সিক্রেট স্পাই এজেন্টদের সিক্রেট ও মিথ

যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস স্পাই এজেন্সি মানেই হাজারো রহস্য আর মিথ। আসলে কারা  এই কালো কাপড়ের এজেন্ট? সিনেমায় যাদের আমরা কালো ফ্রেমের সানগ্লাস পরতে দেখি, কানে এয়ারপিস দিয়ে কথা বলে, তারাই তো সিক্রেট সার্ভিসের সদস্য। নাকি? হলফ, করে বলা যায়, বাস্তবে আপনি তাদের সাথে পরিচিত হলেও তারা কোনোভাবেই নিজের পরিচয় আপনাকে প্রকাশ করবে না।

সিক্রেট সার্ভিসে কাজ করাদের সংখ্য কত? আমরা যা ভাবি তার চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণ প্রচলিত ধারণা বলে এলিট সদস্যের সংখ্যা ১০০’র আশেপাশে হবে। কিন্তু, স্রেফ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থেই নিয়োজিত আছেন ৬,৫০০ জন।

আর তারা শুধু আমেরিকান রাষ্ট্রপতি নয়, তাদের পরিবার, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারকেও নিরাপত্ত দেয়। এমনকি রাষ্ট্রপতির কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথি আসলে তার নিরাপত্তার দেখভালও করে সিক্রেট সার্ভিস।

এজেন্টদের সবাই কিন্তু মাঠ পর্যায়ে, মানে সিনেমার মত ধুন্ধুমার অ্যাকশনে নিয়োজিত নয়। সিক্রেট সার্ভিস এজেন্সির কাজের তিনটি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে তিন বছর অফিসে কাজ করতে হয়, এটা তাকের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য গড়ে তোলে। এরপর ‍শুরু হয় মিশন, এটা চলে চার থেকে সাত বছর। এরপর এজেন্টদের প্রমোশন হয়, আরো উচু পদ দিয়ে তারা ফিরে আসেন অফিসে।

যেকোনো মিশনে যাওয়ার আগে নিজেদের মত করে প্রস্তুতি নিয়ে নেয় এজেন্টরা। তারা খুনের চেষ্টা বা শুটআউটের পরিস্থিতি তৈরী করে অনুশীলন করে, রিহার্সেলের মত। ট্রেনিং সেশনের জন্য বিশেষ ধরণের বুলেট তৈরি করা হয়। আর প্রত্যেক এজেন্টকেই আট সপ্তাহের বিশেষ একটা ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ কোর্স করতে হয়। সেখানে বুলেটের মুখে পড়েও কিভাবে নিজেকে বাঁচানো যায়, কিংবা পানিতে কিভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখা যায় তার ট্রেনিং দেওয়া হয়।

এজেন্টদের প্রত্যেকেরই প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যাপারে জ্ঞান আছে। তাই তারা খুব কঠিন মুহূর্তেও স্থীর মেজাজ ধরে রাখতে জানেন। কারো জীবন বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরী হলে প্রাথমিক চিকিৎসা এজেন্টরাই শুরু করে দিতে পারেন।

আসলে এজেন্টদের এটুকু জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট। কারণ প্রত্যেক আমেরিকান রাষ্ট্রপতির চলার এমন ভাবে ঠিক করা হয় যেন, সেখান থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে কোনো হাসপাতাল থাকে।

এজেন্টদের সাথে সবসময়ই ব্লাড ব্যাংকের অতিরিক্ত রক্ত থাকে। প্রয়োজনের সময় যাতে যদি কোনো ডোনার খুঁজে পাওয়া না যায়, তাই তারা ঝুঁকি নিতে চান না। হ্যা, রক্তটা রাষ্ট্রপতির ব্লাডগ্রুপের হয়। একে বলা হয় – ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ব্লাড’।

মাউন্ট ওয়েদার – এই শব্দটার সাথে কেউ কেউ পরিচিত হলেও হতে পারেন। কেউ কেউ এটাকে স্রেফ মিথ বলে দাবী করলেও আসলে এটা একেবারেই বাস্তব একটা ধারণা।

কখনো কখনো কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান চলাকালে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা লুকিয়ে থাকার জন্য একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কার ব্যবহার করেন। একেই বলা হয় মাউন্ড ওয়েদার। এটার উদ্দেশ্য মূলত অন্য রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র থেকে নিজেদের রক্ষা করা। যে জানে, কোনো রাষ্ট্র যদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে মিলে কাউকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে বসে! করতেই পারে। এই সন্দেহটা করার দায়িত্ব, বা এই চক্রান্তের খবর আগাম জেনে যাওয়ার জন্য তো সিক্রেট সার্ভিস আছেই।

সিক্রেট সার্ভিস সব সময়ই নানা রকম ‘কোড নেম’ বা ছদ্মনাম ব্যবহার করে, নিজেদের কাজের স্বার্থে। যেমন, আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে তারা বলতো ‘রেনেগেড’, তার স্ত্রীকে ‘রেনেসাঁ’, তাদের দুই মেয়ের নাম ছিলেন রেডিয়েন্স ও রোজবাড।

সিক্রেট সার্ভিসের নীতি হল, পৃথিবী উল্টে গেলেও রাষ্ট্রপতিকে একা ছাড়া যাবে না। এমনকি যদি, রাষ্ট্রপতি তার ওভাল অফিসে একা থাকতেও চান, তাহলেও তার চলাচল ‘ট্রেস’ করার জন্য মেঝেতে মোশন সেন্সর লাগানো আছে। এতে করে কোনো সম্ভাব্য জীবন হানির ঝুঁকি থাকলে এজেন্টরা সেটা ধরে ফেলতে পারেন।

কাজের অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রপতির জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে এজেন্টরা অংশ নেন, কারণ ওই যে – ‘রাষ্ট্রপতিকে একা ছাড়া যাবে না।’ আর তাই, রাষ্ট্রপতি মর্নিং ওয়াকে যান কিংবা যান হর্স রাইডিংয়ে, এজেন্টরা ঠিকই থাকেন তার সাথে। এমনকি রাষ্ট্রপতির ডাক্তার দেখানোর সময়েও তারা হাজির থাকেন, সেটা শরীরের যত গোপন সমস্যাই হোক না কেন।

সিক্রেট সার্ভিসের হাত না হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে, বলা ভাল হোয়াইট হাউসেই কোনো কিছু প্রবেশ করতে পারে না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র বা কাগজে লেখা চিঠিও তারা পরীক্ষা করে দেখেন। তদন্তের স্বার্থে তাদের ডাটাবেজে জমা আছে প্রায় হাজার রকমের কলমের কালি।

তারা আশেপাশের সবই দেখেন এবং যতটা পারেন ভিডিও ধারণ করে ফেলেন। হ্যা, ঠিকই শুনছেন। এজেন্টরা নিজেদের কাছে যত বেশি সম্ভব ক্যামেরা আছে, এমন গ্যাজেট রাখেন। এতে করে পরবর্তীতে ঘটা কোনো ঘটনা তদন্ত করতে তাদের জন্য সুবিধা হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত হয়, রাষ্ট্রপতি এমন একটি গাড়ী ব্যবহার করবেন যার ভেতরে কি হবে তার পুরোটাই স্বনিয়ন্ত্রিত কায়দায় ভিডিও হয়ে যাবে।

একজন এজেন্ট কখনো রাষ্ট্রপতির জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেওয়ার শপথ নিয়ে কর্মজীবন শুরু করে না। সিনেমাতে যা দেখানো হয়, তার সব কিছুকে বিশ্বাস করতে নেই।

যদিও, ইতিহাসে এমন একজন এজেন্টকে পাওয়া যায় যিনি রাষ্ট্রপতির জন্য জীবন দিয়েছেন। ১৯৫০ সালের এক নভেম্বর সিক্রেট সার্ভিস অফিসার লেসলি কফেল্ট রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন।

সিক্রেট সার্ভিস নিজেদের সদরদপ্তরকে সবার থেকে গোপন রাখতে চায়। ওয়াশিংটনের যে ভবনে তাদের অফিস তার বাইরে কোনো আলাদা সাইনবোর্ড নেই, বা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে ভেতরে এমন একটি মহাযজ্ঞ চলছে। তাদের অফিসে যে সড়কে তার নামটাও খুব ছোট – এইচ স্ট্রিট।

হিউ ম্যাককুলোচ, আমেরিকার রাজস্ববোর্ডের সাবেক সচিব প্রথম সিক্রেট সার্ভিস গঠন করার পরামর্শ দেন। এই ধারণাটি তিনি রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনকে দিয়েছিলেন ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল। কাকতালীয় ব্যাপার হল, সেই রাতেই এক থিয়েটারে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে মৃত্যু হয় রাষ্ট্রপতির।

তবে, ব্যাপারটা এমন নয় যে সে সকালে এই বাহিনী গঠিত হলে প্রাণে বেঁচে যেতেন লিংকন সাহেব। প্রথমে সিক্রেট সার্ভিস গঠনের উদ্দেশ্য ছিল অর্থ জালিয়াতির সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করা। এখনও এই বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা এমন কিছু কাজ করে থাকেন।

কালো সানগ্লাস, কালো পোশাক – সিনেমায় তো এসব ছাড়া একজন সিক্রেট এজেন্টকে ভাবাই যায় না। তবে, শুনতে ভুতুড়ে শোনালেও এটাই সত্যি যে মিশনে থাকা কালে একজন এজেন্ট কখনো সানগ্লাস চোখে দেন না।  কারন, মনে করা হয় কম আলোতে চোখের সামনে থাকা কোনো কিছু মিস করে যেতে পারেন একজন এজেন্ট।

বর্তমান সময়ে এসে কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখা যায় না। তাই, সিক্রেট সার্ভিসের দুর্বলতার জায়গাগুলোও কেউ কেউ তাই ধরে ফেলতে পারে। সে কারণেই তো বারাক ওবামার জমানায় এক ব্যক্তি ছুড়ি হাতে নিয়ে হোয়াইট হাউজের প্রাচীর টপকে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন। যদিও, বড় কোনো ক্ষতি হয়নি!

এজেন্টরা সব সময় প্রস্তুত। এই ছবিগুলো দেখলেই বুঝবেন। তাদের হাত সব সময় কোমরের কাছাকাছি থাকে। কোনো বিপজ্জনক ঘটনা ঘটলে যে, তৎক্ষণাৎ তারা অস্ত্র বের করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নিতে পারেন সেজন্যই এই ব্যবস্থা। আর কখনো কখনো সিনেমার মতই তারা এই বিষয়টা করতে পারেন!

সিক্রেট এজেন্ট হওয়ার অর্থ হল ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দেওয়া। যদিও, তাদের বেতন কিন্তু আকাশচুম্বি। ২০১০ সালের হিসাব বলছে বছরে তাদের বেতন হয় ৪৪ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ডলার। সাথে যোগ হয় ৩৫ শতাংশ ল’ এনফোর্সমেন্ট অ্যাভেভেলিটি পে (এলইএপি)। রীতিমত এলাহী ব্যাপার!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।