ব্যবসাটাই মুখ্য, সিনেমা-শিল্প তাই ধর্ষিত

যে জনতা সিনেমা হলে অন্তর জ্বালা ছবির শুটিং হয়েছে সেই জনতা সিনেমা হলেই সম্ভবত ছবিটি মুক্তি পায়নি। যতটুকু জানি পিরোজপুরের জনতা সিনেমা হলটি বেশ কয়েক বছর ধরেই খুব শোচনীয় অবস্থায় আছে। হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা ধুঁকে ধুঁকে চলছে।

এই হলটির সাথে আমার ব্যাক্তিগত কিছু আবেগ জড়িত আছে। পিরোজপুর নামের ছোট্ট শহরটিতে দুইটি সিনেমা হল ছিলো। জনতা আর অনামিকা। অনামিকার চেয়ে জনতা যেমন সব দিক থেকেই এগিয়ে ছিলো তেমনি আমার বাসার খুব কাছে হওয়ায় আমি পিরোজপুর থাকাকালীন এই হলেই সিনেমা দেখতাম। আমার বাসা থেকে পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিটের পথ। জীবনের প্রথম হলে গিয়ে ছবি দেখা এই হলেই। কাজের মেয়ে, আম্মাজান, এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির মত সুপারহীট ছবিগুলো এই হলেই দেখা।

এক সময় এই হলটি পিরোজপুরের সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের প্রধান আকর্ষনের জায়গা ছিলো। মহিলা দর্শকদের জন্য আলাদা জায়গা ছিলো যেখানে নারী ও শিশুদের কলরবে মুখর থাকতো।

কিন্তু ২০০০ সালের পর সারা দেশের মত এই হলটিও কাটপিস নামক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। মেঘলা আকাশের মত সুনির্মিত ছবিতেও কাটপিস (ছবির সাথে জোড়া লাগানো দেশী পর্ন) দেখা যায় হলটিতে। দিনে দিনে মহিলা দর্শক বিলুপ্ত হতে থাকে। শোনা যায় কালো পর্দায় ঘেরা ফাঁকা মহিলা কেভিনটি বিশেষ ব্যাবসায় ব্যাবহার হওয়া শুরু হয়। লুঙ্গি পড়ে এক শ্রেনীর পুরুষ দর্শক (বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিশোর ছাত্র এবং যুবক বয়সী শ্রমিক) হলটিতে ভীড় করতে থাকে। স্রেফ কাটপিস দৃশ্য দেখার উদ্দেশ্যেও নাকি কেউ কেউ যেত।

ক্ষমতাবান মালিকের সেই হলটিতে ব্যাবসা রমরমা হয়ে উঠে। ৫ হাজার, ১০ হাজার টাকায় পুরনো ছবি বুকিং দিয়ে সাথে গরমাগরম কাটপিস জুড়ে দিলেই লাখ টাকার ব্যবসা! ব্যবসাটা মুখ্য ছিলো, শিল্পটা তাই ব্যবসায়ীর কাছে ধর্ষিত হয়েছে। আজ সেই হলটি মর মর। অবৈধ ব্যাবসা ক্যান্সার হয়ে হলটির সাড়া শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এত কথা যার জন্য বললাম, অন্তর জ্বালা ছবিটি দেখিছি। আমি এই ধরনের ছবিতে বিশ্বাসী না যদিও। কিন্তু নিজের শহর (যে শহরে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে) পিরোজপুরকে প্রথমবারের মত রুপালী পর্দায় দেখার লোভ সামলাতে পারেনি।

পিরোজপুর আমার কাছে এক মায়ার শহর। যদিও অন্তর জ্বালার নির্মাতা পর্দায় আমার শহরের মায়া ছিটেফোঁটাও তুলে আনতে পারেনি। প্রত্যাশাও তো তেমন ছিলো না। মালেক আফসারীর মত নির্মাতার কাছে প্রত্যাশা করাটাও অযৌক্তিক। তবে সারপ্রাইজিংলি বানিজ্যিক ছবি হিসেবে ছবিটা খারাপ লাগেনি। গল্প আসল, নকল এ বিষয়ে আমার জ্ঞান কম কেননা সাউথ ইন্ডিয়ান ছবি আমি দেখি না। তবে বানিজ্যিক ছবি হিসেবে সবমিলিয়ে ঠিকঠাক একটি ছবি। আজকাল এইটুকুই বা কয়টা ছবিতে পাওয়া যায়।

ছবিটি হয়তো আমি ফেসবুকে বা ইউটিউবে ভাল বলেই প্রচার করতাম। কিন্তু আমার মন সায় দিলো না। যে ছবি আমার আবেগের শহরে শুট করা সে ছবিকেও আমি প্রমোট করতে পারলাম না।

না … জায়েদ খান অভিনয়টা ততটাও খারাপ করেননি। পরিমনি তো বরাবরই প্রিয়। জয় চৌধুরী ভালই তো করেছে। নতুন আরেকটা মেয়ে ছোট্ট চরিত্রে খুব ভাল। নির্মাতাও নির্মানে ততটা খারাপ না। তবে কি- যে নির্মাতা চুরি করেও বড় গলায় বলে যে সে চুরি করেছে এবং শুধু তাই না বরং দাবী জানায় সবাইকে চোর হতে তাকে আর যা ই হোক সমর্থন দিতে আমার ঘৃনাবোধ হয়।

চোর চুরি করে যতই কোটিপতি হোক ‘হতদরিদ্র কিন্তু সৎ’ ব্যাক্তির পাশে সে কুকুরের চেয়েও মূল্যহীন।

তাই চোর যখন সৎ ব্যাক্তিকে গরীব হওয়ায় কটাক্ষ করে কিংবা সততার প্রাকটিস্‌ পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলে তখন সে চোরকে সমর্থন নয় বরং ঘৃনা জানানো উচিত।

যাই হোক, অন্তর জ্বালা আহামরী কোন ছবি না। আবার যতটা খারাপ বাংলা বানিজ্যিক ছবিগুলো হচ্ছে এটা সেই তুলনায় কিছুটা হলেও ভাল। কিন্তু এমন নির্মাতার ছবিকে আমি সমর্থন দিতে পারছি না। আপনাদের সমর্থন দিতে ইচ্ছে হলে দিন। আর দেখতে চাইলে একবার দেখতেই পারেন। নিদানের দিনে মন্দের ভাল ছবি একবার দেখাই যায়। ধন্যবাদ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।