সাধারণ মানুষের অসাধারণ নায়ক

  • স্বপ্নের বীজ

ঢাকার নীলক্ষেত এলাকার বলাকা সিনেমা হলের প্রতি দেশের সিনেমা প্রেমী মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। এই সিনেমা হলে নায়ক রাজ রাজ্জাকের পোস্টার গুলোই তো এস এম আসলাম তালুকদার মান্নার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ২০ বছর বয়সী মান্না তখন ঢাকা কলেজে পড়তেন। নায়ক রাজ রাজ্জাকের ভীষন ভক্ত ছিলেন।

ঢাকা কলেজ থেকে প্রায়ই বের হয়ে একটু দূরে বলাকা হলে যেতেন। সেখানেই একদিন নায়ক রাজের ছবি দেখেই সিদ্ধান্ত নেন চাকরী নয় পর্দার নায়কেই হতে হবে। ১৯৮৪ সালে তখন এফডিসিতে নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রম চলছে। বলাকা সিনেমা হলে বিজ্ঞাপন দেখেই বন্ধুদের সাথে কথা বলে সেই প্রতিযোগীতায় অংশ নেন তিনি এবং জয়ী হন। ঢালিউড পায় নতুন নায়ক।

  • আসলাম তালুকদার থেকে মান্না

টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলায় এলেঙ্গাতে ১৯৬৪ তে জন্ম গ্রহন করেন এস এম আসলাম তালুকদার। রুপালী পর্দায় পা রেখে নাম বদলে হয়ে যান মান্না। ১৯৮৬ তে রাজ্জাক অভিনীত ‘তওবা’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি।

  • কাসেম মালার প্রেম থেকে লীলামন্থন

৮৬ সালে ঢালিউডে পা রাখলেও ঢালিউডে শক্ত মাটি পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে মান্নাকে। ৯১ সালে প্রথমবার একক নায়ক হিসেবে চম্পার বিপরীতে অভিনয় করেন কাসেম মালার প্রেম ছবিতে। ৯৬ তে সালমান শাহ’র মৃত্যুর ধাক্কায় ঢালিউডের পরিচালকদের যখন মাথায় হাত, অ্যাকশন হিরো হিসেবে একটু একটু করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন মান্না। ক্যারিয়ারের শেষ ছবি ছিল মৌসুমি-পপির সাথে লীলামন্থন।

  • চম্পা থেকে শাবনূর-পূর্ণিমা-মৌসুমী

ক্যারিয়ারে ৪০০ এর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন মান্না। চম্পার সাথে প্রথম একক নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও শাবনূর-পূর্ণিমা-মৌসুমী-পপিসহ কয়েক প্রজন্মের অভিনেত্রীর সাথে অভিনয় করেছেন মান্না। একটা রেকর্ড দেখে নিজেই চমকে গেছি, ৬১ জন অভিনেত্রীর সাথে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে একশান হিরো হিসেবে মৌসুমীর সাথেই তাঁর পর্দার রসায়ন দারুণ ছিল।

  • কাজী হায়াৎ-এর স্নেহ বা অভিমান পর্ব

বছর দুয়েক আগে কাজী হায়াৎ-এর ছেলে চিত্রনায়ক মারুফের ইন্টারভিউ করেছিলাম। মারুফ এমন একটি তথ্য দিয়ে ছিলেন যে চমকে উঠেছিলাম। যে মান্না কাজী হায়াৎকে বাবা ডাকতেন, যে মান্নাকে কাজী হায়াৎ পুত্র স্নেহ করতেন সেই মান্নার সাথে অভিমান করেই নাকি মারুফকে রুপালি পর্দায় এনেছিলেন তিনি। মান্না একদিন নাকি কাজী হায়াৎ কে বলেছিলেন, ‘আমরা মুখে মেকাপ করি বলেই আপনাদের পেট চলে।’

অভিমানী কাজী হায়াৎ এরপর দীর্ঘদিন তার ছবিতে মান্নাকে নেননি। ১৯৯৭ সালে মান্না ‘লুটতরাজ’ নামে প্রথম ছবি প্রযোজনা করেন। তার পরিচালক ছিলেন কাজী হায়াৎ। এই কাজীর হাত ধরেই ত্রাস, দাঙ্গা, ধর সহ একাধিক রাজনৈতিক ছবি উপহার দিয়ে অ্যাকশন ছবির নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মান্না।

  • মান্নার মৃত্যু

২০০৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সারা রাত শুটিং করে বাসায় ফিরে বুকে ব্যাথা অনুভব করেন মান্না। ভোর ছয়টায় দিকে উত্তরার বাসা থেকে একাই গাড়ি চালিয়ে এসে ইউনাইটেড হসপিটালে ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে আর বাসায় ফিরতে পারেননি। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই শক্তিমান অভিনেতা।

ছেলে সিয়ামের সাথে
  • শেলী মান্নার মামলা

মান্না তার প্রেমকে পরিনয়ে রুপ দিয়ে শেলী মান্নার সাথে গাঁটছড়া বাধেন। শেলী প্রথমে পর্দার অভিনেত্রী থাকলেও পরবর্তীতে বিমানে চাকরী নেন। মান্নার মৃত্যুর সময় শেলী মান্না বিমানে দুবাইয়ে ছিলেন। মান্নার স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শেলী মান্নার সাথে দেখা হয়েছিল।

প্রশ্ন করেছিলাম, ‘মান্নার মৃত্যুর পর আপনি ইউনাইটেড হসপিটালের কয়েক জন ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এখানে কি আবেগটা বেশি কাজ করেছিল? মান্নার মৃত্যু কি মানতে না পেরে তার রেশটা ডাক্তারদের উপর দিয়ে গেছে কিনা?’ শেলী মান্নার জবাব ছিল, ‘হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পরেও ৬-৭ ঘন্টা ডাক্তাররা মান্নাকে সঠিকভাবে চিকিৎসা করেনি।তাদের অবহেলাই তার মৃত্যুর কারণ।’

মান্নার ছেলে

মান্না পুত্র সিয়াম এর সাথেও সেই অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। প্রশ্ন করেছিলাম বাবার পথ ধরে আপনিও পর্দায় নায়ক হিসেবে আসবেন কিনা? মুচকি হেসে সিয়াম এর উত্তর ছিল, ‘না’।

  • মান্না বিহীন ঢাকাই সিনেমায় ধস

তখন ও ঢালিউডে শাকিব খান যুগ শুরু হয়নি। রোমান্টিক ছবির নায়ক হিসেবে ঢালিউডকে রিয়াজ টেনে নিয়ে গেলে অ্যাকশন হিরো হিসেবে টেনেছেন মান্না। অশ্লীল ছবির বিরুদ্ধে তাঁর বজ্র কন্ঠ ছিল। মান্নাকে কেন্দ্র করে পরিচালকেরা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর ছবি বানাতেন।

মান্না মারা যাওয়ার পর মনে দাগ কাটা সেই রকম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর ছবি আর কোথায় হল? আমিন খান, অমিত হাসানরা চেষ্টা করেছেন বটে কিন্ত দর্শকদের মান্না যে ফ্লেভার দিতেন তা আর তারা পারেননি। রিয়াজ গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে, মান্না নেই। ফলে ফিল্মেও ধস নেমেছিল। ফাকা মাঠে এরপর দীর্ঘদিন একা খেলে গেছেন শাকিব খান।

সাধারণ মানুষের নায়ক

মান্না কেন এত জনপ্রিয় ছিলেন? প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে যা পূরণ হয় না। প্রত্যেক মানুষেই জীবনে কিছু ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়। এই বঞ্চিত মানুষগুলো যখন পর্দায় মান্নাকে নিজের অধিকার আদায় করতে দেখেছে তখন তারা মান্নাকে অধিকার বঞ্চিতদের প্রতিনিধি ভেবেছে। পর্দায় অধিকার আদায়ের জন্য মান্নার সংগ্রামের সুবাদেই সাধারণ মানুষের আপন হয়ে ওঠেন তিনি। দর্শকদের মনে এই রকম প্রভাব কম অভিনেতাই ফেলতে পারে।

কিন্তু, হায়! আমাদের সেই মান্না এখন মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই টাঙ্গাইলে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। জীবনানন্দ দাশ এর কবিতার লাইন যেন বেশ মানিয়ে যায়…

একটি নক্ষত্র আসে

তারপর একা পায়ে চলে

ঝাঁউয়ের কিনার ঘেঁসে

হেমন্তের তারা ভরা রাতে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।