সমস্যা আসলে কোথায়?

বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, মুশফিকেরই সমস্যা কেন? সাকিবের তো সমস্যা হয় না, মাশরাফির তো কোনো ঝামেলা হয় না। সব সমস্যা মুশফিকেরই কেন? যদিও পরে বেমালুম চেপে গেছেন ব্যাপারটা।

এখন স্মৃতিশক্তির স্বল্পতায় আমরা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছি, বছর ছয়েক আগে, বিসিবি সাকিবের সাথে কি আচরণ করেছিল। তখন ‘সাকিবের সমস্যা’ বলে, নিপাট ভদ্রলোক মুশফিকেই সমাধান পেয়েছিল ক্রিকেট বোর্ড। এখন দেখা যাচ্ছে সেখানেও সমস্যা?

সমস্যা আসলে কোথায়? ক্রিকেট বোর্ডে? নাকি ক্যাপ্টেনে? নাকি বিসিবি প্রেসিডেন্টের? নাকি টিম ম্যানেজমেন্টের?

সে যাই হোক, ক্যাপ্টেন নিয়ে কয়েকটা ব্যাপার আলোচনা করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমাদের বোর্ডের অধিনায়ক নিয়ে কোনো সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনা আছে কি না, বা কখনো ছিল কি না, সেসব আলোচনা অবান্তর। কারণ, আমরা সবাই জানি, ক্রিকেট বোর্ড ‘ক্রিকেট’ বাদ দিয়ে আর সব চিন্তা করতে পারেন, কেবল ‘ক্রিকেট’ নিয়ে কোনো চিন্তা করতে পারেন না। তাদের চিন্তাশক্তির প্রখরতা অন্য কাজের জন্য জমা করছেন হয়তো।

সবকিছুতে ব্যতিক্রমের মতো, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন সিলেকশনেরও নিজস্ব দুটো ধারা ছিল। যেমন, অস্ট্রেলিয়া একাদশ নির্বাচন করে, সেখান থেকে অধিনায়ক নির্বাচন করত। আর অন্যদিকে ইংল্যান্ড একজন অধিনায়ক নির্বাচন করে, আর দশজন ক্রিকেটার নিয়ে দল সাজাত। সেজন্য মাইক ব্রিয়ারলির মতো একজন সাদামাটা ব্যাটসম্যানও ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন্সি করেছে।

অন্য দলগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ডও অস্ট্রেলীয় ধারাই ফলো করত বলে মনে হয়। এসব তো আসলে কোনো দল বলে দেয় না, নীতি পর্যবেক্ষণ করলে হয়তো কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। যেমন ভারতের আগের অধিনায়ক সিলেকশনের ব্যাপার লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ওরা ইংলিশ নীতি মেনে চলত। এখন আবার অজি নীতিতে হাঁটছে।

অস্ট্রেলিয়া ‘একাদশ’ থেকে অধিনায়ক নির্বাচন করে বিধায়, ওরা চেষ্টা করে একাদশেই একজন অধিনায়ক তৈরী করে নিতে। সাম্প্রতিক অতীত রেকর্ডই দেখুন না, টেইলরের নেতৃত্বে স্টীভকে গড়ে তোলা, তারপর পন্টিং-ওয়ার্ন, তারপর ক্লার্ক… এভাবে আর কি! আমাদের উপমহাদেশে ক্যাপ্টেন গড়ে তোলা কালচার না থাকায়, ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বের ধর্ণা নিতে হয়েছে প্রায়ই। আর যখনই তেমন ব্যক্তিত্বের অভাব ঘটেছে, তখন সমস্যায় পড়তে হয়েছে দলগুলোকে। আজহারউদ্দীনের অধিনায়কত্ব তো নাকি ‘মিঁয়া, ক্যাপ্টেন বনোগে?’ প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলে শুরু হয়েছিল।

আবার ইংল্যান্ডও এখন অনেকটা অস্ট্রেলীয় নীতিতে হাঁটছে। স্ট্রাউসের আমলে এন্ডারসন-কুক থেকে কুককে তৈরী করা হয়েছিল, তারপর তো রুটকে তাঁরা পেয়ে গেল। মাঝখানে ওয়ানডে অধিনায়কত্বটা ‘ইয়ান মরগান’ পেয়েছেন, ওই অধিনায়ক একজন আগে ঠিক করো নীতিতেই।

পাকিস্তানও চেষ্টা করছে, এগারোজনের একজন থেকে অধিনায়ক বেছে নেওয়া নীতি অনুসরণ করার। মিসবাহর অধিনায়কত্বেই সরফরাজ-আজহারকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরী করা হচ্ছিল। সেখানে আজহার ব্যর্থ, সরফরাজ সফল। তো সরফরাজই এলেন। অথচ এই পাকিস্তানই ‘আগে একজন অধিনায়ক, পরে বাকী দশজন’ নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে শহীদ আফ্রিদীর মতো খামখেয়ালী একজনকে প্রায় চার বছর পর টেস্টে অধিনায়কত্ব দিয়ে ফিরিয়েছিল। আজহারকেও অবশ্য তাঁরা ওয়ানডে অধিনায়কত্ব দিয়ে ফিরিয়েছিল।

নিউজিল্যান্ড সম্ভবত সবচেয়ে ভালোভাবে এই থিওরী মেনে চলে। ফ্লেমিংয়ের গাঢ় ছায়ার ভেট্টরীকে গড়ে তুলেছিল তাঁরা, তারপর ম্যাককালাম-টেলর, সেখান থেকে উইলিয়ামসন। একটা লক্ষ্য ঠিক রেখে, একজনকে ঘিরে ওদের পরিকল্পনা ছিলই।

 

শ্রীলংকাও ‘অধিনায়ক তৈরী করো’ নীতি নিলেও, এখন সংকটে পড়ে গেছে। কারণ, ম্যাথুসের ইঞ্জুরী! একই ব্যাপার ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেও। দক্ষিন আফ্রিকা আবার ক্যারিশম্যাটিক ক্যারেকটার বা আগেই একজন দলনায়ক নির্বাচনটাকেই অগ্রাধিকার দেয়।

দুটো ধারাতেই সমস্যা দেখা যায়। আবার উপকারও পাওয়া যায়। যেমন, অস্ট্রেলীয় ধারার কথাই যদি বলি, ১১ জন থেকে একজন অধিনায়ক নির্বাচন করছে ওরা। ঐ নীতির জন্য অধিনায়ক তৈরীর দিকেও বেশ মনোযোগী তাঁরা। এবং সেটা একজন নয়, কয়েকজনকে নিয়েই ওরা এগোয়, শেষপর্যন্ত যাকে নিয়ে কাজ করা যায়! যেমন পন্টিং আর ওয়ার্ন দু’জনকেই গড়ে তোলা হচ্ছিল, ফলে ওয়ার্নি ঝামেলায় পড়ে গেলেও, অস্ট্রেলিয়া ঝামেলায় পড়েনি। পন্টিং ছিল তাদের।

পরে ক্লার্ক, ওয়াটসন নিয়েও একই কাজ হয়েছিল। ওয়াটসন সেভাবে সার্ভিস দিতে না পারলেও ক্লার্কি ঠিকই সামলে নেন। কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে, ক্লার্কিও ইনজুরির কাছে হার মানলে। ওদিকে ক্যামেরন হোয়াইটকেও নেতৃত্বের জন্য গড়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। তাই চিরায়ত রীতি ভেঙ্গে আগে অধিনায়ক সিলেকশনের পথেও হাঁটে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড। কারণ, একজন অধিনায়ক নেই। তাই বুড়ো বেইলীকেও ফেরানো হয় অধিনায়ক করে।

তো এই ধারার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সেটাই, কোনো কারণে যদি সিস্টেম ঠিক না থাকে বা স্বাভাবিক গতিতে চলতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেখানে একটা শূণ্যস্থান সৃষ্টি হতে বাধ্য। যেটা অজি ক্রিকেটে হয়েছে, শ্রীলংকা ক্রিকেটে হয়েছে।

আবার সবসময় আপনি, ইমরান খান বা মাইক ব্রিয়ারলির মতো ক্রিকেট ক্যাপ্টেন পাবেন না। নেতৃত্বের মতো যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া সহজ না, তো সেক্ষেত্রেও নেতৃত্বে একটা ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হতে পারে। বর্ন লিডারদের জন্য এই ধারায় বেশ সুবিধা থাকে, যেটা অজি সিস্টেমে থাকে না। যেমন শেন ওয়ার্নকে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের অব্যবহৃত সেরা মস্তিষ্ক। অথচ ইংল্যান্ড বা পাকিস্তান হলে কিন্তু ওয়ার্নি ঠিকই ব্যবহৃত হয়ে যেতেন, যেটা অস্ট্রেলিয়ার সিস্টেমের জন্য হননি।

এখন আসি আমাদের ক্যাপ্টেন সিলেকশন প্রক্রিয়ায়। আমাদের এখানে অধিনায়ক নিয়ে খুব একটা ভাবনা চলে বলে মনে হয় না। অনেকটা ইংলিশ ধারা মেনে চলে মনে হতে পারে, যদিও আমার ধারণা সেটাও আসলে ঠিক মতো মানা হয় না। আমাদের ছোটবেলায় তো যেভাবে ক্যাপ্টেন্সির আর্মব্যান্ড দেয়া হচ্ছিল, তাতে আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে বাংলাদেশের ১১ জনের ১০ জনই সাবেক ক্যাপ্টেন বনে যান!

হাবিবুল বাশার সেই ধারায় ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ান। তো বাশারের আমলে একটু অজি ধারায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। নাফিসকে তৈরী করা হচ্ছিল ভবিষ্যত অধিনায়ক হিসেবে। কিন্তু নাফিস অফ ফর্মে গেলে, দৃশ্যপটে আসেন আশরাফুল। তিনিও জোড়াতালি কোনোমতে কাজ চালানোর পর, ‘আর কেউ নাই’ বিবেচনায় চলে আসেন মাশরাফি। তিনি ইঞ্জুরিতে পড়লে, দৈবভাবে সাকিবের উপর দায়িত্ব এসে পড়ে।

সাকিব অল্প বয়স্ক ছিলেন। তাঁকে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব দিয়ে, দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনারও সুযোগ ছিল ক্রিকেট বোর্ডের। কিন্তু সেই ধারা উনাদের ভালো লাগল না। সাকিব গেলেন। তো আর কে হতে পারেন? এই ক্ষেত্রেও অনেকটা ‘একজনকে দিয়ে দায়মুক্ত হই’ টাইপ করে মুশফিকের কাঁধে ভার দিয়ে দিল বোর্ড। সেটার বিনিময়ে মুশফিককে আজ বোর্ডের ও সমর্থক, উভয়পক্ষেরই সমালোচনার দায় সামলাতে হচ্ছে।

আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতো, অনেকটা দৈবভাবে আমাদের ক্রিকেট পেয়ে গেছে একটা সোনালী প্রজন্ম। ‘যা গেছে তা তো গেছেই, এবার নতুন করে শুরু করা যাক’ বলে চাইলে এখনও শুরু করা যায়। কারণ, আমাদের আছে- মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিম, মাহমুদউল্লাহর মতো পঞ্চপান্ডব। যাদের উপর সমর্থক থেকে বোর্ড, সবাই এখনও চোখ বন্ধ করে আস্থা রাখতে পারেন। রাখা যায়। ভবিষ্যতের জন্য এই পঞ্চ রত্নের অধীনে একটা দারুণ প্রজন্ম চাইলে গড়ে তোলার কাজ শুরু করা যায়। একজন ক্যাপ্টেন তৈরীর প্রক্রিয়াও হাতে নেয়া যায়। মাশরাফি-সাকিবদের হাত থেকে ব্যাটন বুঝে নিতে আছেন, মোসাদ্দেক-মিরাজ, শান্ত-সৌম্যদের মতো তরুণেরা। সম্ভাবনাময়ী কিছু প্লেয়ারও আছে, যাদের হাতে নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করা যায়। কিন্তু সেসবের জন্য তো তাঁকে তৈরী করতে হবে।

মিরাজ ছেলেটা বয়স ভিত্তিক দলে দারুণ দেখিয়েছে। শান্তও অসাধারণ। হয়তো অনেকে দ্বিমত করবেন, তবে আমার কাছে মিরাজের চেয়েও শান্তকে বেশী সম্ভাবনাময়ী মনে হয়েছে। ক্যাপ্টেন্সির ব্যাপারটাও যেন ওর মধ্যে ইনবিল্ড আছে। মোসাদ্দেককে নিয়েও কাজ করা যায়। আনামুলদের মতো কেউ কেউ আছেন। কিন্তু তাদের নিয়ে কাজ হচ্ছে কোথায়? কেউ আবার শান্ত’র এইচপি টিমের ক্যাপ্টেন্সির কথা বলবেন না যেন! তেমনতর নেতৃত্ব দেয়া হয়েছিল মিথুন আলীকেও। এসব একজনকে করতে হয় বলে করা। পরিকল্পনার কোনো ছাপ নেই।

এভাবে চলতে থাকলে, সম্ভাবনার অপমৃত্যু ছাড়া আসলে আর কিছু হবে বলে মনে হয় না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।