সর্বকালের সেরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো!

‘আমিই ইতিহাসের সেরা ফুটবলার, সেটা ভাল সময়ে এবং খারাপ সময়ে।’ – কথাটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আরো নয় বছর আগে বলতে পারতেন। কিংবা ২০১৩ তে দ্বিতীয় ব্যালন ডি অর জয়ের সময়ও বলতে পারতেন। কিন্তু ২০১৪ তেও এমন কথা বলেন নি। ২০১৬ তে চার নাম্বার ব্যালন ডি অর জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন তিনি গত বিশ বছরের সেরা খেলোয়াড়। ২০১৭ তে এসে যখন নিজের পঞ্চম এবং মেসির সাথে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ব্যালন ডি অর জিতে নিলেন তখন তিনি বুঝলেন এটাই হয়ত সঠিক সময় বলার – ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই সর্বকালের সেরা ফুটবলার!

নিজেকে নিয়ে রোনালদোর মন্তব্যটা অনেকের কাছে মাত্রাতিরিক্ত আত্নবন্দনা মনে হতে পারে, কিন্তু তার এরকম আত্মশ্লাঘাই হয়ত একসময় তাকে পেলে ম্যারাডোনার পাশের চেয়ারে বসিয়ে দেবে। আপনি যদি পেলে এবং ম্যারাডোনার দিকেও লক্ষ্য করেন – যাদের সন্দেহাতীতভাবে ইতিহাসের সেরা ভাবা হয় – তারাও সবসময় নিজেদের প্রশংসায় মগ্ন থাকেন।

তারা সেখানে অন্য কাউকে জায়গা দিতে রাজি থাকেননা সচরাচর, যে কারণে পেলে ম্যারাডোনা বিতর্ক এখনো চলছে আপন গতিতে। ব্রাজিলিয়ান রোনালদো, রোনালদিনহোরা এসেছিলেন মেসি রোনালদোর আগে পেলে ম্যারাডোনা বিতর্কে কিছুটা ভাগ নিতে কিন্তু তারা শেষপর্যন্ত পেরে উঠেননি। আর মেসি রোনালদোতো নিজেদের মধ্যেই কে সেরা সেটাই নির্ধারণ করতে পারেনি এখনো – ইতিহাসের ব্যাপারতো পরে।

এতদিন পর্যন্ত ধারণা তাই ছিল, অন্তত রোনালদোর ক্ষেত্রে। কিন্তু ২০১৭ এর ডিসেম্বরে এসে মেসি এবং রোনালদো নিজেদের মধ্যে লড়ায় করতে করতে এমন সব কীর্তি করেছেন – দশ বছরের এই জজ্ঞের ফলে তাদের অর্জনগুলো অনেক বড় আকার ধারণ করেছে যেটা সর্বকালের সেরার পদটা সহজে নাড়িয়ে দেয়। হয়ত এই দুইজনের একটি বিশ্বকাপে শিরোপা পেলে-ম্যারাডোনার তৈরি করা বিশাল দালানকে মুহুর্তেই গুড়িয়ে দিতে পারে। তবে এগুলা শুধু সম্ভাবনার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হয়ত ভিন্ন। তবে অনুজ দুই এর অর্জন অবশ্যই তাদের সর্বকালের সেরা দশ জনের ভিতরে রাখবে কোন সন্দেহ নেই।

রোনালদোর জন্য এই কাজটা সহজ ছিলনা, কোনভাবেই না, একেবারেই না। এই পর্যায়ে আসতে রোনালদোর কতটা ঘাম ঝড়াতে হয়েছে, কতটা মনোযোগ দিতে হয়েছে, কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তা রোনালদোর কথাতেই ফুটে উঠে, ‘(আমার অর্জন) শুধু জিমে করা ব্যায়ামের ফসল বলে মানুষ ধারণা করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আরো অনেক কিছুরই যোগফল এটা।’ অনেক কিছু বলতে কি বুঝিয়েছেন সেটা বুঝতে আপনাকে রোনালদোর হয়েই রোনালদোকে বুঝার চেষ্টা করতে হবে।

দর্শক হিসেবে যতটুকু দেখেছি, রোনালদোর মত এত ভাল খেলে এবং দলে এত অবদান রেখেও ফুটবল পন্ডিতদের কাছ থেকে প্রশংসার সমান সমালোচনা পেতে আর কোন গ্রেট প্লেয়ারকে দেখিনি। এই বছরই বার্সা কিংবদন্তি জাভি বলেছিলেন যে রোনালদোর সেরা হবার পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা মেসি। শুধু জাভি না, এটা অনেকেরই ধারণা। কিন্তু সেটা ২০১২ পর্যন্ত ঠিক ছিল।

২০০৮ সালে রোনালদো তার প্রথম ফিফা বর্ষসেরার পুরষ্কার এবং ব্যালন ডি অর জয়ের পর টানা চার বছর সবার সামনে বসে দেখেছেন তার সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বী মেসিকে পুরষ্কারগুলো নিয়ে যেতে। যদি এমন হতো যে রোনালদো কোন ইনজুরিতে ছিল কিংবা তার পারফর্মেন্স আশানুরূপ ছিলনা তাহলে এটা হয়ত মেনে নিতেন অনেক রোনালদোপ্রেমী, কিন্তু সেটা যেহেতু না তাই মেসির এরকম একচেটিয়া অর্জন শুধু রোনালদো ফ্যান না, স্বয়ং রোনালদোকেই দারুনভাবে হতাশ করেছিল। রোনালদো সেটা স্বীকারও করেছেন ফ্রান্স ফুটবলকে দেয়া সাক্ষাতকারে, ‘২০০৮ এর পর আমি পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়েছি কিন্তু কখনোই জিততে পারিনি। একটা সময় আমি অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলি, আমার আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা।’

‘এরপর ধীরে ধীরে আমি নিজেকে বলতে থাকি – সব জায়গাতে একটা শুরু আছে আর শেষ আছে। আর ফুটবলে মানুষ শুরু না, শেষটাই মনে রাখে। আমি ধৈর্যশীল ছিলাম, এবং (অবশেষে) আমি আরো চারটা ব্যালন ডি অর জিতে নি। যারা আমার সাথে ছিল তাদের ধন্যবাদ জানাই’ – রোনালদো যোগ করেন।

এই দুটা কথাই বলে দেয় রোনালদোকে কতটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শুধু কি সমালোচক, নিজের দলের দর্শকদের কাছেও দ্যুয় শুনেছেন বহুবার। মাঠে তার শারিরীক ভাষা, সতীর্থকে সঠিক সময়ে পাস না দেওয়া কিংবা পাস না পেয়ে বিরক্তি প্রকাশ – এসব বার্নাব্যু দর্শকরা সবসময় ঠিকভাবে নেয়নি, বিশেষকরে দলের খারাপ সময়ে। সব মিলে সমালোচকরা রোনালদোকে অহংকারী, দাম্ভিক হিসেবে চিনতে চায়। তার বিভিন্ন সময়ের উক্তিগুলোকে একেবারে আক্ষরিক ধরে হাসাহাসিও হয়েছে অনেক। কিন্তু যারা রোনালদোকে চেনে তারা বুঝে এটা রোনালদোর দাম্ভিকতা না, এটা একটা গর্বের জায়গা যেখানে অন্তত রোনালদো নিজেকে দশে দশ দিতে রাজি, সেখানে তিনি বাকিদের ধার ধারেননা।

২০১২ সালে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগা জয়ের পরেই বলেছেন, ‘এই মৌসুমে আমি ব্যাক্তিগতভাবে দশে দশ দিয়েছি, দল হিসেবে নয়।’ এটাকে আপনি রোনালদোর আত্মগরিমা বলে প্রচার করতে পারেন, কিন্তু একজন বেতনভুক্ত খেলোয়াড় হিসেবে এটা আসলে তার পেশাদারিত্বই প্রমাণ। রোনালদো তার পরিশ্রমের অবমুল্যায়ন চাইবেন কেন। তার এতসব অর্জনের পরও অনুশীলনে সবার আগেই আসেন, ফেরেনও সবার পর যেটা তার কাজের প্রতি নিষ্ঠা প্রকাশ করে।

তবে তার সাফল্য শুধু পরিশ্রমের ফসল মানতে নারাজ রোনালদো, ‘ফয়েড মেওয়েদার কিংবা লেব্রন জেমসরা তাদের পারফেক্ট পজিশনে বাই চান্সে পৌছাননি, অনেক ফ্যাক্টর সেখানে জড়িত। টপে যেতে এবং সেখানেই থাকতে আপনাকে অন্যদের চেয়ে বেশি মেধাবী হতে হয়।’

হয়ত এই জায়গাতেই সমালোচকরা রোনালদোর মেধাকে মেসির মত মুল্যায়ন করেনা। সুইডিশ তারকা ইব্রাহিমোভিচের মতে মেসি হচ্ছেন স্বভাবজাত প্রতিভাবান, যেখানে রোনালদো উন্নতমানের ট্রেনিংয়ের ফসল। ইব্রা হয়ত খেলার স্টাইলের কথা মনে করে উক্তিটি করেছেন। কিন্তু যাস্ট খেলার স্টাইলের কথা বিবেচনা করে একটা প্লেয়ারকে বিচার করা কতটুকু যৌক্তিক যখন সেখানে ব্যাক্তিগত অর্জনও রোনালদোর পক্ষে কথা বলে।

আর ইতিহাস বলে সেই অর্জনের স্বীকৃতি নির্ভর করে দলগত সাফল্যের উপর। যখন মেসি তার চতুর্থ ব্যালন ডি অর জেতে তখন বার্সেলোনা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দল, যে দলকে সবাই হারাতে চায়ত কিন্তু সেটাই ছিল সবচেয়ে কঠিণ কাজ। যে ব্যাক্তিগত নৈপুণ্য দলীয় সাফল্য নিয়ে আসে সেটাই সেরার স্বীকৃতি পায়। ঘটনাক্রমে সেই দলীয় সাফল্যের চাবি চলে আসে বার্নাব্যুতে। সেই সাথে উজ্জ্বল থেকে উজ্জলতর হতে থাকে রোনালদোর কীর্তি। পাঁচ বছর আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে করা দুই গোল যেখানে শুধু দুইটা গোল হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছিল ২০১৭ তে এসে সেই বায়ার্নের বিপক্ষেই করা চার গোল বিবেচিত হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী পারফার্মেন্স হিসেবে। অন্যদিকে একইবছরই মেসির এল ক্লাসিকোতে করা গোল আর সেলিব্রেশন চলে গেছে বাতিলের খাতায়।

সৃষ্টিকর্তা একেক খেলোয়াড়কে একেক ধরণের মেধা দিয়েছেন। মেসির পায়ে হয়ত ছুঁয়ে দিয়েছিলেন যাদুর কাঠি যেটার শক্তিতে বলকে তিনি খেলান ইচ্ছেমত। পক্ষান্তরে রোনালদোকে দিয়েছেন শারিরীক ক্ষমতা যেটা দিয়ে তিনি তৈরি করবেন বিস্বয়কর সব মুহুর্ত। আর দুইজনকেই দিয়েছেন উর্ভর মস্তিষ্ক সাথে তাদের অদম্য ইচ্ছা যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে ফুটবলের এক ধ্রুপদি লড়াইয়ের গল্প।

এটা এর আগে কখনো ফুটবলে ঘটেনি। ৬০ এর দশক ছিল পেলের, ৭০ ক্রুইফের, ৮০ মেরাডোনার, ৯০ রোনালদোর, ২০০০ জিদানের। এরপর মেসি-রোনালদোর। আর এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল রোনালদোর হাল না ছাড়ার মানসিকতা। কারণ ২০১২ তেই সেটা মেসির যুগ হিসেবে খোদাই হয়ে যেতে পারত।

রিয়ালমাদ্রিদে রোনালদোর গোলস্কোরিং রেকর্ড যেকারো জন্য ধরাছুঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে ইতিমধ্যে। ৪১৩ ম্যাচ খেলে করেছেন ৪২০ গোল, হ্যাট্রিক ৪২ টি! এছাড়াও এসিস্ট করেছেন আরাও ১০৩ টা গোলে। এগুলা যাস্ট সংখ্যা। মাঠে রোনালদো সতীর্থদের জন্য অন্যরকম এক অনুপ্রেরণা। আপনি রোনালদোর খেলার ধরণে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু ওকে বাদ দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের জয় চিন্তা করতে পারেন না। তার বর্তমান অর্জন অনায়াসেই তাকে রিয়াল মাদ্রিদ ইতিহাসের সেরা প্লেয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম, যদিও সেটা তর্কযোগ্য।

মাঠে রোনালদোর উপস্থিতি কতটা অপরিহার্য সেটা আরো প্রমাণ পায় তার জাতীয় দল পর্তুগালের হয়ে খেলার সময়। খুব কম পর্তুগিজই বিশ্বাস করত তাদের ইউসেবিওকে অতিক্রম করতে পারে এমন কোন প্লেয়ার আর আসবে কিংবা লুইস ফিগো, রুই কস্তাদের সোনালী প্রজন্মের পর আর কোন দল আসবে যাদের পক্ষে বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব।

সেই সময়টা শেষ পর্যন্ত আসে ২০১৬ এর জুনে যখন পর্তুগাল রোনালদোর নেতৃত্বে জিতে নেয় তাদের প্রথম ইউরো। ইউরো জয়কে রোনালদো তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মধুর মুহুর্ত বলে আখ্যায়িত করেন, যদিও ক্লাব লেভেল প্রায় ২১ টা শিরোপা জিতেছেন। এটা দ্বারা বুঝায় পর্তুগাল তার কাছে আরো বড় কিছু। জাতীয় দলের হয়ে এখনপর্যন্ত তার অবিশ্বাস্য ৭৯ গোলও (পেলের চেয়ে ৮ গোল বেশি) বুঝিয়ে দেয় ইউসেবিও না রোনালদোই পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।

পেলে এবং ম্যারাডোনা ফুটবলে সম্পূর্ণ দুইরকম স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে ইতিহাসের সেরা বিবেচনার জন্য। শারিরীকভাবে প্রায় নিখুঁত এবং বলকে কন্ট্রোল করার অতুলনীয় দক্ষতার পাশাপাশি ক্লাবে অসংখ্যা গোল, শিরোপা এবং সাথে তিনটা বিশ্বকাপ পেলে কে ধরাছোঁয়ার বাইরেই নিয়ে গেছে। অন্যদিকে নান্দনিকতাই যার কাছে ছিল সবার আগে।

পায়ের যাদুতে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনা আর ন্যাপোলিকে নিয়ে তৈরি করেছেন অতুলনীয় রুপকথা। খেলার ধরণে ম্যারাডোনার প্রতিদ্বন্দ্বী মেসি এখনো নিজের দেশেই ম্যারাডোনার কাছাকাছি যেতে পারেননি। পেলের তিনটা বিশ্বকাপ বাদ দিলে রোনালদোর পক্ষে পেলের গোল রেকর্ড কিংবা ম্যারাডোনার মত দুর্বল দল নিয়ে বিশ্বকাপ জেতার মত সুযোগ আছে। যদিও পর্তুগালকে নিয়ে বিশ্বকাপ জয়টা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু সাত ম্যাচের টুর্নামেন্টে রোনালদোর পক্ষে সেটা করা সম্ভব। যদি সম্ভব হয়ে যায় তাহলে ইতিহাসই নির্ধারণ করবে সর্বকালের সেরাদের কাতারে রোনালদো কোথায়।

আর যদি সম্ভব নাও হয় তারপরও কি আমরা বলব রোনালদোই সর্বকালের সেরা? ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান বলেন, ‘হ্যা। পরিসংখ্যানই তার পক্ষে কথা বলছে – সেটা এখন পর্যন্ত মাঠে যা করেছে এবং ভবিষ্যতে যা করবে, দুইটাই বিবেচনা করে।’

তারপরও, রোনালদো কি পেলের কাতারে যেতে পারবে?  হোসে মরিনহো বলেন, ‘আমার সন্তানরা পেলে কে খেলতে দেখেনি, কিন্তু তারা জানে সে কে। আর ৪০ বছর পর শিশুরা জানবে ক্রিশ্চিয়ানোকে।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।