সারাহাহ: অকপট নাকী অস্বস্তিকর?

প্রাত্যহিক জীবন-যাপন কিংবা ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করার সময় অনেক কিছুই আমাদের চোখে পড়ে। সেগুলোর কিছু আমাদের দেয় আনন্দ, আবার কিছু করে বিরক্তির উদ্রেক। প্রায়ই এমনটা হয় যে কোনো বন্ধুর চাল-চলন বা কর্মকাণ্ড দেখে বলতে ইচ্ছে করে, ‘আরে, এটা তো এভাবে না, ওভাবে হবে!’ কিংবা ‘তুই এটা করতে পারলি?’ অথবা ‘তুই এই স্বভাব পাল্টাবি কবে’। কিন্তু আলোচ্য মানুষটি এই মন্তব্যগুলো কিভাবে নেবে, সে আশঙ্কায় কথাগুলো অার বলা হয়ে ওঠে না।

একই ঘটনা ঘটে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেবার সময়ও। তখন মনে চিন্তা জাগে, ‘ইতিবাচক মন্তব্য ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করা হবেতো?’ চিন্তা থেকে সংকোচ, সংকোচ থেকে সংশয়। এই সংশয়ের পরিণতিতে আঙুল চলে যায় ব্যাকস্পেস বাটনের দিকে। হারিয়ে যায় কিছু প্রতিক্রিয়া, কিছু অনুভূতি।

কিন্তু আপনি যদি হন একজন নির্ভীক আঠারোর্ধ্ব টিন-এজার এবং আপনার হাতে থাকে একটি ইন্টারনেট এনাবল্ড স্মার্টফোন, তাহলে আপনি নিসংকোচে আপনার উদ্দীষ্ট মানুষটিকে নিজের মনের কথা বলতে পারেন, তাও তার অগোচরেই। কিন্তু, কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর একটাই।

আর তা হল সারাহাহ।

কী এই সারাহাহ?

সারাহাহ একটি আরবী শব্দ যার অর্থ সততা বা অকপটতা। এটি একটি অ্যানোনিমাস চ্যাটিং অ্যাপ, যার মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে পরিচিতদের মেসেজ পাঠানো যায়। মূলত সৎ ও নির্ভীকভাবে নিজের মতামত প্রকাশে সাহায্য করাই অ্যাপটির কাজ।

গেল বছর, সৌদি অ্যাপ নির্মাতা জাইন আল-আবাদী তৌফিকের হাতে সারাহাহ প্রতিষ্ঠা পায়। এটি একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে, যেখানে কোনো ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন রেখে কারো ব্যাপারে তার মতামত দিতে পারতেন।

সারাহাহ মূলত অফিসগামী চাকুরেদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো, যাতে তারা ভয়-ডরহীন ভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু পরিচয় গোপন রাখার সুবিধাটির কারণে তা সবশ্রেণীর মানুষের কাছে জনপ্রিয় ওঠে এবং অ্যাপটির ইংরেজি ভার্সন বহির্বিশ্বে অবমুক্তির দাবী সার্বজনীন হয়ে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অভাবনীয় সাফল্য পাবার পর তৌফিক অ্যাপটির ইংরেজি ভার্সন তৈরি করেন। পূর্বসূরী চ্যাটিং অ্যাপগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সারাহাহও টিন-এজদের মধ্যে হাইপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

সারাহাহ কিভাবে কাজ করে?

সারাহাহের ওয়েবসাইটেই এর উদ্দেশ্য স্পষ্টভভাবে লেখা রয়েছে, ‘ব্যবহারকারী সম্পর্কে তার পরিচিতরা কী ভাবছে, সেটা জানানোই সারাহাহ এর কাজ। এতে করে ব্যবহারকারী যেমন নিজের ভুলভ্রান্তি এবং চরিত্রের অসঙ্গতিগুলো আবিষ্কার করতে পারেন, তেমনি সেগুলো শুধরে নিয়ে আত্মিক ও মানসিক বিকাশও ঘটাতে পারেন।’

আগেই বলেছি, এ অ্যাপের মাধ্যমে আপনি আপনার পরিচিত মহলের যে কাউকে যেকোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য পাঠাতে পারেন, সেটাও নিজের পরিচয় গোপন রেখে।অর্থাৎ, আপনি যাকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, সে আপনার মেসেজটি দেখতে পেলেও পরিচয় জানতে পারবে না কিছুতেই। পছন্দসই মেসেজগুলোকে ফেভারিটের তালিকায় যোগ করা গেলেও কোনো মেসেজের জবাব ব্যবস্থা অ্যাপটিতে রাখা হয়নি। অর্থাৎ সারাহাহ তে বার্তার প্রবাহ একমুখী।

গোপনীয়তা রক্ষা করা সারাহাহ এর প্রধান আকর্ষণ ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তুমুল জনপ্রিয়তার চাবিকাঠিও বটে। তাই অ্যাপটি তার ব্যবহারকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে সদাসচেষ্ট।

কিভাবে সারাহাহ ব্যবহার করবেন?

শুরুতে অ্যাপটি শুধু আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য অবমুক্ত করা হলেও এটি এখন অ্যান্ড্রয়েডেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই একটি স্মার্টফোন (হোক তা অ্যান্ড্রয়েড কিংবা আইফোন) থাকলেই আপনি সারাহাহ ব্যবহার করতে পারবেন। তবে একটি শর্ত আছে। আর তা হল, ব্যবহারকারীকে অবশ্যই অাঠারোর্ধ্ব হতে হবে।

অ্যান্ড্রোয়েড ব্যবহারকারীরা সহজেই গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন। প্লে স্টোরে গিয়ে কাঙ্খিত অ্যাপের নাম লিখে সার্চ করলেই হবে। উল্লেখ্য যে অ্যাপটি ফ্রি তাই কোনো টাকা-পয়সা লাগবে না।

আর যারা আইফোন ব্যবহার করেন তারাও অ্যাপল স্টোর থেকে একই পদ্ধতিতে সারাহাহ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারেন।

ডাউনলোড করার পর প্র‍য়োজনীয় তথ্যসমূহ পূরণ করে সারাহাহ অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলুন। এরপর সেই অ্যাকাউন্ট নেমটি পরিচিত জনদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আপনার কাজ শেষ। এবার বসে বসে দেখুন, তারা আপনাকে কেমন বিচিত্র বিচিত্র মেসেজ পাঠাতে থাকে!

নির্মাতার প্রতিক্রিয়া

সারাহাহ সম্পর্কে এর নির্মাতা জাইন আল-আবাদী তৌফিক বলেন, ‘সামাজিকতা ও রক্ষণশীলতার মতো প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে স্বতঃফূর্তভাবে মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেই অ্যাপটির জন্ম’। তিনি আরো বলেন, ‘বয়স, সম্পর্ক, সম্মান, খ্যাতি ইত্যাদি মাপকাঠিগুলোর খাতিরে আমরা অনেকসময় অনেককিছু প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকি, চেপে যেতে বাধ্য হই। সারাহাহ অ্যাপটির মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, যার স্বপ্ন আমরা প্রত্যেকেই দেখি।’

কাঠগড়ায় সারাহাহ

সারাহাহ নিয়ে উন্মাদনার পাশাপাশি অভিযোগের পাল্লাটাও বেশ ভারী। বিশেষ করে, দেশ-বিদেশে আলোচিত এই ‘সরল-অকপট’ অ্যাপটির বিরুদ্ধে লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদকে উসকানি দেবার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন অনেকে।

সারাহাহ টিমের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তারা এটিকে ব্যাবহারকারীদের নিজস্ব মনোভাবের প্রতিফলন বলে আখ্যায়িত করেন।

জানা গেছে, বার্তা-প্রেরকদের ট্র্যাক করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। আর এই সাইবার বুলিংয়ের ভিকটিমদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশী।

সারাহাহ অ্যাপটির প্লে-স্টোর/অ্যাপল স্টোর রিভিউয়ে ব্যাপারটির সত্যতা পাওয়া গেছে। সেখানে অনেকেই সারাহাহে প্রাপ্ত অশালীন মন্তব্য বিশিষ্ট মেসেজের স্ক্রিনশট পোস্ট করে উষ্মা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

একজন রিভিউতে লিখেছেন, ‘প্রাপ্ত মেসেজগুলোর অধিকাংশই হয় বেশি ভদ্র, কিংবা বেশী অস্বস্তিকর’।

আরেকজনের মতে, ‘বছরের সেরা অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ।’

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সারাহাহ হলো রূপকথার জাদুর অায়নার মতো, যে অায়নায় তাকালে নিজের প্রকৃত রূপ দেখতে পাওয়া যায়। তাই সারাহাহ হতে প্রাপ্ত মতামতগুলো ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হোক, সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সারাহাহ: পরবর্তী ফেসবুক?

সারাহাহ ব্যবহারের সূচকের উর্ধ্বমুখী অবস্থান দেখে বলেই দেয়া যায় অ্যাপটি এখন ভার্চুয়াল জগতের মধ্যগগনে অবস্থান করছে। অ্যাপটির অগ্রযাত্রা যেভাবে একের পর এক রেকর্ড ভেঙ্গে চলেছে, তাতে অনেকে ইতোমধ্যেই একে ফেসবুক-টুইটার এর উত্তরসূরীর খেতাব দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সারাহাহ কি আসলেও ততোদূর যেতে পারবে?

বিশ্লেষকদের মতে, সারাহাহ এর মতো অ্যাপ নিয়ে এই মাতামাতি নতুন কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ তারা চ্যাটিং অ্যাপ সিমসিমির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সিমসিমি একটি ভার্চুয়াল চ্যাটবট, যা কিনা তার ব্যবহারকারীদের সাথে অালাপ করতে পারতো। সিমসিমি অ্যাপটি বাজারে অাসার পর একধরনের উন্মাদনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এ উন্মাদনা বেশিদিন টেকেনি।

তাদের মতে, এধরণের অ্যাপগুলোর অভিনবত্বের কারণে মানুষ এগুলোর প্রতি অাকৃষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু উপযোগিতার অপ্রতুলতার কারণে দ্রুতই মুখ ফিরিয়ে নেয়।

একইভাবে বলা যায় সারাহাহ এর পূর্বসূরী ফর্মস্প্রিং বা আস্ক.এফএম এর কথা। যারা একসময় তুমুল সাড়া জাগিয়েও ঝরে পড়েছে অকালেই।

তাই সারাহাহ এই ক্রমবর্ধমান ভার্চুয়াল জগতে কতোদিন নিজের একচ্ছত্র অাধিপত্য বজায় রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।