সিনেমার জন্যই যাঁর জন্ম

তিন কন্যা এক ছবি

ছন্দা, চম্পা আর ববি

আয় না কাছে আয় না

রাখব তোদের বায়না,

বল না কি কি নিবি!

সেই তিন কন্যার ছোট বোন বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা চম্পা। বড় দুই বোন ছিলেন শীর্ষ নায়িকা, ভগ্নিপতি সেরা চলচ্চিত্রকার। তার জন্মই তো হয় সিনেমার জন্য। তারপরও চলচ্চিত্রে ছিল অনাগ্রহ, ঝোঁক ছিল মডেলিং এর দিকে। তাই তাঁর মিডিয়া জগতে আত্বপ্রকাশ ঘটে মডেল হিসেবে, সেই সময়ে নারী মডেল হিসেবে বেশ সুপরিচিতি পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই ডাক পড়ে টিভি নাটকে। কাজ করেন বেশ কিছু আলোচিত নাটকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বরফ গলা নদী, এখানে নোঙর প্রভৃতি।

চলচ্চিত্রে আত্বপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৫ সালে বড় বোন সুচন্দার প্রযোজনায় শিবলী সাদিকের ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। এই তিন বোন কে শুধুমাত্র এই একটি চলচ্চিত্রেই দেখা গিয়েছিল। শুধুমাত্র বড় বোনের আবদারেই এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

প্রথম চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল, সবার নজর কাড়লেন চম্পা। হাতে আসতে থাকে একের পর এক চলচ্চিত্রের অফার। শুরু করে দেন চলচ্চিত্রে অভিনয়, কাজ করেন নিষ্পাপ, সহযাত্রী, ভেজা চোখ, অবুঝ হৃদয়, কাশেম মালার প্রেম, প্রেম দিওয়ানার মত কিছু রোমান্টিক বানিজ্যিক চলচ্চিত্রে। আর সেই সুবাদে হয়ে যান বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা।

রোমান্টিক ধারার বাইরে গিয়ে সফল হন অ্যাকশন ও সামাজিক চলচ্চিত্রেও। কাজ করেন গর্জন, প্রেম লড়াই, ঘৃনা, জন্মদাতা, দেশপ্রেমিক, টপ রংবাজ, ডিসকো ড্যান্সার, বিশাল আক্রমণ, ত্যাগ, গোলাপী এখন ঢাকায়, পালাবি কোথায়, শেষ সংগ্রামের মত বানিজ্যিক সফল ও আলোচিত ছবিগুলোতে।

রোমান্টিক-অ্যাকশন ধারার বাইরে গিয়েও অন্যধারার ছবিতেও সফল এই নায়িকা, বিশেষ করে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রগুলোতে। সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ করেন চাষী নজরুলের বিরহ ব্যাথা চলচ্চিত্রে, এটি ছিল বঙ্কিম সাহিত্য বিষবৃক্ষ অবলম্বনে।

এরপর কাজ করেন পদ্মা মেঘনা যমুনা, শণ্খনীল কারাগার,পদ্মা নদীর মাঝি, উত্তরের খেপ, শাস্তি, চন্দ্রগ্রহণ, মনের মানুষ এর মত প্রশংসিত চলচ্চিত্রে। পদ্মা নদীর মাঝি ছিল চম্পার নায়িকা থেকে একজন জাত অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার প্রয়াস। সেখানে তিনি শতভাগ সফল, ক্যারিয়ারের সেরা ছবি হিসেবে এই ছবিই বিবেচিত হয়। এছাড়া অন্যধারার ছবিগুলোর মধ্যে অন্যজীবন, এক খন্ড জমি, চন্দ্রকথা উল্লেখযোগ্য।

আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলেও রয়েছে তাঁর সফল পদচারণা। যৌথ প্রযোজনার গৌতম ঘোষের পদ্মা নদীর মাঝিতে কাজ করার পর ভারতে সন্দীপ রায়ের ‘টার্গেট’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ডাক পান। পরবর্তীতে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি লাল দরজা দিয়ে ভূয়শী প্রশংসিত হন। ভারতে তাঁর শেষ কাজ গৌতম ঘোষের আবার অরণ্যে।

তিন কন্যা এক ছবি

অভিনয় জীবনে নায়ক এসেছে অনেকজন। বানিজ্যিক স্বার্থে জুটি বাঁধেন তাঁদের সাথে। নিজের প্রথম নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে জুটি বেঁধে বহু সফল ছবিতে অভিনয় করেন, বাংলা চলচ্চিত্রে এই জুটি অন্যতম জনপ্রিয়। নব্বই দশকের শুরুতে কাঞ্চনের পাশাপাশি মান্নার সাথে একত্রে কাজ করা শুরু করেন।

মূলত মান্নার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল চম্পার সাথে অভিনীত ছবিগুলোই। ক্যারিয়ারের প্রথমদিকের নায়ক আলমগীরের বিপরীতে অভিনয় করেছেন, তেমনি আবার মধ্যগগনে তাঁর মেয়ের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। জাফর ইকবালের সাথেও তিনি বেশ আলোচনায় ছিলেন। অন্যধারার ছবিতেও রাইসুল ইসলাম আসাদের সাথেও বেশ প্রশংসিত ছিলেন।

অভিনয় জীবনে সান্নিধ্য পেয়েছেন বেশ কিছু ভালো ভালো পরিচালকদের। প্রথম পরিচালক শিবলী সাদিকের পরিচালনায় রয়েছে বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। এছাড়া কাজ করেন আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম খোকন, কাজী হায়াত, হুমায়ূন আহমেদ থেকে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, সন্দীপ রায়ের মত কিংবদন্তি পরিচালকদের সাথে।

চলচ্চিত্রের প্রাণ হচ্ছে গান, আর এই প্রাণেও রয়েছে চম্পার সফলতা। চম্পা অভিনীত সিনেমায় রয়েছে পৃথিবীর যত সুখ, তুমি আমার জীবন, সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায়, উড়ে যেতে যেতেসহ বেশ কিছু জনপ্রিয় গান। সেসব এখনো দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

ক্যারিয়ারে প্রথম থেকেই ছিলেন সফল নায়িকা হিসেবে, তারপরও সিনেমার প্রয়োজনেই একত্রে কাজ করেন সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় নায়িকা শাবানা,ববিতা থেকে দিতি, শাবনাজদের সাথেও।

ক্যারিয়ারে এত সফলতার মাঝেও রয়েছে কিছু সমালোচনাও। বানিজ্যিক ধারার ছবিগুলোতে উগ্র সাজসজ্জা দর্শকদের চোখে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি সিনিয়র অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও ডিপজলের সাথে ‘ভয়ংকর বিশু‘ ছবিতে অভিনয় করার জন্য বেশ সমালোচিত হন।

অভিনয় জীবনে বিভিন্ন বেসরকারী পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মোট পাঁচবার অর্জন করেন। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯৩), অন্য জীবন (১৯৯৫), উত্তরের ক্ষেপ (২০০০), এবং সহ অভিনেত্রী হিসেবে শাস্তি (২০০৫), চন্দ্রগ্রহণ (২০০৮) চলচ্চিত্রের জন্য এই পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া লাল দরজা (১৯৯৬) ছবির জন্য কলকাতায় সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।

এক সময়ের নিয়মিত জনপ্রিয় এই নায়িকা বেশ কয়েক বছর ধরেই অনিয়মিত। তবে এখনো মাঝে মাঝে কাজ করে যাচ্ছেন। চম্পা অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘আরো ভালোবাসবো তোমায়’ (২০১৫)। আশা করি নিজের এই প্রিয় ভুবনে আবার ফিরে আসবেন। কাজ করবেন অনবদ্য সব চলচ্চিত্রে, মধ্য বয়সে নিজেকে প্রমান করবেন, শুধু প্রয়োজন পরিচালকদের সদিচ্ছা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।