সর্বকালের সেরা ‘নাম্বার নাইন’

১.

‘ফেনোমেনন’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ কি জানা আছে?

আচ্ছা, এই বিষয়ে পরে যাই। এখন বরং অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করি।

ফুটবল খেলায় সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্কিল কোনটি? একেকজনের কাছে একেকটা ভালো লাগে। কারো কাছে হয়তো দূর পাল্লার শটে গোল কিপারকে পরাস্ত করে গোল করাটাকে ভালো লাগে, কারো কাছে হয়তো ফ্রি কিকে গোল দেওয়া, আবার কারো কাছে হয়তো গোল করতে দেখাটাই মূখ্য। তবে মোটামুটি সবাই একমত হবেন যে ড্রিবলিং টা ফুটবলের একটা স্পেশাল স্কিল। চার পাচজনকে পরাস্ত করে গোল দেওয়ার মাঝে একটা অন্য রকম শিহরণের বিষয় আছে।

এখন এই পর্যন্ত ইতিহাসের সেরা ড্রিবলার কে? পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, ব্যাজিও, জর্জ বেষ্ট – আরো অনেকের নাম আসবে। হালের অনেকেই মেসিকে সর্বকালের সেরা ড্রিবলার মনে করে। অবশ্য বেশীর ভাগ বিশ্লেষকরা ইতিহাসের সেরা ড্রিবলার হিসেবে গ্যারিঞ্চাকে মেনে নেয়। তবে এতসব ড্রিবলারের ভেতর খুব কম ড্রিবলারই সক্ষম ছিলেন যারা দুই পা ব্যবহার করেই ড্রিবলিং করতে পারতেন। খুব সম্ভবত এই ঘরণার ড্রিবলারদের মাঝে সর্বকালের সেরা হচ্ছেন রোনালদো লিমা।

লিমা ফুটবলার হিসেবে কেমন ছিলেন?

কেমন ছিলেন সেটা লেখার পরবর্তী অংশে কিছুটা বলার চেষ্টা থাকবে তবে পিক ফর্মে ফুটবল মার্কেটে তার চাহিদা ব্যাপক ছিল। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দুইজন খেলোয়াড় দু’বার ট্রান্সফার ফি’র রেকর্ড গড়েছেন। প্রথম জন হচ্ছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা, দ্বিতীয় জন হচ্ছে রোনালদো লিমা। লিমা যখন দ্বিতীয় বার ট্রান্সফার ফির রেকর্ডটা ভাঙ্গে তখন তিনি তার বয়স ২১ বছরেরও কম।

২.

মাত্র ১৭ বছর বয়সেই রোনালদো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পেয়ে যান। পাবেন না কেন? ব্রাজিলের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে ক্রুজেরিওর হয়ে প্রথম বারের মতো দলকে পাইয়ে দেন কোপা ডো ব্রাজিল। এখানে ১৪ ম্যাচে ১২ গোল করে লিমা আলো ছড়ান। তবে বিশ্বকাপে মূল স্কোয়াডের হয়ে খেলতে পারেননি। তখন যে মাঠ মাতাচ্ছেন রোমারিও বেবেতো জুটি।

বিশ্বকাপের পরেই লিমা চলে যান পিএসভি আইণ্ডহোভেনে। প্রথম মৌসুমেই ৩০ গোল করেন এবং ১৯৯৬ সালে দলকে ডাচ কাপ জেতান। এরপরেই লিমা চলে আসেন বার্সালোনাতে। সেখানে ১৯৬-৯৭ মৌসুমে ৪৭ টি গোল করেন মাত্র ৪৯ টি ম্যাচে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই ফিফা বর্ষসেরা পুরষ্কার পান যা কিনা এখন পর্যন্ত একটা রেকর্ড। তবে একপর্যায়ে রোনালদোর চুক্তি নিয়ে বার্সালোনার সাথে সমস্যা হয়। রোনালদো পরবর্তীতে ইন্টার মিলানে চলে আসেন। এখানে এসে উয়েফা কাপ জিতেন যার ফাইনালে ম্যান অব দি ম্যাচ হন লিমা। ইন্টার মিলানে থাকা অবস্থাতেই দ্বিতীয় বারের মতো ফিফা বর্ষসেরা পুরষ্কার জিতে নেন রোনালদো।

পরের বছর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সে যান সর্বকালের সেরা হবার সম্ভাবনা নিয়ে।

৩.

১৯৯৮ বিশ্বকাপ, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সবচেয়ে বড় স্টার রোনালদো। দু’বার ফিফা বর্ষসেরা পুরষ্কার পাওয়ায় তাকে তুলনা করা হচ্ছিল পেলে আর ম্যারাডোনার সাথে। টুর্নামেন্টের শুরুটাও দুর্দান্ত ভাবে করেছিলেন। ফাইনালের আগ পর্যন্ত করলেন ৪ টি গোল, অ্যাসিস্ট ৩ টি। কিন্তু ফাইনালে একেবারেই ব্যর্থ ছিলেন। সেই সময়ের পত্রিকায় আসে অসুস্থ থাকায় প্রথমে তার ফাইনাল খেলার কথা ছিল না কিন্তু স্পন্সরদের চাপে খেলানো হয়।

স্পনসরের বিষয়টা সত্যি নাকি রিউমার সেটা পরবর্তীতে আর সঠিকভাবে জানা যায় নি তবে ফাইনালে তার পারফর্মেন্স আসলেই খারাপ ছিল। যখন দেখা যায় যে এই এক ম্যাচের জন্যই তাকে সমালোচনায় ভাসিয়ে ফেলা হয়, তখন বোঝা যায় মানুষ তার কাছ থেকে কি আশা করে।

অথচ সেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, নক আউট ষ্টেজে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল – কি না করেছেন। সেই দুঃখ ভোলার জন্য বেছে নিলেন ২০০২ এর বিশ্বকাপ। অথচ ইনজুরির জন্য তাতে জায়গা পাওয়ার কথাই ছিল না। কিন্তু সুযোগ পেয়ে যা করলেন সেটাকে হয়তো রুপকথার সাথেই তুলনা করা যায়। ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতার সাথে সাথে জিতে নিলেন বিশ্বকাপ, সেই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড়।

গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জ্বলে উঠার জন্য রোনালদোর চেয়ে ভালো কোন ষ্ট্রাইকার সম্ভবত ফুটবল বিশ্ব আর দেখেনি। ১৯৯৭ আর ১৯৯৯ এর দুই কোপার ফাইনালেই গোল করেছেন। ১৯৯৭ সালের কোপার সেরা খেলোয়াড় আর ১৯৯৯ সালের কোপার সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৩টি আন্তর্জাতিক শিরোপা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাথে সাথে ২ বার টুর্নামেন্ট সেরার খেতাব, ২ বার সর্বোচ্চ গোলদাতা, ১ বার রানার্স আপ, যে তিনটি ফাইনালে জিতেছে তার প্রতিটিতেই গোল করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে এতটা সফলতা কি তার সময়ের কিংবা এর পরের কোন খেলোয়াড়ের আছে?

২০০৬ বিশ্বকাপেও দলে সুযোগ পান কিন্তু সেরা ফর্মে ছিলেন না। দলও বাদ পড়ে কোয়ার্টার থেকেই। তবে এর মাঝেও ৩ গোল করে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশী গোলের রেকর্ডটা করে নেন। ( পরবর্তীতে ২০১৪ সালের বিশ্বকাশে সেই রেকর্ডটা ভাঙেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা)।

৪.

অর্জনের তালিকায় লিমার ক্যারিয়ারের একমাত্র আক্ষেপ যে কখনোই কোনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা দলের অংশ হতে পারেন নি। সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন ২০০৩ সালে। আগের বছরের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল দল হিসেবেও দূর্দান্ত ছিল। কোয়ার্টারে লিমার হ্যাটট্রিকেই ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড বাদ পড়ে।

ম্যাচের ১২ তম মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে শট করে বার্থেজকে বিট করেন রোনালদো। রোনালদো যে পজিশনে ছিলেন সেই পজিশন থেকে সাধারণত স্ট্রাইকাররা Far পোষ্টে শট নেয়। কিন্তু রোনালদোর Near পোষ্টে করা শটটাতেও বার্থেজ পরাস্ত হয়।

৫০ তম মিনিটে রোনালদো যখন বল পায়ে পেল তখন তার সামনে শুধু ফাকা গোল পোষ্ট। ৫৯ তম মিনিটে ডি বক্সের প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে শট, হ্যাটট্রিক। এই ম্যাচের পরেই রোনালদো লিমা স্ট্যান্ডিং অ্যাভিয়েশন পায় ইউনাইটেড সমর্থকদের কাছ থেকে।

কিন্তু, সেমিতে জুভেন্টাসের কাছে হেরে যায় রিয়াল। ঘরের মাঠে জুভেন্টাসের সাথে ২-১ গোলে জেতা ম্যাচেও গোল করেছিলেন। কিন্তু অ্যাওয়ে ম্যাচে হেরে যায় ৩-১ গোলে। ফিগো পেনাল্টি মিস না করলে অ্যাওয়ে গোল বেশি থাকার কারণে রিয়ালই ফাইনাল খেলতো। তাহলে হয়তো লিমার আক্ষেপ কিছুটা ঘুচতো।

৫.

তবে জাতীয় দলের মতো না হলেও ক্লাবের হয়েও তিনি ব্যর্থ নন। ক্যারিয়ারে অনেক বড় বড় ক্লাবেই খেলেছেন। মিলান ডার্বিতে রোনালদো গুটিকয়েক খেলোয়াড় হিসেবে ইন্টার মিলান ও এসি মিলান উভয় দলের পক্ষে অংশ নিয়ে দু’দলেই গোল করেন (ইন্টার মিলানে ৯৮-৯৯ মৌসুম এবং এসি মিলানে ২০০৬-০৭ মৌসুমে)। (এই বিরল সৌভাগ্যে অন্যজন হলেন – জাতান ইব্রাহিমোভিচ।) রিয়াল বার্সার দুই দলের হয়েই খেলেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে বেশ ভালো ড্রিবলার ছিলেন। পরে ইনজুরির জন্য সেটা কমে গিয়েছিল।

রোনালদোর সম্পর্কে বুফনের একটা কথা বলে ছোট লেখাটা শেষ করছি,  ‘রোনালদো আমার প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের মাঝে সব চেয়ে সেরা। ইনজুরি না থাকলে পেলে ম্যারাডোনাকেও ছাড়িয়ে যেত’।

সেটা আর হয়ে উঠেনি। বর্তমানে কেউই বলে না যে পেলে ম্যারাডোনার চেয়ে লিমা সেরা। তবে যখনই কেউ সর্বকালের সেরা একাদশ করতে গিয়েছে তখনই নাম্বার নাইনের জায়গাটা আগে থেকেই তার জন্য বরাদ্দ থাকে থাকে। কারণ সবাই জানে যে সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার আসলে লিমাই – রোনালদো লুইস নাজারিও ডি লিমা।

উপাধিটা শুধু মাত্র ‘সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার’ না হয়ে ‘সর্বকালের সেরা ফুটবলার’ হতে পারতো। কিন্তু তাতে বাধা সেধেছে ইনজুরি।

দূর্ভাগ্য কি শুধু লিমারই, এই প্রজন্মের দর্শকদেরও কি নয়?

৬.

শুরুর বিষয়ে আবার ফিরে যাই।


Phenomenon শব্দটার আক্ষরিক অর্থই হচ্ছে অসাধারণ দৃশ্য কিংবা ঘটনা। সেরা ফর্মের লিমাকে মাঠে দেখা আসলেই অসাধারণ দৃশ্য ছিল। হয়তো এতটাই অসাধারণ ছিল যে এই কারণেই ফুটবল বিশ্বে Phenomenon শব্দটা আর কোন খেলোয়াড়ের জন্য ব্যবহার করা হয় নি।

আজ লিমার জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।