সালমান শাহ রহস্যের কূলকিনারা হবে তো!

নব্বইয়ের দশকের কথা। একের পর এক জগাখিচুড়ি আর মানহীন মুভির ফলে ধীরে ধীরে দর্শকরা হলবিমুখ হয়ে যেতে লাগলো। নতুন করে ফিল্মে কেউ অর্থ লগ্নি করতে আসছিলো না, পুরোনো প্রযোজকরাও ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছিলো। ভালো মুভির অভাবে বাংলা চলচ্চিত্র যখন এক চরম দুঃসময় পার করছিলো, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে সালমান শাহের। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সৃষ্টি করেছেন প্রচণ্ড বিষ্ময় আর নতুন ইতিহাস। তার আবির্ভাবে বাংলা চলচ্চিত্রে যোগ হয়েছিলো এক নতুন মাত্রা।

বেশ কিছু নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্রে আগে অভিনয় করলেও চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে ১৯৯৩ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মধ্যদিয়ে। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত! এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই মহাতারকাকে। একের পর এক ব্যবসা সফল সিনেমা উপহার দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে সূচনা করেছিলেন এক নতুন অধ্যায়ের।

তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে রোমান্টিক ধাঁচের সিনেমার জন্য বলা যায় কোনো উপযুক্ত জুটিই ছিলো না। সালমান আসার পর এই খরাটা অনেকাংশে কেটে যায়। প্রথম ছবিতে তিনি মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বাঁধলেও কিছুদিন পর শাবনূরের সঙ্গে তার একটি অসাধারণ জুটি গড়ে ওঠে। এ ছাড়াও শাবনাজ, লিমা, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি-সহ কয়েকজন নায়িকার সাথেও তিনি জুটি গড়েন। এসব জুটির একেকটি ছবি বাংলা ছবির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।

একের পর এক সাফল্যের পারদ যখন ঊর্ধ্ব থেকে আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকলো, ঠিক তখনই রহস্যজনকভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে পরপাড়ে চলে যান এই মহারথী। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার ভাড়া বাসায় সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। তাঁর এই আকস্মিক চলে যাওয়া শোকে মুহ্যমান করে দিয়েছিলো চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এছাড়াও দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত এ মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি।

প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি আরও ব্যবসাসফল ২৭ টি ছবি উপহার দেন। তার অভিনীত ছবিগুলো হচ্ছে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ (১৯৯৩), ‘তুমি আমার’ ‘অন্তরে অন্তরে’ ‘সুজন সখী’ ‘বিক্ষোভ’ ‘স্নেহ’ ‘প্রেম যুদ্ধ’ (১৯৯৪), ‘কন্যাদান’ ‘দেনমোহর’ ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ‘আঞ্জুমান’ ‘মহামিলন’ ‘আশা ভালোবাসা’ (১৯৯৫), ‘বিচার হবে’ ‘এই ঘর এই সংসার’ ‘প্রিয়জন’ ‘তোমাকে চাই’ ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ‘জীবন সংসার’ ‘মায়ের অধিকার’ ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ (১৯৯৬), ‘প্রেমপিয়াসী’ ‘স্বপ্নের নায়ক’ ‘শুধু তুমি’ ‘আনন্দ অশ্রু’ ‘বুকের ভেতর আগুন’ (১৯৯৭)।

এছাড়াও চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া বেশ কয়েকটি ছবির কাজ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। এর মধ্যে ‘শেষ ঠিকানা’, ‘প্রেমের বাজি’ ‘আগুন শুধু আগুন’ ‘কে অপরাধী’ ‘মন মানে না’ ‘ঋণ শোধ’ ‘তুমি শুধু তুমি’ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহাতারকার অকাল প্রয়াণের দুই দশক পেরিয়েও গেলেও এতটুকু কমেনি তার জনপ্রিয়তা। এখনও তিনি দর্শকদের প্রিয় নায়ক, আর নায়কদের আইডল। সেই সাথে তার মৃত্যু নিয়েও রয়েছে অজস্র মিথ। ধারণা করা হয় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু সালমান শাহের পরিবারের দাবি, তাদের সন্তানকে খুন করা হয়েছে। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি অপমৃত্যু মামলাও হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি রহস্যের কোনও কূল-কিনারা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে গত ৩/৪ দিন ধরেও বিষয়টি হঠাৎ করে আবার সামনে এসেছে। রাবেয়া সুলতানা রুবি নামের এক আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি ফেসবুকে রীতিমতো বোমা ফাটিছেন। তিনি একটি ভিডিও বার্তা ছেড়ে দাবি করেছেন, সালমান শাহকে খুন করা হয়েছে। এতে জড়িত ছিলো তার চীনা স্বামী চ্যাং লিং চ্যাং এবং সালমান শাহের স্ত্রী সামিরার পরিবার!

এই ভিডিওটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। ভিডিওতে রাবেয়া সুলতানা রুবি বলেন, ‘সালমান শাহ আত্মহত্যা করে নাই, সালমান শাহ খুন হইছে। আমার হাজব্যান্ড এইটা করাইছে আমার ভাইরে দিয়ে। আমার হাজব্যান্ড করাইছে, এইটা সামিরার ফ্যামিলি করাইছে আমার হাজব্যান্ডরে দিয়ে, সব চাইনিজ মানুষ ছিলো। সালমান শাহ আত্মহত্যা করে নাই, সালমান শাহ খুন হইছে।’

সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে রুবি কাতর কণ্ঠে বলেন, ‘এই খুনের বিষয়ে আমি সব জানি। যেভাবেই হোক আবার যেন মামলা তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। আমি যেমন করেই হোক আদালতে সাক্ষী দেবো। সালমান শাহ আত্মহত্যা করে নাই, তাকে খুন করা হইছে। প্লিজ কিছু একটা করেন।’

এক পর্যায়ে রুবি নিজের নাম প্রকাশ করে ভিডিওতে বলেন, ‘আমি রুবি, এখানে ভেগে আসছি, আমি ভেগে আসছি, এই কেস যেন শেষ না হয়। আমি যেভাবে পারি, ঠিকমত যেন আমি সাক্ষী দিতে পারি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করেন।’

তাকেও খুন করার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে রুবি বলেন, ‘আমাকেও খুন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, দয়া করে আমার জন্য দোয়া করেন। আমি ভালো নাই, আমি কী করব জানি না, এতটুক জানি যে সালমান শাহ ইমন আত্মহত্যা করে নাই। ইমনরে সামিরা, আমার হাজব্যান্ড ও সামিরার সমস্ত ফ্যামিলির সবাই মিলে খুন করছে। প্লিজ দয়া করে কিছু করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরা কী মানুষ, পুরা চাইনিজ কমিউনিটি আপনারা জানেন না। আমি ভেগে আসছি এখানে, কোনো রকমে। দয়া করে একটুখানি কারোরে জানান। কারোরে জানান যে, এটা আত্মহত্যা না, এটা খুন, খুন হইছে। আমার ছোট ভাই রুমিরে দিয়া খুন করানো হইছে। রুমিরেও খুন করা হইছে। আমি জানি না রুমির কবর কোথায় আছে। রুমির লাশ যদি কবর থেকে তুলে ঠিকমত আবার পোস্টমর্টেম করে, তাহলে দেখা যাবে যে ওরা গলা টিপে মাইরা ফেলছে।’

আরও কয়েকজন এই খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলো দাবি করে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে আমার খালু মুন্তাজ হাসান আছে, আমার খালাত ভাই জুম্মান থাকতে পারে, আমার হাজব্যান্ড চ্যাং লিং চ্যাং, যিনি জন চ্যাং নামে বাংলাদেশে পরিচিত ছিলো। সাংহাই চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক ছিল ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে। দয়া করে কাউরে জানান। আমি ভেগে আসছি আমার জানের ওপর মায়ার জন্য। আমি লাস্ট মানুষ যে কি না জানে যে, এটা খুন। আমি এটা প্রমাণ করতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরো বলেন, ‘দয়া করে একটু সাহায্য করেন, একটু সাহায্য করেন। সাংঘাতিক অবস্থা, এরা আমারে বাসার মধ্যে খুন করার প্ল্যান করছিল। আশেপাশে সমস্ত, সুযোগ পায় নাই। আমার জামাইরে আমি জিজ্ঞাস করেছিলাম যে, তুমি আমারে খুন করতে চাও, তাই না? ও বলেছে যে, খুন করলে তো তোরে আমি কবেই খুন করে ফেলতাম। এখন আবার খুন করতে চায়, কারণ এখন আবার কেইস ওপেন হইছে। প্লিজ দয়া করে কিছু করেন, দয়া করে জানান।’

সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন ‘ভাবি, আপনার ছেলেরে খুন করা হইছে। আমার যা করার আমি করব, আমি ভেগে আছি ভাবি, নাইলে আমারেও মেরে ফেলত এরা সবাই মিলে। লুসি, আমার হাজব্যান্ড জন, সবাই মিলে আমার বাচ্চাটা, আমার বাচ্চা রিকি আর আমার জানের ওপর অনেক জিনিস আছে ভাবি। দয়া করে কিছু করেন ভাবি, কিছু করেন, কিছু করেন। যেখানেই যান ইনভেস্টিগেশন করেন। এটা খুন ছিল, ইমন আত্মহত্যা করে নাই। আপনার ছেলে আত্মহত্যা করে নাই, আপনার ছেলেরে খুন করানো হইছে। আমার বাপরেও মনে হয় মাইরা ফেলছে ভাবি, আমি জানি না, আমার ভাইটারেও মাইরা ফেলছে মনে হয়।’

সবশেষে তিনি বলেন ‘দয়া করেন, আল্লাহ, আপনি দয়া করেন, কিছু করেন। আসসালামু আলাইকুম। আল্লাহ হাফেজ, বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ দেখা হবে।’

মৃত্যুর এত গুলো বছর বাদে  সালমান শাহ’র মৃত্যু রহস্যে আবারো নতুন করে ডালপালা গজাতে শুরু করেছে। রহস্যের কূলকিনারা  এবার হবে তো? – প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।