থাকা অনাগত সন্তানটি হঠাৎ পা দিয়ে কিছুটা মৃদু আঘাত করলেন।

তিনি তো আনন্দে অভিভূত। গত আট-দশ মাস ধরে যে সত্ত্বাকে ধারণ করে আসছেন, সে আজ তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। যতটা সম্ভব দ্রুত দৌড়ে এসে স্বামীর কাছে এ ঘটনা খোলাসা করলেন তিনি। স্বামী ছিলেন শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুরাগী। এই ঘটনাকে তিনি মোটেও খাটো করে দেখেননি বরং সিরিয়াসলিই নিলেন এবং ঘোষণা করে বসলেন—যেহেতু এই ঘটনা ভিঞ্চির পেইন্টিং দেখার সময় হয়েছে, সেহেতু তিনি নিজেদের অনাগত সন্তানের নাম রাখতে চান ‘লিওনার্দো’ দিয়েই।

আপনারা হয়তো ইতোমধ্যে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন, কার কথা বলতে চাচ্ছি। বলছিলাম ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টাইটানিক’র ডেকে প্রেমিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই লম্বা চুলের ‘জ্যাক’ নামের সুদর্শন যুবকের কথা। অর্থাৎ লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও’র কথা।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও—পুরো নাম লিওনার্দো উইলহিলম ডিক্যাপ্রিও। মার্কিন সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী অভিনেতাদের একজন। তিনি কেবল অভিনেতাই নন, লেখক ও প্রযোজকও বটে। অভিনয়ের বাইরে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। যাই হোক, তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন একটা এলাকায়, যেখানে মাদক, যৌনতা ও অশ্লীল কাজের অবাধ বিচরণ ছিলো। অথচ, এমন রুগ্ন সমাজে থেকেও তিনি নিজেকে সবসময় ওসব থেকে দূরে রেখেছেন।

তার বাবা ছিলেন ইতালি ও জার্মান বংশোদ্ভূত। নানা উইলহেম ইন্ডেনবার্কেন ছিলেন একজন জার্মান। নানী হেলেন ইন্ডেনবার্কেন ছিলেন একজন রুশ বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক। তার কোনো ভাই-বোন নেই। তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।

আসলে ডিক্যাপ্রিওর পুরো শৈশবটাই ফিল্মের মতো রোমাঞ্চকর ছিলো। তার বাবা-মা কলেজে পড়াকালীন সময়ে পরিচিত হয়েছিলেন এবং পরে বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। অবশ্য ডিক্যাপ্রিওর এক বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ সময়ে তিনি তার মায়ের সাথে ছিলেন। তার শৈশবের বেশ কিছু সময় তিনি জার্মানিতে তার নানা-নানী উইলহেম ও হেলেনের সাথে কাটিয়েছেন। জার্মান ও ইতালিয়ান এ দুটো ভাষাই তার ভালো দখলে রয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই তিনি মাদকের ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন। তাই জীবনে কখনো মাদকদ্রব্যকে ছুঁয়েও দেখেননি। সম্ভবত জীবনের অন্যতম কঠিন রোলটি করলেন—‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’ সিনেমায়। এই সিনেমার জন্য তিনি নাকি এক বিন্দু মাদকও স্পর্শ করেননি, অথচ সিনেমা দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। সবই প্রযুক্তির কারসাজি!

যাই হোক, ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের মধ্যদিয়ে তিনি প্রথম ক্যামেরা সামনে দাঁড়ান। এরপর ‘সোপ অপেরা’ ‘সান্তা বারবারা’ এবং ‘দি সিকটম গ্রোয়িং পেন’-সহ বেশ কয়েকটি টিভি ধারাবাহিকে সফলভাবে অভিনয় করেন। কিন্তু শুরু থেকেই তার মূল ধ্যানজ্ঞান ছিলো সিনেমার বড় পর্দা।

১৯৯১ সালে প্রথম কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি আসে। ওই বছর মুক্তি পায় স্বল্প বাজেটের হরর-সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘ক্রিটার্স-৩’। এই সিনেমার মধ্যদিয়েই মূলত তার হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে পদার্পণ। তবে ক্যারিয়ারে প্রথম বড় সুযোগ আসে ১৯৯২ সালে, যখন প্রায় ৪০০ শিশু শিল্পী থেকে রবার্ট ডি নিরো নিজে তাকে ‘দিস বয়েজ লাইফ’র জন্য মনোনীত করলেন। পরের বছর ১৯৯৩ সালে তিনি ‘হোয়াটস ইটিং গিলবার্ট গ্রেপ’ সিনেমায় বিখ্যাত অভিনেতা জনি ডেপের মানসিক বিকারগ্রস্থ ছোট ভাই ‘আর্নি গ্রেপ’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা দুটোই জোগাড় করে নেন।

মার্কিন সিনেমার এই হার্টথ্রব ক্যারিয়ারের শুরুতে সহ-অভিনেতা হিসেবে নাম লেখালেও ধীরে ধীরে কিছুটা দর্শক প্রিয়তা পেতে থাকেন। ফলে, ১৯৯৫ সালে ‘বাস্কেটবল ডায়েরিজ’ এবং ১৯৯৬ সালে ‘রোমিও-জুলিয়েট’ সিনেমায় মূল নায়কের চরিত্র প্লে করার ডাক পেয়ে যান। কিন্তু, জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে ১৯৯৭ সালে। জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ সিনেমাটি তার পুরো জীবনটাকেই আমূলে পাল্টে দেয়। ওই সিনেমায় ‘টাইটানিক’ জাহাজটি ডুবে গেলেও, ‘জ্যাক’র চরিত্রে অভিনয় করে ডি ক্যাপ্রিও কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রেমিক পুরুষ হিসেবে আজও ভেসে আছেন।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ১৯৯৮ সালে তিনি বিখ্যাত পরিচালক উডি অ্যালেনের ব্যঙ্গধর্মী চলচ্চিত্র ‘সেলিব্রেটি’ ছবিতে অভিনয় করেন। একই বছর তাকে র‍্যান্ডাল ওয়ালেসের ‘দ্য ম্যান ইন দ্য আয়রন মাস্ক’ চলচ্চিত্রে রাজা চতুর্দশ লুই ও তার ভাই ফিলিপের দ্বৈত চরিত্রেও তাকে দেখা যায়। ২০০০ সালে ডি ক্যাপ্রিও ‘দ্য বিচ’ সিনেমায় অভিনয় করেন। নাট্যধর্মী এ সিনেমায় তাকে একজন মার্কিন ভ্রমণকারীর চরিত্রে দেখা গেছে, যিনি থাইল্যান্ড উপসাগরের একটি নির্জন দ্বীপে জীবনযাপনের সংকল্প করেন।

এবার বরং নিজেকে ভাঙার পালা। ‘ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান’ ‘গ্যাংস অব নিউইয়র্ক’ ছবিতে অভিনয়ের পর রোমান্টিক হিরো থেকে ডি ক্যাপ্রিও নিজেকে আবিষ্কার করলেন অ্যাকশন হিরো হিসেবে। ‘দ্য অ্যাভিয়েটর’ ‘দ্য ডির্পাটেড’ ‘শাটার আইল্যান্ড’ ছবিগুলো তার ক্যারিয়ারে ভিন্ন একটা মাত্রা যোগ করে। মাঝে দিয়ে আবার ক্রিস্টোফার নোলানের পরিচালনায় ডিক্যাপ্রিওর সিনেমা—‘ইনসেপশন’। বিখ্যাত এ সিনেমাটি নিয়ে আপাতত কিছু না বলাই শ্রেয়।

এখন পর্যন্ত তিনি চল্লিশটির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন। অসাধারণ অভিনয়ের ফলে অসংখ্য পুরষ্কার ও প্রশংসা জুটেছে তার কপালে। কিন্তু ‘একাডেমি অ্যাওয়ার্ড’টাই যেন তার হাতে ওঠতে চাইছিলো না! পাঁচ পাঁচবার অস্কারে মনোনয়ন পেলেও প্রত্যেকবারই তার হাত থেকে ফসকে গেছে অস্কার নামক সোনার হরিণটি। তবে সকল ধরনের আলোচনা-সমালোচনার অবসান ঘটিয়ে গত বছরের অস্কার আসরে ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে ষোলকলা পূর্ণ করলেন হলিউড সিনেমার এই মহারথী।

১৯৭৪ সালের ১১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার জন্মগ্রহণ করেন ডি ক্যাপ্রিও। তার পুরো নাম—লিওনার্দো উইলহিলম ডি ক্যাপ্রিও। তার বাবা জর্জ ডি ক্যাপ্রিও ছিলেন একজন কমিক শিল্পী, একই সঙ্গে কমিক বই পরিবেশকও। আর, মা আর্মেলিন ছিলেন ওই সময়ের নামকরা আইন সচিব।

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, তিনি এবার লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চরিত্র করবেন। আশির দশকে ‘মোনালিসা’র সামনে দাঁড়িয়ে সেই ভদ্রমহিলাটি কি ঘুনাক্ষরেও এমনটা ভাবতে পেরেছিলেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।