সাকিবরা এখন র‌্যাংকিংয়ের সাতে; আপনি কী দেখছেন স্যার?

নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একাধারে ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও গীতিকার।

তাঁর সাহিত্যকর্ম, সৃজনশীলতা, পছন্দ-অপছন্দ, বৃষ্টিবিলাস বা জোৎস্নাবিলাসের কথা আমরা সকলেই কমবেশি জানি। তবে তাঁর ক্রিকেটবিলাসের কথা হয়ত আমরা অনেকেই জানি না বা সেভাবে প্রচারও হয়নি।

হুমায়ুন আহমেদ আমাদের মতই পুরোদস্তুর ক্রিকেটপ্রেমী ছিলেন। বাংলাদেশের খেলা কখনোই মিস করতেন না তিনি। বাংলাদেশের খেলার দিন যতই কাজ থাকুক না কেন, সব বাদ দিয়ে তিনি খেলা দেখতে সময়মত টিভি সেটের সামনে হাজির হয়ে যেতেন। এমনকি দেশের বাইরে থাকলেও বাংলাদেশের খেলা মিস হতো না তাঁর।

ক্রিকেটের প্রতি তাঁর এই প্রবল আকর্ষণের বেশকিছু ঘটনাও রয়েছে। তেমনই একটি ঘটনা সম্পর্কে জানা যার তাঁর ‘আত্মজৈবনিক রচনাসমগ্র’ থেকে। সেখানে লেখায় সালটা উল্লেখ করেননি তিনি। তখন চলছিলো অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার ওয়ানডে সিরিজ। আর সেসময় একটি টেলিফিল্মের শুটিংয়ে দলবল নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ অবস্থান করছিলেন সুইজারল্যান্ডে।

বাংলাদেশ এর আগে একবার ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল। এবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে হুমায়ূন আহমেদের বিশ্বাস। তাই যে করেই হোক খেলাটা দেখতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো সুইজারল্যান্ডে কেউ ক্রিকেট দেখে না। তাহলে উপায় কী! হুমায়ূন আহমেদ চ্যানেল আইয়ের হাসানকে ফোন করে বলে দিলেন যেভাবেই হোক তাকে বাংলাদেশের খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দিতে।

হাসান বিশাল বাস ভাড়া করে সবাইকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন জুরিখে। লক্ষ্য সেখানে অবস্থান করা বাংলাদেশিদের বাড়িতে গিয়ে খেলা দেখা। কিন্তু সেরকম কোন ব্যবস্থাই হলো না। তবে একজন তাকে একটি অস্ট্রেলিয়ান পাবের সন্ধান দিয়েছিলেন যেখানে হয়ত খেলা দেখার চ্যানেল থাকতে পারে। এবার দল নিয়ে সেই পাবে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ দেখলেন সেখানে ফুটবল খেলা চলছে। পাবের মালিককে হাসান বললেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমরা ক্রিকেটে ওয়ানডেতে তোমাদের হারিয়েছি। আজ আবার হারাব। আমাদের খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দাও।’

হাসানের কথামত তাদেরকে খেলা দেখার সুযোগ করে দিলেন পাবের মালিক। খেলায় বাংলাদেশের অবস্থা ছিলো শোচনীয়। প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে একের পর এক উইকেট খোয়াতে থাকে বাংলাদেশ। এ খেলা দেখা মানে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। তাই হুমায়ূন আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। তখন পাবের মালিক বাঁকাহাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কী জিতেছ?’ হুমায়ূন আহমেদ বললেন ইয়েস। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে সবাই বলে উঠলো ইয়েস। এভাবে পাবের মালিককে অবাক করে বীরদর্পে পাব ত্যাগ করেন তাঁরা।

বাংলাদেশের ম্যাচের দিন বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের  নিয়ে একসাথে খেলা উপভোগ করতেন হুমায়ূন আহমেদ। ম্যাচ দেখার পাশাপাশি খাবারদাবারেরও ব্যবস্থা রাখতেন তিনি। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচের দিন হুমায়ূন স্যার ছিলেন নুহাশপল্লীতে। প্রিয়জনদেরকে নিয়ে জমিয়ে ম্যাচ উপভোগ করছিলেন তিনি।

ম্যাচে বাংলাদেশের  অবস্থান ভালো দেখে জয়ের ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ম্যাচে বাংলাদেশ জিতলে রাতে খাসি জবাই করার ঘোষণাও দিয়ে রাখেন স্যার। জয়ের ব্যাপারে তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, ম্যাচ শেষ হবার আগেই নুহাশপল্লীর ম্যানেজারকে খাসি কিনে আনতে বলে দিলেন। তারপর ম্যাচ জিতলো বাংলাদেশ, ঝাল করে খাসির মাংস রান্না হলো এবং তা খেয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এ জয়টি উদযাপন করেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ এতোটাই ক্রিকেটপ্রেমী ছিলেন যে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তিনি বাংলাদেশের খেলা দেখতে ভুল করতেন না। ২০১১ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে যখন পাকিস্তান খেলতে আসে হুমায়ূন স্যার তখন নিউইয়র্কে। তিনি তাঁর একজন কাছের মানুষ মাজহারকে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন।

কিন্তু, যে দুটি চ্যানেল খেলা দেখাবে সেগুলো মাজহারের বাসার ডিশের লাইনে ছিল না। সেদিন বিকালে নিউইয়র্কে অবস্থানকারী স্যারের ছোটবেলার এক বন্ধু স্যারকে দেখতে আসেন। তখন সেই বন্ধুর কাছ থেকে ইন্টারনেটে কিভাবে বাংলাদেশের খেলাটি দেখা যায় তা কাগজে লিখে রাখেন হুমায়ুন আহমেদ।

সেই কাগজ তিনি মাজহারকে দিয়ে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে রাখতে বলেন। নিউইয়র্ক সময় ভোর চারটায় খেলা শুরু হতো। মাজহার রাতেই সবকিছু রেডি করে রাখেন। পরে ভোরে হুমায়ূন স্যারকে ডেকে তুলে দেন। স্যার সোফায় বসে সামনের টী-টেবিলে ল্যাপটপ রেখে বাংলাদেশের খেলা দেখতে থাকেন এবং এক একটা চার-ছয় চিৎকার করে উদযাপন করতে থাকেন।

ভাবতে পারেন একজন লোক ক্রিকেটকে কতটুকু ভালবাসলে অসুস্থ অবস্থায়ও ভোরে খেলা দেখতে ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়েন? ২০১২ সালের এশিয়া কাপও নিউইয়র্কে বসে দেখতে হয় হুমায়ুন স্যারকে। সেখানেই ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটি উপভোগ করেন হুমায়ূন আহমেদ।

বাংলাদেশের খেলা কখনোই একা দেখতেন না হুমায়ূন আহমেদ। কখনো নিজের বাসায়, কখনো বা বন্ধুদের বাসায় সকলকে নিয়ে খেলা দেখতেন তিনি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বসলো বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর। তো সেই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে হুমায়ূন আহমেদ পরিকল্পনা করেন বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে বাংলাদেশের জার্সি পরে একসাথে খেলা দেখবেন, বাংলাদেশের একেক ম্যাচ একেক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উপভোগ করবেন।

জার্সি কেনা হলো এবং বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেলা দেখাও শুরু হয়ে গেল। এর মাঝে তাঁর শাশুড়ি বাংলাদেশ বনাম আয়ারল্যান্ড ম্যাচের দুটি ভিআইপি টিকেট দিলেন। স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়ে স্যার ছুটে গেলেন স্টেডিয়ামে। সেখানে পুরো ম্যাচ না দেখেই তিনি স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে যান। ফিরে  এসে ম্যাচের বাকি অংশটুকু তিনি বন্ধুদেরকে নিয়ে একসাথে দেখেন। এভাবেই তিনি বাংলাদেশের খেলাগুলো বন্ধুদের নিয়ে একসাথে উপভোগ করতেন।

ক্রিকেটপ্রেমী হুমায়ুন আহমেদ তাঁর জীবদ্দশায় একটি বই আমাদের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসাকে উৎসর্গ করে গেছেন। বইটির নাম ‘বলপয়েন্ট’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন,  ‘সাকিব আল হাসান—এই তরুণকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। কিন্তু মুগ্ধ হয়ে তাঁর খেলা দেখি।’

হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন পাঁচ বছর হলো। ক্রিকেটের প্রতি তাঁর আবেগ ও ভালবাসার অন্ত ছিলো না। বর্তমানে বাংলাদেশ যেভাবে ক্রিকেট খেলছে, যেসব সাফল্য পাচ্ছে এবং যেভাবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে আধিপত্যবিস্তার করে জয় ছিনিয়ে আনছে তাতে তাঁর চেয়ে বেশি আর কে খুশি হতেন!

আজ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, দেখুন স্যার আপনার বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতে র‍্যাংকিংয়ের সাতে উঠে এসেছে, ইংল্যান্ডের মত দলকে হটিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছে, আপনি সুইজারল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশ যেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেরেছিল সেই অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে তাঁরা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে খেলেছে। আপনি কী দেখছেন স্যার?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।