সাইকো প্রেমিক || রম্যগল্প

বিয়ের পর শিমু এতো পাল্টে যাবে এটা আমি ভাবতেও পারিনি। মাত্র একমাস আগেও ও ছিলো একরকম, আর বেনারসি শাড়ি পড়ে তিনবার কবুল বলার সাথে সাথে ও হয়ে গেছে আলাদা মানুষ। প্রেমিকা আর বউ কখনো এক থাকে না কেন? কে জানে!

আগে আমাদের সারাদিন ফোনে কথা হতো। সারারাত জেগে কত গল্পই না আমরা করতাম। হাজার দুনিয়ার হাজার টপিক, কথা যেন শেষই হতো না। কিন্তু এখন সেসবের কিছুই হয় না৷ প্রেম চলাকালীন সপ্তায় অন্তত তিনদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়া হতো। আমি আর ও বিল ভাগ করে দিতাম অর্ধেক অর্ধেক। এখন রেস্টুরেন্টে যদিও ভুল ভবিষ্যৎ দুয়েকদিন খাওয়া হয়, তাও বিল পুরোটাই আমার দেয়া লাগে। সেই নারীবাদী শিমু বিয়ের পর আর নারী পুরুষ সম অধিকারে বিশ্বাস করে না। সে এখন নারীদের একার সমস্ত অধিকারে বিশ্বাস করে। তার বর্তমান আইডিওলজিতে পুরুষের কোনো অধিকার নেই।

আগে সপ্তায় একদিন রান্না করে আমার মেসে এনে খাইয়ে দিতো। এখন আমার জন্য রান্না করার সময় ই নাই তার। সে এখন রান্না করে তার বরের জন্য। সে রাতে গল্প করে তার বরের সাথে। রেস্টুরেন্টে খেতেও যায় তার বরের সাথে। খুব সম্ভবত লিটনের ফ্লাটেও যায় বরের সাথেই। আমার সাথে এখন কেন যাবে? আমি তো আর শিমুর কেউ না। প্রেমিক বিষয়টা অনেকটা শেভিং রেজরের মতো। দাড়ি রাখা শুরু করলে যেমন রেজরের কোনো দাম থাকেনা, তেমনি বিয়ের পর প্রেমিকরাও হয়ে যায় মূল্যহীন।

অথচ শিমুর সাথে আমার ব্রেকাপ হয়নি। আমরা স্টিল প্রেমিক প্রেমিকা। ওর বিয়ে হয়ে গেছে, হোক। এতে তো আমি কিছু মনে করিনি। বর থাকবে বরের জায়গায় আর প্রেমিক প্রেমিকের জায়গায়।

শিমু যেদিন আমাকে বলেছিলো ওর বাসা থেকে বিয়ের জন্য ছেলে দেখছে, আমি যেন কিছু করি।

সেদিন আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, ‘আমি কি করব?’

শিমু রেগে গিয়েছিলো, ‘আমার বিয়ে আর তুমি কিছুই করবা না?’

– আরে ছেলে দেখতেছে৷ বিয়ে তো আর হচ্ছে না। বিয়ে ঠিক হোক, তারপর দেখা যাবে।

– আচ্ছা, তো বিয়ে ঠিক হলে তারপর কি করবা?

– আমার পক্ষে যা যা করা সম্ভব। এই মনে করো বিয়ের কার্ড পছন্দ করা, গেট সাজানো, বাজার সদাই, বাবুর্চি ঠিক করা, রান্না আর খাওয়ার তদারকি, গেট ধরে টাকা নেয়া, জামাই এর জুতা লুকানো, গিফট উঠানো, এমনকি তোমার বাবা অনুমতি দিলে বিয়ের পর তোমার সাথে তোমার শ্বশুরবাড়িতেও যেতে পারি।

– আশ্চর্য! আমার শ্বশুরবাড়িতে কেন যাবা?

– আরেহ, যায় না একজন বউএর সাথে? পরে ঐ যে বউভাতের দিন চলে আসে আবার বউএর সাথেই। আমি আমার দুই খালার বিয়েতে গেছিলাম। শার্ট প্যান্ট কিনে দিছিলো। আর লাস্টবার এক ফুফাতো বোনের সাথে গেছি, তারা কিপটা। অনলি পাঁচশো টাকা দিছে হাতে। তোমার বর কি দেবে, কে জানে!

এই সামান্য কথায় শিমু আমার সাথে দেখা করা বাদ দিয়ে দিছে। আমাকে ম্যাসেঞ্জারে ব্লক মেরে রাখছে। এমনকি আমার ফোনও ধরেনা।

তারজন্য যে আমি ওর বিয়ে মিস করবো তা তো হয় না। আমি গেছিলাম। দুইপ্লেট কাচ্চি খাইছি। বোরহানিটা একদম টেস্ট হয়নি। তারপরও তিন গ্লাস মারছি। গেটে টাকা দেয়া নিয়ে ঝামেলা হইছিলো, আমি দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্ততা না করে দিলে হয়তো সেদিন বিয়েটাই ভেঙে যেত। পোলাপানের সাথে বরের হাত ধোয়ায়ে আর গেট ধরে যে টাকা পাইছিলাম তার থেকে আমার ভাগে আসছে সাড়ে চারশ টাকা। তবে দূর্ভাগ্য জুতাটা চুরি করতে পারিনাই। বরের এক বোন কড়া নজর রাখছিলো। তারপর ফটোসেশনেও গেছি। স্টেজে বর বউএর সাথে ছবি তোলার সময় দেখি শিমু আমার দিকে দাত কটমট করে তাকাচ্ছে। আমি ওর কানে কানে গিয়ে বলে আসছি, ‘সামনের রবিবারে ফ্রি থাকলে কল দিও। গাজিপুরের দিকে ঘুরতে যাবো। বাইক ঠিক করছি।’

শিমুর বরের সাথে হ্যান্ডশেক করতে গেছি। আমাকে জিজ্ঞেস করছে, আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।

আমি মুচকি হেসে বলছি, ‘কি বলেন। শিমুকে চিনে এরকম সবাই আমাকেও চেনে। আমি ওর বয়ফ্রেন্ড। ক্যাম্পাসে সবাই আমাদেরকে গরীবের সালমান জেসিয়া বলে ডাকতো।’

শিমুর বরের মুখ এরপর যে গম্ভীর হয়ে গেছে, বাকি পুরো বিয়েতে একবারো হাসেনাই। বেচারার বিয়ের সব ছবিতে হাসি ছাড়া গোমড়া মুখে দেখা যাবে। সারাজীবন এটা নিয়ে আফসোস থাকবে তার।

তো পরের রবিবারে শিমু কল দেয় নাই। এমনকি আমি কল দিয়ে দেখি আমার নাম্বার ব্লাকলিস্টে দিয়ে রাখছে।

আমি পরদিন দশকেজি হিমসাগর আম আর দুইশো চায়না থ্রি লিচু কিনে নিয়ে শিমুর শ্বশুরবাড়িতে গেলাম। এই মৌসুমে নতুন বউএর বাসায় ফল নিয়ে যেতে হয়। ওর ফ্যামিলির যেমন কর্তব্য আছে তেমনি বয়ফ্রেন্ড হিসাবে আমার দায়িত্বও কম না। শিমুই গেট খুললো। অবাক হয়ে বললো, ‘তু তু তুমি?’

– হ্যা আমি, তোতলানোর কি আছে? আমি তোমার সৎ প্রেমিক না। বাসার সবাইকে ডাকো। আর আম লিচু আছে, ভেতরে নাও।

শিমুর বর আমাকে দেখেই চোখমুখ শক্ত করে ফেলছে। কিন্তু কিছু বলতেও পারতেছে না। সে লোক ভালো। পরে জানছিলাম, বাসর রাতে বউএর কাছে প্রমিজ করছিলো কেউ কারো পাস্ট নিয়ে কথা বলবে না।

কিন্তু তারপরও মনের ভেতরের খচখচানি কি যায়?

কিন্তু শিমুর শ্বশুর শ্বাশুড়ি তো কিছুই জানে না। তারা বেয়াই বাড়ির লোক ভেবে আমাকে সেইরকম আদর যত্ন করা শুরু করলো। টেবিলে পদের শেষ নেই। শিমুর শ্বশুর, বর, বরের দুই ভাই সহ একসাথে খেতে বসছি। শ্বাশুড়ি আর শিমু খাবার তুলে দিচ্ছে প্লেটে।

আমি মুরগির রানে কামড় দিয়ে হাসিমুখে বললাম, মজার একটা কাহিনী শুনেন সবাই। শিমুকে আমি প্রপোজ করি সেকেন্ড ইয়ারে। শিমু সেটা একসেপ্ট করে থার্ড ইয়ারের লাস্টে৷ তবে প্রপোজ করা থেকে একসেপ্ট হওয়ার মধ্যে এই পুরো এক বছর আমরা জাস্টফ্রেন্ড হয়ে ছিলাম। মানে প্রেমিক প্রেমিকাও না, আবার খাওয়াদাওয়া সবই চলতো। হাহাহা!

টেবিলে বসা সব মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। শিমুর বর প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যই সম্ভবত তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লো। বললো, আমার খাওয়া শেষ। আপনারা খান৷ আমি চিংড়ি মাছের বাটিটা টেনে নিলাম। এটা বেস্ট হয়েছে।

পরদিন বিকালে রেস্টুরেন্টে আমি আর শিমু মুখোমুখি। শিমু আমার দিকে চেয়ে রাগান্বিত গলায় বললো, ‘সোহাইল প্লিজ, তোমার দোহাই লাগে। আমার বিয়েটা তুমি ভেঙে দিও না।’

– আমি বিয়ে ভাঙছি না শিমু। তুমিই আমাদের প্রেমটা ভেঙে দিচ্ছো। ফোন রিসিভ করো না। এফবিতে ব্লক দিয়ে রাখছো। প্রেম ভাঙা না তো কি?

– কিসের প্রেম? আমার বিয়ে হয়ে গেছে তুমি জানো।

– তো? বিয়ে হলে প্রেম ভাঙতে হবে নাকি? গতবছর আমার ফুফাতো বোনের বিয়ে হইছে, আমি কি তোমার সাথে ব্রেকাপ করেছি?

– তোমার ফুফাতো বোনের বিয়ের সাথে আমাদের প্রেমের কি সম্পর্ক?

– কোনো সম্পর্ক নাই। আমি তো সেটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে বিয়ের সাথে প্রেমের কোনো সম্পর্ক নাই। বিয়ে বিয়ের জায়গায়, প্রেম প্রেমের জায়গায়।

– সোহাইল তুমি একটা সাইকো, তুমি একটা পাগল।

– হ্যা, তোমার প্রেমে পাগল।

– আমার বরকে তুমি চেন না! ওর এক ফ্রেন্ড পুলিশ অফিসার। তোমার ক্ষতি হবে সোহাইল।

– কি করবে? মারবে? জেলে ঢুকাবে? প্রেমের জন্য এইটুকু সেক্রিফাইস আমি করতে পারবো। তোমার জন্য আমি মরে যেতেও পারি, আর এ তো সামান্য জেল।

শিমু আর কিছু না বলে রেগেমেগে চলে গেলো। রেস্টুরেন্টের বিল দেয়া লাগলো আমার একার। এর আগে আম আর লিচু আর আজ রেস্টুরেন্টের বিল। প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলে দেখি প্রেমিকের আরো খরচ বেড়ে যায়। আমি হতাশ হলাম। প্রেম মানেই আজাইরা খরচ। আগে জানলে প্রেমে পড়তামই না। তবে এখন হয়েই যখন গেছে, কি আর করা!

সারাজীবন এই প্রেম টেনে নেয়া লাগবে। আজ এক মেয়ে, কাল আরেক মেয়ে, এমন প্রেমিক আমি না। আমার কাছে প্রেম মানে সারাজীবন একজনকেই ভালোবাসা। তাতে তার বিয়ে হয়ে গেলেও কিছু যায় আসে না। এমনকি শিমু যদি মারাও যেত, তারপরও আমি ওকে সারাজীবন ভালোবাসতাম। ঝাল পছন্দ করতো বলে কবরের ওপর মরিচ গাছ লাগায় আসা টাইপ ভালোবাসা!

কিন্তু শিমু আমাকে ভালোবাসে না। বিয়ের পর সে পাল্টে গেছে। প্রেমিকা আর বউ কখনো এক থাকে না কেন? কে জানে!

তবে আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। ছাড়বোও না। ছোট বাচ্চার কয়েক সেট কাপড় কিনে শিমুদের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। শিমুর বাচ্চা হবে এরকম কোন নিউজ আসেনি, কিন্তু আমরা তাগাদা না দিলে কিভাবে হবে? আমার মন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। প্রেমিকার ছেলে বা মেয়ে আমাকে মামা ডাকবে, এর চাইতে খুশির খবর আর কি হতে পারে একজন প্রকৃত প্রেমিকের কাছে!

অথচ আজ আমি জানি, শিমু আমাকে দেখলে প্রচণ্ড বিরক্ত হবে। বাচ্চার কথা বলতে গেলেই রেগে যাবে। অথচ একসময় আমরা বাচ্চার নাম কি হবে এটা নিয়ে সারারাত তর্ক করেছি৷ তারপর যে নাম ঠিক করা হয়েছিলো, আমি জানি শিমুর বাচ্চা হলে ও সেই নাম রাখবেও না। মেয়েরা বিয়ের পর আসলেই অনেক পাল্টে যায়!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।