সিনেমায় চাষাবাদ করেছেন যিনি

১৯৭২ সাল, সদ্য স্বাধীন দেশ, সবার চোখে নানান স্বপ্ন। চলচ্চিত্র পাড়ার মানুষদের ও চোখে একরাশ স্বপ্ন। চলচ্চিত্রকাররা নতুন করে আবার সবাই চলচ্চিত্র নির্মান করছেন। আর সেই সময়ে একজন নির্মান করেন দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, প্রযোজনায় মাসুম পারভেজ ওরফে নায়ক সোহেল রানা।

মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর থেকে অনুপ্রানিত হয়ে সিনেমার নাম রাখা হয় ‘ওরা ১১ জন’। অভিনয় করলেন খসরুসহ ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা, সাথে ছিলেন রাজ্জাক, শাবানাসহ কিংবদন্তিরা। সিনেমাটিকে বাস্তবিক করে তোলার জন্য যা যা প্রয়োজন সবই ব্যবহার করা হয়েছে এই ছবিতে। প্রথম ছবি হলেও পরিচালক নান্দনিকতার পরিচয় দেন। যেখানে মুক্তির আগেই সিনেমাটি ভীষন আলোচিত, সেখানে মুক্তির পর দর্শকদের সাড়া মিলবে এটাই স্বাভাবিক। তা হয়েছে ও, এতবছর পরও এখনো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র এটা।

১৯৮২ সাল, শরৎ সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় চলচ্চিত্রায়ন ‘দেবদাস’। এই উপন্যাস নিয়ে এর আগে ভারতে একাধিকবার সিনেমা নির্মিত হয়েছে, জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। আর সে জন্যেই পরিচালক কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে এটি নির্মান করেন, এবং এতে তিনি বেশ সফল।

এই ছবির জন্য আবারো দর্শকদের মন জয় করে নেন,শরৎ সাহিত্য নিয়ে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দেবদাসের ভূমিকায় বুলবুল আহমেদ এতটাই জনপ্রিয় হয়েছেন যে, আজো তিনি ‘বাংলার দেবদাস’ বলে খ্যাত। পার্বতীর ভূমিকায় কবরীর অভিনয় দেখে বলিউডের দেবদাস দিলীপ কুমার বলেছিলেন এ হচ্ছে আমার দেখা সেরা পার্বতী। এছাড়া এই ছবিতে আরো ছিলেন রহমান, আনোয়ারা প্রমুখ। দর্শকদের মন জয় করা এই ছবিটিকে জুরি বোর্ড রিমেকের অজুহাত এনে পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়।

১৯৮৬ সাল, শরৎ সাহিত্য নিয়ে আবার চলচ্চিত্রায়ন। পরিচালক ইতামধ্যেই এইধারার ছবি করে বেশ খ্যাতি পেয়েছেন। এবার তিনি সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রায়নের জন্য বেছে নিলেন ‘শুভদা’।পরিচালক হিসেবে এবারও তিনি সফল, যারা দেখেছেন সবাই ভূয়শী প্রশংসা করেন।

এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন আনোয়ারা, যা ওনার ক্যারিয়ারের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া এই ছবিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, জিনাত, গোলাম মুস্তফাসহ আরো অনেকে। খন্দকার নুরুল আলমের সুরে এই ছবির গানগুলো ও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

মুক্তির পর দর্শকদের কাছ থেকে প্রত্যাশামাফিক সাড়া না পেলেও জাতীয় পুরস্কারে জয় জয়কার ছিল এই ছবি। সেরা চলচ্চিত্র, অভিনেত্রীসহ সর্বোচ্চ ১৩ টি শাখায় পুরস্কৃত হয় এই ছবি, যা ছিল বিরল ঘটনা। এই রেকর্ড ভাঙ্গতে প্রায় আড়াইযুগ সময় লেগেছিল।পরিচালক নিজেও এই ছবির জন্য দুটি পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৯৭ সাল, মুক্তি পেল কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। এই উপন্যাস অবলম্বনে প্রথম সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, পরবর্তীতে নানা কারনে তিনি আর বানাতে পারেননি।

এর পরে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির এই সাহিত্য নিয়ে কাজ শুরু করে দেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করলে ছবিটির কাজ অসম্পূর্ন রয়ে যায়। পরবর্তীতে সরকারি অনুদানে এই ছবিটি যিনি বানান তিনি ইতিমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য সমাদৃত। বরাবরের মত তিনি এই ছবিটিও বানিয়েও সর্ব মহলে প্রশংসা পেয়েছেন।

এই ছবিতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন সুচরিতা। যার অভিনয় দেখে চারিদিকে জয়জয়কার, এই এক নতুন সুচরিতা যাকে আগে আর কখনো এইভাবে পর্দায় দেখা যায়নি। ওনার ক্যারিয়ারের সেরা ছবির নাম বললে নির্দ্ধিয়ায় এই ছবির নাম আসবে। এছাড়া এই ছবিতে ছিলেন সোহেল রানা, অরুনা, দোদুল, রাজিবসহ আরো অনেকেই। বাংলা চলচ্চিত্রের এই অন্যতম জনপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রটি সেরা অভিনেত্রী সহ ৩ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন, পরিচালক নিজেও পুরস্কৃত হন এই ছবির জন্য।

২০০৫ সাল, মুক্তি পায় রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে দেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘শাস্তি’। অনেক সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এই দেশে চলচ্চিত্র নির্মান হলেও কিন্তু রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে কেউ কাজ করার সাহস করেননি বা এড়িয়ে গেছেন। কেউ কেউ অনুপ্রানিত হয়েছেন বটে, তবে রবি ঠাকুরের নাম উহ্য রেখেছেন। দেশের স্বনামধন্য প্রযোজক সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত এই ছবিটি ভূয়শী প্রশংসিত হয়, নিজের ক্যারিয়ারে এই ছবির পরিচালক আরো একবার নান্দনিকতার পরিচয় দেন। এই ছবিতে অভিনয় শিল্পী ছিলেন রিয়াজ, পূর্নিমা, চম্পা, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ আরো অনেকে। সে বছর সিনেমাটি দুটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার ও লাভ করে।

ওপরে যে পাঁচটি সিনেমার কথা বলা হল সবগুলোর পরিচালক একজনই, যিনি এই ছবিগুলোকে প্রাণ দিয়ে বিখ্যাত করে তুলেছেন, আর নিজেও হয়েছেন কিংবদন্তি। তিনি আর কেউ নন,বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ‘চাষী নজরুল ইসলাম’।

ফতেহ লোহানীর আসিয়া(১৯৬১) ও ওবায়েদুল হকের দুই দিগন্ত(১৯৬৬) ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭২ সালে ওরা ১১ জন সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেন। এরপর সংগ্রাম নামে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মান করার পর,জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ভালো মানুষ’(১৯৭৫) চলচ্চিত্রটি নির্মান করেন। এটা ছিল ওনার নির্মিত প্রথম সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র।

এছাড়াও ধীরে ধীরে বানাতে থাকেন চন্দ্রনাথ, পদ্মা মেঘনা যমুনা, মেঘের পরে মেঘ, সুভা, ধ্রুবতারাসহ বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যনির্ভর প্রশংসিত চলচ্চিত্র। এছাড়া তিনি বঙ্কিম বাবুর ‘বিষবৃক্ষ’ অবলম্বনে নির্মান করেন চলচ্চিত্র ‘বিরহ ব্যাথা’। এটিই আমাদের দেশের বঙ্কিম সাহিত্যের একমাত্র চলচ্চিত্রায়ন, যদিও সিনেমাটি সেভাবে সাড়া জাগাতে পারেনি।

এছাড়া জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রেও উনি পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। মরমী কবি হাছন রাজার জীবনী নিয়ে ‘হাছনরাজা’ নামে একটি সিনেমা নির্মান করেন।উপমহাদেশের প্রখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লার আংশিক জীবনী নিয়ে নির্মান করেন সিনেমা ‘শিল্পী’, এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় ও করেন এই গায়িকা। সিনেমাটি বেশ জনপ্রিয় হয়, পাশাপাশি এই ছবির গান ও এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

গৌরবময় চলচ্চিত্র জীবনের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন এবং মাত্র তিনবার জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করেন। তিনি শুভদা সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও হাঙর নদী গ্রেনেড সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। ওনার সিনেমায় অভিনয় করে অনেক জনপ্রিয় তারকাই জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করেন।উনার নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে চন্দ্রনাথ, শুভদা, বিরহ ব্যাথা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, আজকের প্রতিবাদ, হাঙর নদী গ্রেনেড, হাছন রাজা, মেঘের পরে মেঘ, শাস্তি, দেবদাস(রঙিন) এই সিনেমাগুলি বিভিন্ন শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে চারবার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন চাষী নজরুল ইসলাম। এ ছাড়া চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য, যৌথ প্রযোজনা কমিটির নির্বাহী সদস্য, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সদস্য, ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল লিগ অ্যাসোসিয়েশনের (ডামফা) ফুটবল সম্পাদক, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এছাড়া তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মান করে সফল হলেও অন্যঘরানার চলচ্চিত্রগুলোতে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি। রিমেকেও বেশ ব্যর্থ তিনি। জহির রায়হানের বেহুলা ছবিটি রিমেক করে কোনো মহলেই সাড়া জাগাতে পারেননি, এমনকি নিজের পরিচালিত দেবদাস সিনেমাটি রিমেক করে সফল হননি, বরং দর্শকদের হতাশ করেছেন।

অন্যঘরানার মিয়া ভাই ও দাঙা ফ্যাসাদ ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্রই তেমন আলোচিত হয়নি।যতদূর জানা যায়, ওনার নির্মিত লেডি স্মাগলার নকলের অভিযোগ উঠায় তিনি বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন। ওনার নির্মিত সর্বশেষ সিনেমা ‘ভুল যদি হয়’ ২০১৬ সালে মুক্তি পায়। পরিচালনায় নিয়মিত থাকলেও বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন যার মধ্যে মেঘের পরে মেঘ, এই মন চায় যে উল্লেখযোগ্য।

উনার কাছ থেকে আরো বেশ কিছু ছবি পাওয়ার আগেই তিনি পরপারে চলে যান।২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন। ১৯৪১ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকারের আজ ৭৬ তম জন্মবার্ষিকী। তার আত্মার শান্তি কামনা করি, রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।