সর্বজয়ী এক গোলরক্ষক

একজন ফুটবলারের পক্ষে যা যা অর্জন করা সম্ভব, সবই তাঁর প্রাপ্তির ঝুলিতে পোরা আছে। বার্সেলোনার ইতিহাসে সেরা গোলরক্ষকদের তালিকা করলে বেশ উপরেই থাকবে তাঁর নামটা।

তিনি ভিক্টর ভালদেস।

কখনো কখনো পাগলামি করে বসেন, তবে ভিক্টর ভালদেসের সামর্থ্য নিয়ে কখনোই প্রশ্ন ওঠেনি। এক দশক ধরেই ছিলেন বার্সেলোনার গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী। চার বছরে পেপ গার্দিওলার ১৪ ট্রফি জয়ের অন্যতম সেনানী। সব মিলিয়ে বার্সার হয়ে জিতেছেন ২১টি শিরোপা।

বার্সেলোনাতেই জন্ম তাঁর। পেশাদার ফুটবলে আবির্ভাব বার্সার হাত ধরেই। খেলেছেন বার্সার যুব দলে।  ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লেজিয়ার বিপক্ষে অভিষেক হয় ভালদেসের।

প্রথম মৌসুমে সেকেন্ড চয়েস গোলরক্ষক হিসেবে খেললেও পরের মৌসুমেই দলে নিয়মিত হয়ে যান, একসময় তিনি হন বার্সার মূল গোলরক্ষক। ২০০৪-০৫ মৌসুমে বার্সার হয়ে কোন ম্যাচেই তাঁর সাইড বেঞ্চে বসতে হয়নি।

৬ বছরের মধ্যে বার্সার প্রথম লিগ শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি পান ‘জামোরা ট্রফি’ জিতে।

পরের মৌসুমেও দারুণ খেলতে থাকেন ভালদেস।  বার্সার ডাবল জিতিয়েছেন অনেকটা নিজেই। চ্যাম্পিয়নস লীগে অসাধারণ গোলকিপিং করে সবার প্রশংসা কুড়ান তিনি।

তবে ভালদেসের সেরা রূপটা দেখা যায় পেপ গার্দিওলার অপ্রতিরোধ্য বার্সার সময়ে। মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তাদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলনা নির্ভরতার সাথে গোলবার সামলানো ভালদেসের অবদান। ২০০৯ এ ট্রেবল জয়ের পথে ভালদেসই রেখেছিলেন বড় অবদান, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দুই অর্ধে দুইটি গোল ফিরিয়ে দিয়ে বার্সাকে শিরোপা জিততে সহায়তা করেন। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে আরেক উচ্চতায় ওঠেন কাতালান এই গোলরক্ষক। বার্সার জার্সি গায়ে কোন গোলরক্ষকের পক্ষে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার জুবিজারতার রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি।

মেসির সাথে

২০১৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারা ম্যাচে ১৭ তম ফুটবলার হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড করেন ভালদেস। তবে তখনি আসে শকিং নিউজ। ভালদেস জানিয়ে দেন, ওই মৌসুম শেষে বার্সেলোনার সাথে চুক্তি আর নবায়ন করবেন না তিনি।

অর্থাৎ বার্সায় ভালদেস অধ্যায়ের ইতি টেনে দিলেন। তবে মাঠ থেকে বিদায়টা মোটেও ভাল হয়নি কিংবদন্তি এই গোলরক্ষকের। সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ম্যাচের ২২ মিনিটে লিগামেন্ট ছিঁড়ে মাঠ থেকে বের হয়ে যান তিনি, ওইটাই ছিল বার্সার জার্সি গায়ে ভালদেসের শেষ ম্যাচ।

বার্সেলোনা অধ্যায় শেষে মোনাকো হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসেন ভালদেস। তবে ইউনাইটেডে ভালদেসের স্থায়িত্ব মোটেও সুখকর হয়নি। রেড ডেভিলদের জার্সি গায়ে মাঠে নামতে পেরেছিলেন মাত্র দু’টি ম্যাচে।

জাতীয় দলের জার্সি কম প্রাপ্তি এনে দেয়নি ভালদেসকে। মূলত সেরা অর্জনটা এসেছে স্পেনের জার্সি গায়েই। ২০১০বিশ্বকাপ ও ২০১২ইউরো জয়ী স্পেন দলের গর্বিত সদস্য তিনি।

তবে সে দলের গোলপোস্টে ইকার ক্যাসিয়াসের মত কিংবদন্তী অপশন থাকায়, নিয়মিত একাদশে জায়গা হত না তাঁর। তবে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার আনন্দে সেই দুঃখ নিশ্চয়ই ঘুচে গেছিল তাঁর।

অঁরি ও ভালদেস

ভিক্টর ভালদেসের ব্যক্তিগত অর্জন কম নয়। ভিক্টর ভালদেসই একমাত্র গোলরক্ষক যার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কেউ হ্যাটট্রিক করতে পারেনি। এমনকি এক ম্যাচে পাঁচটা বা তার বেশি গোল ও দিতে পারেনি কেই। লা লিগাতে গোলরক্ষকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ক্লিনশিটের মালিক ভালদেস। লা লিগাতে সব থেকে বেশি পেনাল্টি সেভারও তিনি। বল রিফ্লেকশনে ভালদেসের সব থেকে ভাল। এক গবেষনায় দেখা গেছে ভালদেসের রিয়্যাকশন টাইম সব থেকে কম, এমনকি সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিন থেকেও কম!

জামোরা ট্রফি জিতেছেন সর্বোচ্চ ৫ বার, লা লিগার বর্ষসেরা গোলকিপার হয়েছেন ৪ বার। বার্সেলোনার হয়ে ৬ টি লা লিগা শিরোপা জিতেছেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন ৩ টি।

বার্সার অনেক সাফল্যের সঙ্গী এই গোলরক্ষক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন কিছুদিন আগে। ফুটবল ছাড়লেও ভক্তদের মনে ঠিকই নিজের জায়গা জুড়ে থাকবেন ভিক্টর ভালদেস।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।