সিনেমা বানাতে কী লাগে!

সবার আগে নিজের মধ্যে ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরী। নাহলে আর দশটি বাংলা, হিন্দি বা তামিল সিনেমার পরিচালকের সাথে আপনাকে আলাদা করা যাবে না। নিজের অবস্থানটি ভালো করে বুঝতে শিখুন।লোকের কথায় কান না দিয়ে নিজে বিচার করে দেখুন। সবাই যাকে ভালো বলে তাকে না বুঝে  ভালো বলতে যাবেন না আবার মেইন্সস্ট্রিমের বিপরীতে যাওয়ার জন্য অকারণে কাউকে বা কিছুকে গালমন্দ শুরু করবেন না। মনে রাখবেন, সিনেমা বানাতে অনেক কিছু লাগে না- সেটা বাংলা, হিন্দি, তামিল এবং আরো বহু পরিচালক বহুভাবে দেখিয়েছে। কিন্তু ‘ভালো’ সিনেমা বানাতে অনেক বেশি কিছু লাগে এবং সেটা এদেশের এমনকি বাইরেরও খুব কম লোকই দেখাতে পেরেছে। আপনার মনে ও মস্তিস্কে এখন থেকেই ‘ভালো’ সিনেমা, ‘ভালো’ অভিনয়ের বারটাকে সেট করে নিন, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেটিকে একটু একটু করে উঁচু করুন।

ভালো গল্প এবং স্ক্রিপ্ট নির্বাচন করুন। ফিল্মমেকার হতে হলে তার গল্প বানাতে পারদর্শী হওয়া কাঙ্খিত, যদি আপনি তা না হোন, তবে বৃথা গল্প বানানোর চেষ্টা বাদ দিন। আপনার কাজ ডিরেক্টিং, গোটা পৃথিবীতে কোটিখানেক ভালো গল্প পড়ে আছে যা দিয়ে এখনো সিনেমা বানানো হয়নি, সেগুলো থেকে গল্পকারের অনুমতি সাপেক্ষে কোন একটি আপনার সিনেমার জন্য নির্বাচন করুন। স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এও আপনাকে প্রফেসর হতে হবে এমন কোন কথা নেই। হতে পারে আপনি লেখালেখিতে একেবারেই পারদর্শী না, কিন্তু সেগুলোর চিত্রায়নে আপনি অসাধারণ। রেয়ার কেস, সন্দেহ নেই, কিন্তু হাল না ছেড়ে লেগে থাকুন।

বাংলাদেশে মুভি মেকিং এ কোন কোন্ জেনর গুলো নতুন, কোন্‌গুলো নিয়ে কাজ হয় না ?খুব সহজ উত্তর- প্রেমভালবাসা বাদে অলমোস্ট আর সবকিছু। থ্রিলার, হরর, কমেডি (ভালো মানের, সস্তা নয়) হিস্টোরিকাল,সাইফাই বা কন্সেপচুয়াল- সবগুলোতে কাজ এখনো প্রায় শূন্যের কোঠায়। এগুলোর মধ্য থেকে কিছু একটা বেছে নিন এবং কাজ শুরু করুন। বলছি না আপনি রোমান্টিক মুভি বানাবেন না, অবশ্যই বানাবেন। সেক্ষেত্রেও চেনা পরিচিত বৃত্তটিকে আরো বড় করুন বা বেরিয়ে আসুন।

কোন একজনকে ‘গুরু’ বা ‘শেষকথা’ বলে মনে করবেন না। গুরু অর্থ টিচার হলে দোষ নেই কিন্তু তার পরিধির বাইরে যাতায়াত ও চিন্তা করা শিখুন। বাংলাদেশে এমন অনেককে দেখেছি তানভীর মোকাম্মেল, ফারুকী, তারেক মাসুদ- এদের সাথে কাজ করেছেন। এইসব প্রতিভাবান ছেলেদের মধ্যে যে সমস্যাটা হয়, তারা তাদের শিক্ষককেই ফিল্মমেকিং এর শেষ কথা মনে করে বসেন এবং এরচেয়েও মারাত্মক যেটি, তারা তাদের এক্সপেরিয়েন্স বা জ্ঞান আত্মস্থ করা বাদ দিয়ে ‘মাথা’টাকে ধার করে বসেন। তাই গুরু যে ধরণের ছবি বানান, তারাও তার বাইরের বলয়ে হাঁটতে পারেন না। এখানে কাউকে ছোট করা হচ্ছে না, তারা সবাই গুণী পরিচালক- তবে আপনি যদি সত্যি মুভি বানিয়ে অমর হতে চান- তবে নিজের জেনর নিজে তৈরি করুন।

এমনকি হিচকক, স্পিলবার্গ, নোলান, টারান্টিনো, রিডলি স্কট, স্করসেস, সত্যজিৎ, কুবরিক, মাজিদ, ফরহাদি, কিম কি দুক- এদেরকেও শেষ কথা বলে মনে করবেন না। সবার মুভি দেখুন, এপ্রিশিয়েট করুন ও সেখান থেকে শিক্ষা নিন। আজ আপনি যাদের আইডলাইস করে ফেলছেন, এর ফলে কিন্তু আপনাকে কেউ আইডলাইস করবেনা- করবে আপনার গুরুকেই।

‘বিগ বাজেট’ ‘রেড ক্যামেরা’ ‘এইচডি প্রিন্ট’ ‘আধুনিক প্রযুক্তি’ – এই ব্যাপারগুলো দেখে চমকে যাওয়ার বদলে অনুসন্ধান করুন। পারলে আপাতত দূরে থাকুন। একটি কথা স্পষ্ট, আমরা প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোতে হলিউড বা বলিউডের কাছে একেবারেই ছেলেমানুষ। তাই বলে কি আমরা চেষ্টা করবো না? – এই প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন। তবে মনে রাখবেন, আগের কাজ আগে।

আগে আপনি কাহিনী ও চিত্র্যনাট্যে মন দিন, অভিনয়ে নজর দিন- প্রযুক্তির ব্যপারগুলো পড়ে দেখা যাবে। প্রযুক্তি নিয়ে যতসব নেট প্র্যাক্টিস আজ বাংলা সিনেমায় হচ্ছে- আধুনিক দর্শকের কাছে তা প্রচণ্ড হাস্যকর লাগার একটাই কারণ- সেগুলো হচ্ছে অতিশয় বাজে গল্পের সিনেমায়। ভালো কাহিনী চিত্রনাট্য আর অভিনয়ের পাশাপাশি এই প্র্যাক্টিসটা করা জরুরী- আপনার সাথে সাথে মানুষও বিশ্বাস করা শিখবে- আমরাও আসলে পারি।

আমি ইংলিশ মুভি দেখেছি খুবই কম, আজেবাজে বাংলা এবং হিন্দি মুভি প্রচুর দেখেছি, এটা শোনার পর আপনারা বলতেই পারেন তুই এত বকবকের কে তাইলে? তবে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আমার মধ্যে আমার প্রথম ও দ্বিতীয় পয়েন্ট এবং সাথে ফিল্মমেকিং-এর তীব্র ইচ্ছাটি আছে। যাইহোক, মূলকথায় ফিরে আসি।

কাউকে কোন কিছু বোঝাতে গেলে তাকে আপনার লজিকের সাথে সাথে এক্সাম্পলও দিতে হবে।খুব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করা হয়নি, বাজেট খুবই কম কিন্তু মুভিটি অসাধারণ- এরকম কিছু মুভির নাম মনে করুন।মেমেন্টো, রিসারভয়ের ডগ্‌স, ইট্‌স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ, টুয়েল্ভ এংরি ম্যান, স্ট্রেঞ্জারস অন এ ট্রেইন (এধরণের পুরাতন প্রায় সব মুভি), শশাঙ্ক রেডেম্পশান, সেভেন, বাইসাইকেল থিফ – এরকম হাজারটা আছে। আমি তো মুভি অনেক কম দেখেছি, আপনি তো বেশিই দেখেছেন। আপনি ভাবুন এবং ভেবে ভেবে নামগুলো মনে করুন এবং সেখান থেকে ইন্সপায়ার্ড হন।

কখনো লর্ড অব দ্যা রিংস বা ডার্ক নাইট টাইপ কিছু বানানো হবে না- এই চিন্তাটা এখনই মাথায় এনেন না। নিজের জায়গা তৈরি করুন, হয়তো একদিন হলিউডের প্রডিউসার আপনার মুভি প্রডিউস করবে।মনে রাখবেন, নোলান ব টারান্টিনোকেও ফলোয়িং, মেমেন্টো, রিসারভয়ের ডগস এইসব দিয়েই শুরু করতে হয়েছিল।

সহনশীল হতে শিখুন। আপনার বানানো শর্টফিল্মগুলোকে কেউ বাজে, বস্তাপচা বলে গালাগাল দিলে মাথা গরম করবেন না।পাঁচজন বলবে বুঝে, দশজন ঝোঁকের মাথায়। আপনাকে বুঝদার হতে হবে। যারা বুঝে বলেছে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিন, বাকিদের ইগনোর করুন।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে সংযত ও লজিক্যাল আচরণ করুন। আপনার পছন্দ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া, ভিন্ন সময়ের বা ভিন্ন ধাঁচের মুভি এবং ডিরেক্টরদের মাঝে তুলনা করে বিশাল ক্যাচাল বাধানো, অহেতুক গালাগাল- এগুলো এড়িয়ে চলুন। বাংলাদেশে ফিল্মমেকিং যেহেতু বাপ-চাচার দেখানো পথে হাঁটার মত বিষয় নয়- তাই এই মাধ্যমগুলোতে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা আপনার একান্ত দরকার। হয়তো এদের মাঝেই কেউ হবে আপনার পরবর্তী ফিল্মের প্রডিউসার। সুতরাং, বোকামি করবেন না।

আপনি হলিউডি যে মুভিগুলো দেখে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবেন যে, এরকম মুভি বানাবেন- একবার ভেবে দেখুন তেমন অভিনেতা ইন্ডস্ট্রিতে আছে কিনা। আমি বলবো ইন্ডাস্ট্রিতে নেই তবে বাংলাদেশে আছে।ইন্ড্রাস্টিতে প্রচুর ভাল অভিনেতা আছে সত্যি, তবে আপনার দেখতে হবে কে বা কারা আপনার চরিত্রের সাথে মানানসই। আবার প্রফেশনালিজমের অভাবের কারণে অনেকে আপনার মাদবরি সহ্য করবে না। কিসের ডিরেক্টর, আমি কি কম বুঝি- এই টাইপ একটা ভাব ধরে বসে থাকবে। এদেরকে এড়িয়ে চলুন। দরকার হলে মঞ্চে খুঁজুন বা পথে-ঘাটে, অফিস-আদালতে  যাকে দেখে আপনার মনে হয়- একে দিয়ে অভিনয় হবে, তাকে উৎসাহ দিয়ে গড়ে পিটে নিন।

বাংলাদেশে একশান মুভি বানাবেন, একশান হিরো কোথায়? সুতরাং আপনার মাথায় রাখতে হবে, এখানে সেরকম মানের মুভি বানাতে হলে ক্ষেত্রবিশেষে আপনাকে অভিনেতাকেও গড়ে নিতে হবে। দরকার হলে প্রচুর ইন্টারভিউ নিন। বিলিভ মি, এখানে যে সময় ব্যয় করছেন, তা পরে অনেক সময় বাঁচাবে।

ও আরেকটি কথা, দেশে সকল মডেলকেই অভিনেতা-অভিনেত্রী বানিয়ে দেয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসুন। মনে রাখবেন, সবাইকে দিয়ে অভিনয় হয় না।

প্রচুর প্রচুর এবং প্রচুর মুভি দেখুন- এই পয়েন্টটি লিখতে বাঁধছে কারণ নিজের এখনো কাজটি করা হয়নি। যত দেখবেন তত জানবেন, কোন সন্দেহ নেই। মুভি দেখার সময় প্লেজারের ব্যপারটি বাদ দিয়ে অন্যদিকে নজর রাখা টাফ, তবুও চেষ্টা করুন ক্যামেরার কাজ, এডিটিং ও টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো নজরে আনতে। প্রচুর মুভি দেখার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না, না দেখার একটাই উপকার, তাও সেলফ ডিফেন্সের জন্য বের করা- আপনার গল্প বায়াস্‌ড হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

‘নকল’- বাংলাদেশী বাণিজ্যিক মুভির প্রায় সমার্থক একটি শব্দ। সজ্ঞানে নকল করা থেকে বিরত থাকুন, অজ্ঞানে নকল বলা থেকে বিরত থাকুন। কোন মুভির সামান্য অংশ মিলে গেলেই সেটা বাংলা হওয়ার দোষে নকল বলে চালিয়ে দেবেন না। মুভি বা স্টোরি পৃথিবীতে কোটি কোটি আছে- তার সামান্য একটি অংশের সাথে অন্য একটির মিল না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। আর হ্যাঁ, আপনি চাইলেই আপনার পছন্দের যেকোন ভাষার মুভি অনুমতিসাপেক্ষে রিমেক করতে পারেন, তা মানসম্মত হলে অবশ্যই কেউ দোষ ধরবে না।

১০

(পুরো লেখার সবচে বিতর্কিত অংশ হতে যাচ্ছে সম্ভবত এটি) আপনার মুভিতে আপনি কি ধরণের ভাষা, শব্দ বা নাম ইউজ করবেন তা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার (অবশ্যই সেটা মাত্রা-অতিরিক্ত অশ্লীল বা সমাজ-ধর্ম-রাজনীতি পরিপন্থী না হয় যেন)। আমি অনেক শ্রদ্ধেয় এবং সম্মানিত লোককেই দেখেছি, মুভির নাম কেন ইংরেজি, কেন বাংলা নয়- এই নিয়ে বিশাল তর্ক ফেঁদে বসে। কেউ বলে দেশ ও সংস্কৃতিকে ভালবেসে, কেউ বলে শো অফের জন্য। আমার মতে, এ ব্যাপারটি আপনার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। আপনার যদি মনে হয়, ইংরেজি নামটি সুন্দর, তবে লোকের কথায় তা ছেঁটে ফেলবেন না। মনে রাখবেন, মুভির নাম ইংরেজি দিলে আপনি দেশদ্রোহী হয়ে যাবেন না, বাংলা দিলেও দেশপ্রেমিক হয়ে যাবেন না। দেশপ্রেম এত সোজা ব্যাপার না।

১১

বাণিজ্যিক মুভি বানাবো না বা আর্টফিল্ম বানাবো না- এধরণের গোঁড়ামি বাদ দিন। সিনেমা অবশ্যই একটি ব্যবসা, সুতরাং এর বাজারজাতকরণ আপনাকে করতেই হবে। ভাল মুভি বানানো শিখুন- বাণিজ্যিক আর আর্টফিল্ম তকমাটা একসিরিয়ালে দাঁড়িয়ে যাবে। আপনি হয়তো মুভি বানাবেন আরো পাঁচ বছর পরে, তাতে কি হয়েছে, এখন থেকেই ভাবতে থাকুন কি করে আপনার মুভির সবচে ভাল প্রচার বা মার্কেটিং করা যায়।  এটা সবচে’ বড় ব্যাপার হয়তো না কিন্তু ওয়ান অব দ্যা বিগেস্ট ফ্যাক্টস তো বটেই।

১২

পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে কিভাবে বাংলা সিনেমাকে পরিচিত করা যায় সেই উপায়গুলো ভাবুন। ভাবুন এবং শেয়ার করুন। যারা অলরেডি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শর্টফিল্ম, নাটক বা এই জাতীয় জিনিস বানিয়ে ফেলেছেন, তারা ডিরেক্টর হিসেবে আইএমডিবির অন্তর্ভূক্ত হন। এই বিষয়ে আমি খুব বেশি না জানলেও শুনেছি এটা একান্তই নিজস্ব পদক্ষেপের ব্যাপার। আর ফেসবুকে সিনেমা গ্রুপের সংখ্যা কম নয় বা আপনারও বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা কম নয়। সবাইকে, পারলে জোর করে, ভোট দেয়ার জন্য আইএমডিবিতে রেজিস্ট্রেশন করতে বাধ্য করুন (আমি নিজেও এইদল ভুক্ত নয়, মাত্র মাথায় আসলো ব্যাপারটা)। মান অনু্যায়ী যথার্থ রেটিং দিয়ে বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে সঙ্গী হন।

অনেক বড় লেখা, আশা করি আপনাদের বিরক্তি উৎপাদন করি নি। যারা পুরোটুকু ধৈর্য সহকারে পড়েছেন, তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। ভুলগুলো সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলেই আশা করছি। সবশেষে ধন্যবাদ সবাইকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।