সিনেমা নয়, সত্যিকারের নায়ক

সাত জুলাই, ২০১৭। বেলা এগারোটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাউদকান্দির গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডের পার্শ্ববর্তী ডোবায় পড়ে যায় ঢাকা থেকে মতলবগামী ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ‘মতলব এক্সপ্রেস’ নামে একটি বাস। এসময় যাত্রীদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা-পুলিশের কনস্টেবল মো. পারভেজ মিয়া। তাঁর একক প্রচেষ্টা ও তৎপরতায় বাঁচে যাত্রীদের প্রাণ। বাসের ৪০ জন যাত্রীর মধ্যে ২৬ জনকে তিনি নিজে উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে একটি পাঁচ বছরের শিশুও ছিল।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায়, বাসটি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ডোবায় পড়ে গেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন যখন দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কনস্টেবল পারভেজ মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ময়লা পানিতে লাফিয়ে পড়েন। প্রথমে তিনি দ্রুত গাড়ির জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে দেন। যাতে সহজে গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীরা বেরিয়ে আসতে পারেন। কনস্টেবল পারভেজের উপস্থিত বুদ্ধিতে বাসে আটকা থাকা ২৬ জন যাত্রীর জীবন বাঁচে।

বাসটি যে ডোবায় পড়েছিল, তা ছিল ময়লায় ভর্তি, পচা গন্ধের। দুর্ঘটনার সময় বিকট শব্দ শুনে অনেকে সেখানে এলেও শুরুতে পানিতে নামার সাহস দেখাননি অনেকেই। কিন্তু অসমসাহসী পারভেজ মিয়া দেরি না করে ডোবায় লাফিয়ে নেমে পড়েন। হাতে ইট নিয়ে প্রথমে বাসটির জানালার কাচ ভাঙেন। এরপর ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার শুরু করেন। ডোবার পানিতে ডুবে থাকা বাসের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর পারভেজ মিয়ার সাহসিকতা দেখে স্থানীয় অনেকেই যাত্রীদের উদ্ধার করতে ডোবার পানিতে নেমে পড়েন। শেষে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে যাত্রীদের উদ্ধার শুরু করেন।

পাশ্ববর্তী পেন্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিনা আক্তার বলেন, ‘কনস্টেবল পারভেজের বুদ্ধিবলে রক্ষা পায় বাসে থাকা যাত্রীরা। গাড়িটি ডোবায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল পারভেজ দ্রুত লাফিয়ে পড়েন। তিনি প্রথমে গাড়ির জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে দেন যাতে করে ভেতরে আটকা পড়া যাত্রীরা সহজে বের হতে পারে। তাতে তিনি থেমে থাকেননি। পানির নিচে গাড়ির ভেতর থেকে বের করে আনেন সাত মাসের একটি শিশুকেও।’

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পারভেজের এ কর্মতৎপরতায় গর্বিত হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা। তার সাহসিকতায় কুমিল্লা রিজিয়ন হাইওয়ে পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ ১০ হাজার টাকা, স্থানীয় পেন্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পাঁচ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন।’

এছাড়া হাইওয়ে রেঞ্জ ডিআইজির পক্ষ থেকেও তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থপুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পারভেজ মিয়া একা যেভাবে বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে এতগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচান, এবং এতে যে একজন মানুষও প্রাণ হারায়নি – এ বিষয়টিকে ‘অলৌকিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে।

পারভেজ মিয়ার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেনদী গ্রামে। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন তিনি। উদ্ধারকাজ শেষে পারভেজ মিয়ার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরপর বিপদে পড়া লোকদের বাঁচাতে এগিয়ে যাই। নিজের কথা চিন্তা করিনি। সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। বাসের ৪০ জন যাত্রীর মধ্যে ২৬ জনকে একা বের করে এনেছি। বাসের কাচে হাত কেটেছে। তবে নিজের যাই হোক যাত্রীদের বাঁচাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। উদ্ধারের শেষ পর্যায়ে ৫ বছরের একটি শিশুকেও পানির নিচ থেকে দ্রুত উদ্ধার করতে পেরেছি। এরপর ওই নর্দমায় ডুব দিয়ে খুঁজে দেখেছি আর কোনও যাত্রী আছে কিনা।’

যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়ে দেওয়া এক ঘটনা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।