সালমান শাহ ও একটা লাল গাড়ি

ঠিক তারিখ মনে নেই। তবে ১৯৯৪ সালের শুরুর দিকে হবে।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে যথারীতি স্কুল পালিয়ে ঘুরছি, উদ্দেশ্য সিনেমার স্যুটিং দেখা। তখনকার সময়ে এই গজারী বনে কোন দৃশ্য না থাকলে কোন সিনেমাই হতো না। হোক সেটা গানের বা মারামারির দৃশ্য। সব সিনেমাতেই আসতে হতো ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে।

মেইন গেইটের আগেই একটি গেট আছে, সেই গেটে আমরা পৌছাতেই দেখলাম একটি বাস, বুঝে গেলাম স্যুটিং বাস। পেয়ে গেছি তাহলে। এরপর দেখলাম একটি লাল রঙের প্রাইভেট কার এসে থামল। ঢাকা মেট্রো ভ-৮৩০, গাড়ীটার মডেল অনেক পুরানো। গাড়ী ড্রাইভ করে এসেছেন নায়ক সালমান শাহ্। পরনে কালো ফরমাল প্যান্ট, সাদা শার্টের উপর লাল চেকের কটি।

তারপর তারা চলে গেল মেইন গেটের পাশে লেকের পাশে। এরই মধ্যে চলে আসছে নায়িকা শাবনূর। শাবনূরের পরনে টাইট জিন্স ও সাদা সার্টের মতো জামা। মেকাপ নেয়া শেষে শুরু হলো স্যুটিং। অনেক মানুষ। বুঝা গেল গানের স্যুটিং হবে, ছবির নাম ‘তুমি আমার’। তখন জহিরুল হক মারা গিয়েছিলেন, তাই বাকী অংশ শেষ করেছিলেন পরিচালক তমিজ উদ্দিন রিজভী।

একটা ৫০/৮০সিসি হোন্ডায় সালমান ও শাবনূর মুখোমুখি বসল। ড্যান্স ডিরেক্টর সব রেডি করে একশন বলার পরেই টেপ রেকর্ডারে গান বেজে উঠলো – ‘যখনই একলা থাকি/ তোমার কথাই ভাবি’

শুরু হলো টেক নেয়া।

লেকের ঘাটে, রাস্তায় বিভিন্ন খুচরো খুচরো শট নিতে নিতে এরই মধ্যে দুপুর হয়ে গেল। প্রচন্ড গরমে সবাই ঘামছে। সালমান শাহ্ তখন তার গাড়ী থেকে একটা ছোট ব্যাটারী চালিত ফ্যান নিয়ে আসলো। ছোট্ট গোলাপী রঙের ফ্যানটি নিয়ে মুখে বাতাস দিতে লাগল। শাবনূর তা নিয়ে বললো- এটা এখন থেকে আমার।

সালমানও হাসি দিলো। এরপর একপর্যায়ে শাবনূরের জুতার সোল গেল খুলে। কি করা যায়? আশে পাশে তো মুচিও নেই। অতঃপর সালমান শাহ্ নিয়ে এলো সুপার গ্লু। যা তখনও তেমন একটা বাজারে আসেনি। সেটা দিয়ে তখনি লাগিয়ে দেয়া হলো জুতার সোল।

এরপর কিছু লোক রঙিন ছাতার পিছনে বসে তা ঘুরাতে লাগল আর তার সামনে দাঁড়িয়ে সালমান শাবনূর গাইতে লাগল- ‘দেখা না হলে একদিন, কথা না হলে একদিন…’

সারাদিন দূর থেকে স্যুটিং-এ দেখেছি সালমান শাহ্ কতটা চাঙ্গা করে রাখেন ইউনিটকে। হাসি সর্বদা তার মুখে থাকতোই। এরই মাঝে কত ভক্তরা অটোগ্রাফ নিচ্ছে। সৌভাগ্যবান কেউ কেউ সাথে করে ইয়াসিকা ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে ছবিও তুলছে। যদিও সংখ্যাটা খুবই নগন্য। কারন তখন তো আর হাতে হাতে ক্যামেরা ছিল না। তখন সবাই অটোগ্রাফটাই নিত। ছবি তোলা ছিল রাজকীয় ব্যাপার।

বিকেল হয়ে গেলে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে চলে এলাম।

এরপরের তারিখটা বলতে পারবো, কারণ সেদিন তার অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম। ১৭ আগস্ট ১৯৯৪।

জাতীয় উদ্যানের আম বাগানে স্যুটিং করছিলেন সালমান শাহ্, সাথে ডন ও নবাগত নায়ক শাহরুখ শাহ্। সালমানের গোঁফ লাগানো হয়েছে। পরনে মেরুন রঙের পলো শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট। এ্যাকশন দৃশ্যের স্যুটিং হবে। গুন্ডা পান্ডারা রেডি। সালমানকে মারছে কয়েকজন মিলে। কাট কাট করে কিছু দৃশ্য স্যুট করা হচ্ছে। স্যুটিং এর ফাঁকে দেখলাম, চেয়ারে একজন মেয়ে বসে আছে, অনেক ফর্সা। দেখতেও সুন্দরী! কালো শাড়িতে তাকে বেশ লাগছে। সালমান তার পাশেই বসছে, কথা বলছে, হাসছে। মাঝে মাঝে ডনও এসে তার পাশে বসছে।

স্যুটিং ইউনিটের একজনকে জিঙ্গেস করলাম- উনি কে? হিরোইন?

জবাবে জানলাম, তিনি সালমানের স্ত্রী, সামিরা।

এরই মধ্যে একটি ছেলের সাথে সালমান তর্কে জড়িয়ে গেলেন। অনেকটাই রেগে মারমুখী হলো সালমান। স্যুটিং এর লোকজন পরিস্থিতি সামলে নিলো। মূল ঘটনা হলো, কলেজের কিছু ছেলে গিয়েছিল স্যুটিং দেখতে। তারা দূর থেকে সামিরাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছিল। যা সালমান সহ্য করতে পারেননি। তাই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এটাই তো স্বাভাবিক।

যাই হোক, পরিস্তিতি শান্ত হলে এগিয়ে গেলাম তার কাছে। বাড়িয়ে দিলাম অটোগ্রাফ বুক। তিনি ইংরেজীতে তার নাম ও তারিখ লিখে দিলেন। এরপর আমি অটোগ্রাফ বুকটি বাড়িয়ে দিলাম সামিরার দিকে। সালমান হাসলেন, সামিরা অবাক হলেন। তারপর তিনিও হয়ত জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ দিলেন। লিখলেন ‘Go get the world- Samira Shahriar, 17/8/94′

এরপর অলস বসে থাকা নবাগত শাহরুখ শাহকে এগিয়ে দিলাম অটোগ্রাফ খাতাটা। তিনি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন, কি লিখবেন অনেকক্ষন ভাবলেন, তারপর কোন একটি খাতা ঘেটে তিনি বেশ করেই ইংরেজীতে লিখলেন।

সন্ধ্যার আগে আগেই বিদায় জানাতে হলো সালমান শাহকে। এরপর আর কোনদিন তার সাথে দেখা হয়নি।

তার দুই বছর পরেই ১৯৯৬ সালের ০৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, বিটিভির ৩টার সংবাদে তার মৃত্যুর সংবাদ পাই। হতবিহবল হয়ে যাই। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনা। তখন এত টিভি, রেডিও, ইন্টারনেট ছিল না। তাই খবরটি নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল রাত ৮টার বাংলা সংবাদের জন্য। হ্যাঁ, সত্যি সালমান শাহ্ চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে।

তার মৃত্যুর আজ ২১টি বছর হয়ে গেছে। অথচ এখনও ২৩ বছর আগের সেই দৃশ্যগুলো এখনো স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করে। স্পষ্ট দেখতে পাই সালমানের হাসিমাখা মুখখানি।

এইতো পুরনো মডেলের লাল প্রাইভেট কার থেকে নামলেন চিরসবুজ নায়ক সালমান শাহ্। হাসি মুখে এগিয়ে আসছেন সামনের দিকে, আসছেন তো আসছেনই। এ আসা যেন কোনদিনই শেষ হবার নয়। তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন, যাচ্ছেন…আমি চেয়ে থাকি, অপলক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।