সুখ || ছোটগল্প

সকালটা শুরু হওয়া দরকার সকালের মতোন।

ঘুম থেকে ওঠা মাত্র গরম এক কাপ চা আসবে। ল্যাপটপে একটা হালকা রবীন্দ্রসংগীত বাজবে। এইভাবে দশটা মিনিট যাবে। মঈনের দিনের সবচেয়ে সুখের সময়।

বিশেষ করে আজকের দিনে এই সেলিব্রেশনটা করার কথা ছিলো আরও কায়দা করে। আজকে মঈনের জন্মদিন। তিরিশ-পয়তিরিশ পার হয়ে গেলে জন্মদিনের পালন করার কোন মানে হয় না। তারপরেও নিজের কাছে এটা একটা স্পেশাল দিন। এই দিনে মঈন আর অফিস-টফিস যায় না। একটু লম্বা ঘুম, তারপর দুপুর পর্যন্ত টানা রবীন্দ্রসংগীত, বিদেশ থেকে গিফট পাওয়া ডেভিডফের টিনের বাকশ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে বড় করে টান- এই তো সেলিব্রেশন!

ভোর পাচটার সময় পর পর কয়েকটা কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। বাড়িওয়ালার বড় মেয়ে। তার বাবার নাকি বুকে খুব ব্যাথা। এক্ষন হসপিটালে নেয়ার দরকার!

সারা সকালটা কেটেছে হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করে। বাড়িওয়ালার তিন মেয়ে, বড়টাকে মঈনের সাথে জুড়ে দেবার খুব শখ। তাই ও বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে ডালটা মাংসটা পোলাওটা তার ঘরে আসে। আজকে সারা সকাল দৌড়াদৌড়ি করে পোলাও-মাংসের শোধ দিতে হয়েছে।

সেই দৌড়াদৌড়িরও একটা মানে দাড়াতো যদি বাড়িওয়ালার তেমন কিছু ধরা পড়তো। পুরোটাই নাকি গ্যাসের ব্যাথা! ডাক্তার দুটো গ্যাসের বড়ি খাইয়ে ছেড়ে দিয়েছেন! মঈনের মেজাজটা খিচড়ে গেছে। এই গ্যাসের কারণে তার দিনের আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেলো!

যেদিন শুরুটা ঠিকমতো হয় না, সেদিন কোনকিছুই আর ঠিকমতো হয় না। ডেভিডফের কৌটা খুলে দেখে এক্কেবারে খালি। এমন তো হবার কথা না! গুনে গুনে তিনটা থাকার কথা। খুব দামী সিগারেট, হাসান এনে দিয়েছিলো গতবার আমেরিকা থেকে ঘুরে। মঈন শুধুমাত্র স্পেশাল দিনে একটা ধরায়। ষোলোই ডিসেম্বরে একটা ধরিয়েছিলো, আর থাকার কথা তিনটা। কে নিলো? চোর এসেছিলো নাকি? আর চোর এলে আর কিছু না নিয়ে কেবল সিগারেট চুরি করবে- এ কেমন চোর?

দান দান তিন দানে মেজাজ খারাপ করার মতো কারণ হয়েছে। হাসান এসেছে বাসায়। তার সাথে তার বাসায় যেতে হবে।

স্কুল-কলেজের বন্ধু অনেক পয়সাওয়ালা হয়ে গেলে বা ক্যারিয়ারে ধুমধাম উন্নতি করে ফেললে তাতে বন্ধুত্বে কোন ঘাটতি পড়ে না। বা তুই-তোকারিতেও কোন খামতি থাকে না। তারপরেও কিছু কিছু ব্যাপার মানতে হয়। সামাজিক ব্যবধান অনেক বেড়ে গেলে তখন আর সবকিছুতেই সামাজিকতা করতে হয় না, হিসেব করে সামাজিকতা করতে হয়।

হাসানটার পয়সাকড়ি হলেও এখনও গাধাই থেকে গেছে। ব্যাচেলর বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে এসে মানুষ খুব মদ-গাজা টেনে যায়, কিন্তু নিজের বাড়িতে সপ্তাহে দু’বার টেনে নিয়ে কেউ খাওয়ায় না। সেখানে বউ বাচ্চা আছে, একটা বয়সের পর ব্যাচেলর বন্ধু-বান্ধবের সাথে ওঠাবসা করলে গিন্নীরা চোখ টাটায়। কিন্তু হাসান তাকে জোর করে নিয়ে যাবেই। মঈনেরও ভালোই লাগতো একটা সময় পর্যন্ত, এখন কেন যেন আড়ষ্ট লাগে।

হাসানের স্ত্রী মিলা আজকে একটু সময় নিয়েই সেজেছে বোঝা যাচ্ছে। টিয়া রঙের একটা জর্জেটের শাড়ি। মুখে একটু সময় নিয়ে প্রসাধন দেয়া। এইসব কেমন করে যেন টের পাওয়া যায়।

হাসানের একটাই মেয়ে, তন্মনা। এইবার দশে পা দিলো। আসার পরপরই গাল ফুলিয়ে বললো- মঈন চাচ্চু, গতমাসে আমার বার্থডে ছিলো। তুমি একবারও আসলে না?

মঈন একটু বিব্রত হাসি দিলো। তন্মনার জন্মদিন তার খুব ভালো করেই মনে ছিলো। আসতে ইচ্ছে করেনি। ইদানিং কেন যেন ইচ্ছে করে না!

মিলাও যেন ঠেস দিলো মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে – নিজের জন্মদিনেই পাওয়া যায় না তোর মঈন চাচ্চুকে, তোর জন্মদিনে আর কীভাবে দেখবি?

হাসানই বরং বাচিয়ে দিলো – আরে, আরে। শুরু করেছো কি তোমরা। ওকে একটু বসতে টসতে দাও। আর মঈন, এসেই কিন্তু যাই যাই করবি না। তোর ভাবী শখ করে কিছু রান্নাবান্না করেছে। তারপর আজকে আমরা মিলার গান শুনবো। আগে তো খুব ওর গলায় গান শুনতে চাইতি। এখন তোকে পাওয়াই যায় না।

ড্রইংরুমে আসর বসেছে। ওরা চারজনই, আর কেউ নেই। অনেকদিন আগে এমন আসর প্রায়ই হতো, এখন আর হয় না।

মিলা এখন ধরেছে মঈনের খুব পছন্দের একটা গান, ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান…

হাসান বসেছে মঈনের গায়ে ঠেস দিয়ে। হাতের গেলাসে কী যেন একটা। ভদকা? মার্টিনী? ওসব মঈনের চলে না, আগ্রহও নেই।

আবেশে হাসানের চোখ প্রায় বুজে এসেছে। গানের ঝোঁকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো – পৃথিবীতে সবচেয়ে আপন হলো দুটা জিনিস। সবচেয়ে সুখের। একটা হলো নিজের সন্তান, আরেকটা হলো পরের স্ত্রী। আমার তো একটা সুখ হয়েছে, তোর তো কোন সুখই হলো নারে শালা…

মঈন মনে মনে বললো – আমি দু’টা সুখই পেয়েছিরে শালা… তুই কিছুই পাসনি। তুই জিরো।

হাসানের গ্লাস থেকে তরল কিছুটা ছলকে পড়েছে সোফায়। তন্মনা এসে বাবার কাধে ঝাকুনি দিলো- বাবা, বাবা…

ওদিকে মিলার কিন্নর গলায় ভেসে চলেছে আসর-

তোমার অশোকে কিংশুকে

অলক্ষ্য রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে,

তোমার ঝাউয়ের দোলে

মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান…

মঈন মাথা দোলালো। একটু সোজা হয়ে গান শুনলো মনোযোগ দিয়ে। একটু মুচকি হেসে আবার হেলান দিলো হাসানের এলানো পিঠে।

নাহ, জীবনে অতোটা অসুখী বোধহয় সে না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।