সাকিবকে গালি দেওয়ার ‘আনন্দ’

উপমহাদেশের অন্য যেকোনো অংশের থেকে আমাদের ক্রিকেট সমর্থকরা তুলনামূলক ‘সমঝদার’। ফেসবুকে নানা রকম গ্রুপগুলোকে কেন্দ্র করে ক্রিকেটারদের যে বিপুল সমর্থক পাওয়া যায় তারাও কমবেশি সেনসিবল। ক্রিকেটের মাঠের খেলাটা বোঝার চেষ্টা করে এবং সর্বপরি, এরা ক্রিকেটের ভাল চায়।

এক গ্লাস দুধের মধ্যে এক ফোঁটা বিষ মিলে যেমন পুরো দুধটুকুই নষ্ট করে দেয়, তেমনি দুই একজন উগ্র, অপ্রকৃতস্থ ‘সো কল্ড’ ক্রিকেট সমর্থকদের কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত হেয় হতে হয়। কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে এদের ফেলা যায় না, কোন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেও এদের আনা যায় না। এদের কেউ জিরো ফেসবুক ইউজার, কেউ মুরাদ টাকলা!

কিন্তু তারপরও কী করে যেন এরা নানা রকম গ্রুপে, ক্রিকেটারদের পেজে চলে এসেছে। আর সুযোগ পেলেই এমন একটা মন্তব্য করে বসে যে, সেটার দায় গোটা ক্রিকেট সমর্থক গোষ্ঠীদেরই নিতে হয়।

ঘটনার সাথে সম্পর্ক নেই এমন অযাচিত কমেন্ট পোস্ট করে; কখনও সেটা নিজের বিকৃত মানসিকতাকে ফলাও করে প্রচার করার জন্য; কখনও করে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। কখনও নিজের আইডি থেকে করে; কখনও করে ফেক আইডি থেকে। এরা যে ক্রিকেট বুঝে না সেটা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়।

বুঝলে অন্তত মাশরাফি বিন মুর্তজার মত মানুষকে এরা গালমন্দ করতেন না। এমনকি নাসিরের বোন, তামিমের স্ত্রীও এদের হাত থেকে রেহাই পাননি। আগেও তাদের রোষের শিকার হয়েছিলেন সাকিব ও তার স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশির। এবার একটি অনুষ্ঠানে সাকিবের পরিবারের সাথে তার গৃহকর্মীর ছবি ফলাও করে প্রচার করলো নামসর্বস্ব কিছু ফেসবুক পেজ।

আর কোনো বাছবিচার না করে এক দল ফেসবুক ব্যবহারকারী ঝাপিয়ে পড়লেন সাকিবের ওপর। এমন অনেক গালিগালাজই অকারণে সাকিব ও তার পরিবারকে হজম করতে হল যা আসলে লেখারও উপযোগী নয়।

বাধ্য হয়ে সাকিবের স্ত্রী শিশির বাধ্য হয়ে ফেসবুকে বিষয়টা পরিস্কার করলেন, ‘এটা আসলেই খুব হাস্যকর! সাকিব আল হাসানের জন্য কি একটিও ভালো শব্দ নেই? কেন? সে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে পারে না বলে “খারাপ লোক”হিসেবে আখ্যায়িত হয়! এখন ঘটনা হলো, আপনারা যদি মানুষ হয়েও তার সম্পর্কে এভাবে হাস্যকর খবর ছড়াতে থাকেন, যেখানে কিনা সত্যিটা জানার উপায় আছে! নিচে কিছু প্রমাণও দিলাম। আমি এসব অর্থহীন খবর নিয়ে মাথা ঘামাই না। এগুলো মানুষকে আনন্দ দেয়। তাছাড়া আমরা জানি আমরা কে, আমরা কি! কিন্তু দয়া করে এমন একজন মানুষকে নিয়ে এসব খবর ছড়াবেন না যে কিনা বিশ্বব্যাপী আপনার দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যে কিনা আপনার দেশের গর্ব হিসেবে পরিচিত। এটা শুনতে আসলেই খুব লজ্জা লাগে যখন ক্রিকেট ফলো করে এমন কোন বিদেশি আমাদেরকে বলে, “তোমাদের নিজের দেশের লোকই তোমাদের প্রতি প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয় না।” আজেবাজে খবর যথেষ্ট হয়েছে। দয়া করে এবার আপনার পেজকে বুস্ট করানোর মতো অন্যকিছু খুঁজুন। যাহোক, সে (মেয়েটি) আমাদের সাথে খেতে বসার জন্য হাত ধুয়ে ফিরেছিলো মাত্র।’

কতটা আহত হলে একজন এভাবে লিখতে পারেন? একটু ভাবুন তো। এখন ব্যাপার হল ব্যক্তিগত পর্যায়ে এমন আক্রমণের উদ্দেশ্য কি? ব্যাখ্যাটা সহজ। আমরা তারকা দেখতে অভ্যস্ত নই। ক্রিকেটকে যদি আপনি এক ধরণের পারফরমিং আর্ট ধরেন তাহলে এই প্রজন্মের আগে আমাদের দেশে বড় কোন তারকার আবির্ভাব ঘটেনি।

আমরা এটা মানতে পারি যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নিত্যনতুন গাড়ি কিনতে পারেন; মাসে মাসে প্রেমিকা পরিবর্তন করতে পারেন। মানতে পারি মেসি বিয়ে না করেও সন্তানের জনক হবেন, তার বিশাল খরচের বিয়ে মানতে পারি। আমরা নেইমারের বিশাল অংকের টাকায় পিএসজিতে চলে যাওয়া মানতে পারি।

কিন্তু, সাকিবের বিদেশ ভ্রমন, স্ত্রী ভাগ্য, তার নতুন গাড়ি কেনা মানতে পারি না। তার তারকা খ্যাতিকে আমাদের কাছে অসহ্যকর মনে হয়।

তাকে দেখে আমরা ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে’ ভুগি। নিজেদের এই মানসিক সমস্যাকে চেপে রাখার একটাই উপায়, সাকিবকে গালি দেও। কোনো বাছবিচার না করেই গালি দাও, আর বিকৃত আনন্দ পাও।

বরাবরই বলি, সাকিব আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে পেশাদার ক্রিকেটার। সাকিব এই মাঠের বাইরের সমালোচনা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারপরও বলি, যে ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১১ বছর হল আমাদের সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন, তার কী এই আচরণ প্রাপ্য ছিল?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।