সব্যসাচী, দু:সাহসী এবং নাটকীয় এক জীবন, মৃত্যুও!

ভদ্রলোকের নাম জনি ডগলাস। পুরো নাম John William Henry Tyler Douglas… J W H T —নামের প্রথম অক্ষরগুলো দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান দর্শকেরা নাম দিয়ে দিল ‘Johnny Wont Hit Today’ ডগলাস!

চিরশত্রুদের দেয়া নাম হলেও ইংলিশরাও সেটি লুফে নিল। একশ বছর আগের সেই সময়েও বেমানান রকম ঘুমপাড়ানি ব্যাটিং করতেন জনি , এর চেয়ে জুতসই নাম আর কী হতে পারে!

তবে স্রেফ এই নাম দিয়েই জনি ডগলাসকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। নিজ কাউন্টি এসেক্সে ছিলেন তিনি নায়ক। পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যথেষ্ট সমৃদ্ধ রেকর্ড। ২৪,৫৩১ রানের পাশাপাশি উইকেট নিয়েছেন ১৮৯৩টি। মৌসুমে ১০০ উইকেট ও ১ হাজার রানের ডাবল অর্জন করেছেন পাঁচবার! ৩৬৫ ক্যাচও আলাদা করে বলার মতো।

টেস্ট রেকর্ড অবশ্য গড়পড়তা। ২৩ টেস্ট ১ সেঞ্চুরিতে ৯৬২ রান, ৪৫ উইকেট। ক্যারিয়ার বিবর্ণ হলেও ছিল কিছু আলোর ঝিলিক। ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পেলহাম ওয়ার্নারের অসুস্থতার কারণে নেতৃত্ব দিয়েই ডগলাসের টেস্ট অভিষেক। প্রথম সিরিজেই দলকে ৪-১-এ জয়ে নেতৃত্ব দিয়ে অ্যাশেজ ফিরিয়ে এনেছিলেন ইংল্যান্ডে।

তার ক্রিকেট নিয়ে বলা যায় আরও অনেক কিছু। তবে অনেকেরই নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, ক্রিকেটারের আলোচনায় বক্সারের ছবি কেন? ছবিটাও এই ক্রিকেটারেরই। ডগলাস যে বিশেষ একজন, সেটি ফুটিয়ে তুলছে এই ছবি।

 

ক্রিকেটারের ফিটনেস প্রবল গুরুত্ব পাওয়ার যুগ যুগ আগেও তিনি ছিলেন দারুণ ফিট। সেই সময়ের সবচেয়ে ফিট ক্রিকেটার বলা হত তাকে। ছিলেন সুঠামদেহী। ছিল বক্সারদের মতো পেটা শরীর। বক্সারদের মতো, কারণ তিনি তো ছিলেন বক্সারই!

শখ করে দু-একদিন রিংয়ে নেমে পড়া বক্সার নন, অলিম্পিক সোনা জয়ী বক্সার! ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে সোনা জিতেছিলেন মিডলওয়েটে। সেখানেও ফাইনালে হারিয়েছিলেন এক অস্ট্রেলিয়ানকে!

অলিম্পিক সোনা জয়ের পথে তার তিনটি বাউটই আলাদা জায়গা নিয়ে আছে বক্সিং ইতিহাসে। তিনটি ছিল একই দিনে। দা টাইমস লিখেছিল, ‘one of the most brilliant exhibitions of skillful boxing, allied to tremendous hitting, ever seen.’

বক্সিং ছিল তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বাবা ছিলেন বক্সিং রেফারি। ছিলেন অ্যামেচার বক্সিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টও। ডগলাসের ছোট ভাইও ছিলেন বক্সিং রেফারি।

অলিম্পিক ফাইনালে ডগলাসের কাছে হেরে যাওয়া স্লোয়ি বেকার ১৯৫২ সালে এক ইন্টারভিউতে অদ্ভূত দাবী করে বসেন। ডগলাসকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন নাকি তার রেফারি বাবা! ফাইনালটি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছিল। হার-জিত নির্ধারণ করাই ছিল কঠিন। কাজেই বেকারের দাবী বিশ্বাস করার লোকের অভাব ছিল না।

তবে প্রতক্ষ্যদর্শী ও অন্যান্য প্রমাণে পরে দেখা গেছে, ডগলাসের বাবা সেদিন রেফারি ছিলেন না। তবে তিনি রিংয়ের পাশেই ছিলেন, অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হিসেবে বিজয়ীদের পদক তুলে দেবেন বলে। রেফারি ছিলেন ইউজিন কোরি নামের একজন। তবে দুজন বিচারকের মতেই একটু এগিয়ে থেকে জয়ী হয়েছিলেন ডগলাস। রেফারিকে তাই কাস্টিং ভোটও দিতে হয়নি।

ডগলাস খেলতেন ফুটবলও। ইংল্যান্ড অ্যামেচার দলের হয়ে খেলেছেন আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তাঁর মৃত্যুটাও ছিল জীবনের মতো নাটকীয়, সেখানেও জুড়ে আছেন বাবা।

বাবার সঙ্গে জাহাজে করে ফিনল্যান্ডে গিয়েছিলেন ব্যবসার জন্য কাঠ কিনতে। ডেনমার্কে ঘন কুশায়ায় তাদের জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে আরেক জাহাজের। শোনা যায়, দুই জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন দুই ভাই। দুজন ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়েই বিপত্তি। মাত্র ৪৮ বছর বয়সেই ডুবে মারা যান ডগলাস। প্রতক্ষ্যদর্শীরা পরে জানিয়েছিলেন, বাবাকে বাঁচাতে গিয়েই ডুবে যান ডগলাস।

দিনটি ছিল ১৯৩০ সালে ১৯ ডিসেম্বর। বক্সিং রিংয়ে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল সাহস। সাহসিকতার স্রোতেই বিলিয়ে দিয়েছিলেন জীবন।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।