সিক্সথ সেন্স || ছোটগল্প

বাস ছাড়ার ঠিক দশ মিনিট পর আমার বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। মনের মধ্যে উকি দিলো অশুভ সংকেত। আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি আর মাত্র দশ মিনিট পর এই বাসের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাবে। বিস্ফোরিত হবে সামনের অংশ। মারা যাবে বাসের প্রায় প্রতিটা লোক। ভাগ্য ভালো থাকলে দুই একজন বাঁচতে পারে বিভৎষ শরীর নিয়ে। সে বাঁচা মৃত্যু থেকেও ভয়ংকর।

এখন আমি যদি এই কথাটা বলার চেষ্টা করি তাহলে বাসের কেউই বিশ্বাস করতে পারবে না। হাসাহাসি করবে। আমার অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। কিন্তু এতোদিনে আমি বুঝে গেছি আমার একটা স্পেশাল পাওয়ার আছে। আমার সিক্সথ সেন্স যা বলে তা সবসময় শতভাগ সত্যি হয়। এখন অবধি একবারও মিথ্যা হয়নি। আর মাত্র দশ মিনিট। তার পরেই বিস্ফোরিত হবে এই বাসের ইঞ্জিন।

আমি পুরো বাসের দিকে ভালোভাবে তাকালাম। প্রায় ফাকা বাস বলা চলে। অল্প কয়েকজন লোক আছে। যারা একদম বাসের সামনের অংশে চিপকে আছে। সম্ভবত ঝাঁকুনি থেকে বাঁচার জন্য। বাসের পেছনে পুরো ফাঁকা। অথচ কেউ ঝাঁকুনি থেকে বাঁচতে না চাইলে আজ মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারতো হয়তো।

আমি আমার পাশে বসা মধ্যবয়সী লোকটাকে বললাম, ‘ভাই চলেন পেছনে গিয়ে বসি।’

লোকটা এমনভাবে আমার দিকে চাইলো যেন আমি নির্ঘাত পকেটমার অথবা ছিনতাইকারী।

বললো, ‘কেন ভাই, আপনার মতলব কি বলুন তো?’

আমি বললাম, ‘না ধরেন এখন যদি বাসের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায় তাহলে তো সবার আগে আমরা মারা পড়বো। পেছনে গেলে বেচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই না?’

লোকটার দৃষ্টিতে এবার আমি ধরা পড়লাম পাগল হিসাবে। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে উনি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন।

আমি শেষ চেষ্টা করলাম, ‘ভাই আমার কথা বিশ্বাস করেন। আর কিছুক্ষণ পর এই বাসের ইঞ্জিন বিস্ফোরিত হবে।’

লোকটা এবার আমার দিকে ঘুরে বললো, ‘ভাই শুনেন। সিগারেটে গাজা ভরার সময় খেয়াল রাখবেন যেন তামাক ফিফটি আর গাজা ফিফটি হয়। চারভাগের তিনভাগ গাজা দিলে এইসবই মনে হবে।’

বাহ, মজা করতেছে। আমি অপমানিত হলাম না। তার বদলে খুব আফসোস হলো। ভাগ্যক্রমে যদি ইনি বেঁচে যান তাহলে আর বাকি জীবনে কাউকে নিয়ে উপহাস করবেন না হয়তো। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। মারা যাওয়ার পসিবিলিটি ৯৫ শতাংশ।

আর মাত্র সাত মিনিট আছে। সামনের সিটের মেয়েটা ফোনে কারো সাথে চ্যাট করছে। মুখে দুষ্টুমির হাসি। হয়তো বয়ফ্রেন্ড হবে। জাস্টফ্রেন্ডও হতে পারে। মেয়েটার চেহারা খুব সুন্দর। একটু পরে আর এই চেহারা থাকবে না। ঝলসে যাবে। তখন খুব আপনজনও আর চিনতে পারবে না দেখে।

মেয়েটার পাশে এক মহিলা বসা। মহিলার কোলে ছোট বাচ্চা। একবারে দুইটা জীবন একসাথে। মহিলার স্বামী এই ধাক্কা কিভাবে সহ্য করবে! খুব কষ্ট পাবে বেচারা। হয়তো ভীষণ সুখের সংসার তাদের। বাচ্চাটা কি কথা বলা শিখেছে? প্রথমে বাবা বলেছে, না মা? বাচ্চা কাকে বেশি ভালোবাসে এটা নিয়ে হয়তো স্বামী স্ত্রীর মাঝে মধুর ঝগড়া হয়। আজকে বাদে আর হবেনা। কষ্টে আমার বুক ফেটে যেতে চাইলো। কিন্তু এখানে আমার আসলে কিছু করার নেই।

আমার গত সপ্তাহের কথা মনে পড়লো। গিয়েছিলাম ব্যাংকে। ব্যাংকে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বরাবরের মত আমার সিক্স সেন্স বলেছিলো এই ব্যাংকে আধাঘণ্টা পর ডাকাতি হবে। আমি সেটা বলায় ম্যানেজার গার্ডকে ডেকে আমাকে বের করে দিয়েছিলো। তার ঠিক আধাঘণ্টা পর ব্যাংক ডাকাতি হয়। ম্যানেজার পায়ে গুলি খান। আমার খুব শখ ম্যানেজার সাহেবকে হাসপাতালে গিয়ে হাই বলে আসার। কিন্তু আমাকেউ উলটা ডাকাত ভাববে দেখে আর যাওয়ার সাহস হয়নি।

বাসের ইঞ্জিন ব্লাস্ট হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট। আমার পেছনের সিটে বসেছে দুই বন্ধু। একুশ বাইশ বছর বয়স হবে। কি একটা বিষয় নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। এই হাসিই বলে দিচ্ছে মানুষ তার মৃত্যুর কথা আগে থেকে টের পায় না। টের পেলে এই ছেলেদুটোর চোখের সামনে অতীত ভেসে উঠতো। এখনকার মত একে অন্যের হাসিমুখ না।

আর মাত্র দুই মিনিট আছে। আমার হাতে টাইম নাই। নিজেকে তো রক্ষা করতে হবে। অন্যদের জন্য কষ্ট পাওয়া ছাড়া এযাত্রায় আমার আর কিছুই করার নেই। আমি সীট থেকে উঠে একদম বাসের পেছনে চলে গেলাম। পেছনের লম্বা সিটে গিয়ে বসলাম।

আমার পাশের ভদ্রলোক অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন। ভাবছেন নির্ঘাত গাঁজাখোর অথবা পাগল। পুরো বাস ফাকা থাকতে কেউ পেছনের সিটে যায়? আমি একদম পেছনের সিটের সাথে নিজের পিঠ চেপে ধরলাম। এখানে থাকলে আমার কিছু হবেনা আশা করা যায়। বাকিটা উপরওয়ালা ভরসা।

আর মাত্র এক মিনিট। ষাট সেকেন্ড। তারপরই বাসের ইঞ্জিন বিস্ফোরিত হবে। মারা যাবে প্রায় সবাই। আমি বেঁচে যাব শুধু। ত্রিশ সেকেন্ড আর। আমি বাসের পেছনের সীটের উপরে উঠে দাড়ালাম। পিঠ ঠেসে দিলাম বাসের ব্যাকপার্টের সাথে। দুই হাতে শক্ত করে সিট ধরলাম। ধাক্কা থেকে বাঁচতে হবে। আর দশ সেকেন্ডস। বাসের সবাই রিলাক্স মুডেই আছে। আহারে! আর পাঁচ সেকেন্ড। চার, তিন, দুই, এক। ধুমমম…!

প্রচন্ড শব্দে আমি ছিটকে পড়লাম সিট থেকে। পিঠে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে। সামনে তাকালাম। আগুন দেখা যায় না। বাস থেমে গেছে। হুশ ফিরে পেতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। ইঞ্জিন ব্লাস্ট হয়নি। একটা ট্রাক আমাদের বাসকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরেছে।

ছোটোখাটো এক্সিডেন্ট। কারো কিছু হয়নি। শুধু আমি একদম বাসের ব্যাকপার্টে সেটে থাকার কারণে কাচ ভেঙে আমার পিঠে ঢুকে গেছে। পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লেগেছে। সামনে থেকে বাসের সমস্ত যাত্রী আমার দিকে চেয়ে আছে অবাক হয়ে!

আমাকে ধরাধরি করে বাস থেকে নামানো হচ্ছে। হাসপাতালে নেয়া হবে। পাশের ভদ্রলোক কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, ‘আগেই বলেছিলাম গাজা সিগারেটের অর্ধেক হতে হবে। নেক্সট টাইম মনে থাকে যেন!’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।