সিলেটে ১৮৪৫ সালে হয়েছিল উপমহাদেশের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ!

রাজধানী ঢাকার কোলাহল থেকে দূরে, উত্তর-পূর্বের সিলেট শহর আপনাকে একটি অদ্ভুত অনুভূতি দেবে। ঘন সবুজ উপত্যকা, সুরমা নদী এবং একটি হালকা গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু এই জায়গাকে একটি নিখুঁত পর্যটক ‘গন্তব্য’-এ পরিণত করেছে। এই শহরের সবকটি সুন্দর আকর্ষণের পাশাপাশি সবচেয়ে নতুন সংযোজিত আকর্ষণ হল লাক্ষাতুরা (লাক্কাতুরা) চা বাগানের মাঝখানে অবস্থিত সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম। চোখ ধাঁধানো, মোহনীয় এক স্থাপনার সাথে প্রকৃতির মিশেল – রীতিমত স্বর্গীয় এক ব্যাপর।

এই স্টেডিয়ামটি আগে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম হিসাবে পরিচিত ছিল। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সম্পূর্ণ নতুন সাজে সজ্জিত হয়। মূল শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থানকারী স্টেডিয়ামটি আইসিসির এক বছরের ওয়ানডে ম্যাচের জন্যে অনুমোদন পেয়েছিল এবং এখানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নারী ও পুরুষ অংশের বেশ কয়েকটা ম্যাচ আয়োজিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আইসিসি অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপেরও ভেন্যু ছিল এটা। এরপর কালক্রমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই মাঠে খেলেছে বাংলাদেশও। আইসিসির ১১৬ তম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে এর অভিষেকও হয়ে গেল এবার।

আইসিসির এসব বড় টুর্নামেন্টগুলো সামনে রেখে মূল প্যাভিলিয়ন ভবন এবং মিডিয়া সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল, ফ্ল্যাডলাইট স্থাপন করা হয়েছিল এবং স্ট্যান্ডগুলোতে বসার ব্যবস্থা সংস্কার করা হয়েছিল। এখানে বর্তমানে চারটি ড্রেসিং রুম আছে এবং সমস্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধাগুলি রয়েছে। বছর দুয়েক আগ পর্যন্ত, এই মাঠে দর্শক ধারণ ক্ষমতা ছিল ১৩,৫২২। তবে বর্তমানে সেই সংখ্যাটি বেড়েছে  হয়েছে প্রায় সাড়ে আঠারো হাজার।

সিলেটের মাঠে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন

স্টেডিয়ামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল বাংলাদেশের প্রথম ঘাসের প্যাভিলিয়ন যা ‘গ্রীন গ্যালারি’ নামে পরিচিত। মাঠে এটা ভিন্ন আমেজ যোগ করেছে, ইউরোপিয়ান অনেক ভেন্যু কিংবা দুবাইয়েও এখন যেটা প্রায়ই দেখা যায়। উপমহাদেশে ক্রিকেটের ভেন্যু গুলোর মধ্যে দর্শনগত সৌন্দর্যের বিচারে সিলেটের আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের নাম ভারতে ধর্মশালা স্টেডিয়ামের পরেই রয়েছে।

বাংলাদেশের দুটি জনপ্রিয় ক্রিকেট কেন্দ্র-ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া এর পরিবর্তে সিলেটের মনোরম আবহাওয়া ক্রিকেটের জন্য নিখুঁত। এখানকার সকালের কুয়াশাচ্ছন্নতা ফাস্ট বোলিংয়ের জন্য উপকারী। খোলা স্ট্যাণ্ড গুলি বাতাসের চলাচলে সহায়তা করে, আর এটা খেলোয়াড়দের জন্য খুবই আরামদায়ক। সিলেটের রাতগুলোও দারুণ; ফ্লাডলাইটের আলোয় বোলাররা ত্রাস হয়ে উঠতে পারেন। এখানে পাঁচটি সেন্ট্রাল উইকেটের পাশাপাশি অনুশীলনের জন্য পাশেই আছে আলাদা চারটা উইকেট।

বলা যায, অবকাঠামোগত সব রকম সুযোগ সুবিধাই আছে এখানে। কন্ডিশনটা সমর্থকদেরও অনুকুলে, এক কথায় আদর্শ ক্রিকেটীয় পরিবেশ।

সিলেটের সাথে ঢাকা, বঙ্গোপসাগর, সড়ক ও রেলওয়ের সাথে ভালভাবে সংযুক্ত রয়েছে এবং শহরটি পাঁচটি পাঁচ তারকা হোটেল রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ম্যাচ হোস্টিং করার সময় কোন যুক্তিযুক্ত উদ্বেগ প্রদান করেনা। সিলেট একটি পর্যটন স্থান হওয়ায়, একটি বড় ম্যাচগুলো সমগ্র দেশ থেকে অনেক দর্শককে টানতে পারবে। আর এটা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভাল।

তবে এমন সুন্দর পরিবেশ এবং বিশ্বমানের সুবিধা সত্ত্বেও, সিলেটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয় না বললেই চলে। তিন বছর আগে স্টেডিয়ামটি ওয়ান ডে ম্যাচ আয়োজন করার অনুমোদনপাওয়া সত্ত্বেও এখানে এখনও ৫০ ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছয়টি পুরুষ এবং ২৩ টি নারী ক্রিকেট ম্যাচের পর এই মাঠে কোন আন্তর্জাতিক ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজনই হয়নি (২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচ ব্যতীত)।

২০১৭ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে, একটি হালকা ভূমিকম্প এবং কালবৈশাখী (ভারী ঝড়) সিলেটে আঘাত হানে এবং দুর্ভাগ্যবশত, মিডিয়া সেন্টারের কয়েকটি বিভাগ এবং স্টেডিয়ামের প্রধান প্যাভিলিয়নের প্রেসিডেন্ট বক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মেরামত হয়েছে। এরপর সেখানে বসেছে জমজমাট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) আসর। এবার তো খেলতে চলে গেল খোদ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলই। প্রথমবারের মত স্বাগতিক দেশ খেলতো নামলো সিলেটের নয়ন জুড়ানো ভেন্যুতে।

‘Nation at Play A History of Sport in India’ – বইয়ের অংশ বিশেষ

যখন ক্রিকেটের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বলা হয়, তখন একটি বিশেষ কারণে সিলেটের নাম স্মরণ করতেই হয়। বহু কাল পূর্বে, সেই ১৮৪৫ সালে উপমহাদেশের প্রথম রেকর্ডকৃত ম্যাচটি বিশ্বের এই অংশেই খেলা হয়েছিল।

‘স্পটলিং ইন্টেলিজেন্স’ ম্যাগাজিন, ১৮৪৫ সালের তিন মার্চ ভারতীয় ‘সিপাহী’ এবং ইউরোপীয় অফিসারদের মধ্যে এই ম্যাচের খবর বেশ ‍গুরুত্বের সাথে ছাপিয়েছিল। নিবন্ধটি সিলেটের ম্যাচের কথা উল্লেখ করে। আজ পর্যন্ত ক্রিকেট ইতিহাসবিদরা এই ম্যাচটিকে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রেকর্ডকৃত ক্রিকেট ম্যাচগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেন।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ রণঞ্জয় সেন তাঁর নেশন অ্যাট প্লে: অ্যা হিস্টোরি অব স্পোর্টস ইন ইন্ডিয়া বইয়েও এই ম্যাচের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও, এটাই উপমহাদেশের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ কি না সেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে।

সিলেটে শ্রীলঙ্কা দলের অনুশীলন

শহরটির ইতিহাস, ঐতিহ্য, ক্রিকেট সংস্কৃতি এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গুলি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করার জন্য অসাধারণ। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সিলেট বরাবরই পিছিয়ে পড়ছে। ভারতের পরে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এশিয়ান ক্রিকেটের উপকেন্দ্রগুলির একটি হিসেবে গড়ে উঠছে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ঘরের মাঠে যে পরিমাণ ম্যাচ খেলতে শুরু করেছে, তাতে বিসিবি সিলেটের জন্য প্রতি বছর এক বা দু’টি ম্যাচ সহজেই বরাদ্দ করতে পারে।

বস্তুত এই মাঠের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা টেস্ট ক্রিকেটের জন্যে খুবই উপযুক্ত। যথাযথ কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই আইসিসি’র কাছে এই মাঠের টেস্ট স্ট্যাটাস দাবি করতেই পারেন!

– ক্রিকেটসকার.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।