সবে তো শুরু, যেতে হবে বহুদূর

২০০৭ সালের নভেম্বর, মুক্তি পায় সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা ‘সাওয়ারিয়া’। এই ছবির মধ্যদিয়ে বলিউডে আবির্ভাব ঘটে সম্পূর্ণ নতুন দুটি মুখের। একই সঙ্গে মুক্তি পায় শাহরুখ-দীপিকার ছবি ‘ওম শান্তি ওম’-ও। বলিউড বাদশার ধোপে বানসালির সিনেমা বক্স অফিসে দাঁড়াতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। আর ঠিক তেমনটাই হয়েছিলো।

কিন্তু ছবিটি সমালোচকদের দৃষ্টি আকষর্ণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে, নবাগত তরুণ নায়কটির অসাধারণ অভিনয় বি-টাউনে বড়সড় সাড়া ফেলে দেয়। এবং এই ছবির কল্যাণে তিনি বাগিয়ে নেন শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতার ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ড। এবার ওই তরুণের নামটি বলা যাক, তিনি—  রণবীর কাপুর। বলিউডের মোস্ট এলিজেবল ব্যাচেলরদের একজন।

‘চকলেট বয়’ খ্যাত এই অভিনেতার জন্মাটা বলা যায় সোনার চামচ মুখে দিয়েই হয়েছে। ভারতীয় মিডিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ‘কাপুর’ বংশে তার জন্ম। বাবা অভিনেতা ঋষি কাপুর ও মা নিতু সিং। বোন ঋদ্ধিমা কাপুর। তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার রাজ কাপুরের পৌত্র এবং পৃথ্বীরাজ কাপুরের প্রপৌত্র। আর, অভিনেতা রণধীর কাপুরের ভ্রাতুষ্পুত্র। কারিশমা কাপুর ও কারিনা কাপুর তার কাজিন। পরিবারের সবাই ফিল্মের লোক। ওদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার পড়ে না। সবাই যার যার জায়গা থেকে স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। সুতরাং বোঝা গেলো অভিনয় ও গ্লামার তার রক্তের সঙ্গেই মিশে আছে।

মুম্বাইয়ের স্কটিশচার্চ স্কুলে শৈশবে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আর দেরী করলেন না, ছবি তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান নিউইয়র্কের ‘স্কুল অব ভিজুয়াল আর্টসে’। সেই সঙ্গে অ্যাক্টিং শিখতে ভর্তি হন ‘লি স্টারসবার্গ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম ইনস্টিটিউটে’। নিউইয়র্কে থাকাকালীন সময়েই ‘প্যাশন টু লাভ’ এবং ‘ইন্ডিয়া ১৯৬৪’ নামের দুটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, একই সাথে অভিনয়ও করেন।

ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সঞ্জয়লীলা বানশালী ছবি ‘ব্ল্যাক’-এ তার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পরবর্তীতে অবশ্য বানশালীর সিনেমার মধ্যদিয়েই বলিউডে তার অভিষেক। প্রথম ছবিটি পুরোপুরি ফ্লপের খাতায় নাম লেখালেও অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা পান তিনি।

এরপর ২০০৮ সালে মুক্তি পায় সিদ্ধার্থ আনন্দের রোম্যান্টিক কমেডি ‘বাঁচনা অ্যায় হাসিনো’। এতে তিনি বিপাশা বসু, মিনিশা লাম্বা ও দীপিকা পাড়ুকোনের সঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স অফিসে হতাশ করেনি। এই ছবির অসাধারণ সাফল্য তার পায়ের নীচের ভীতটা আরো একটু মজবুত করে। এবং সবার কাছে প্রথম সারির অভিনেতা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। যাই হোক, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বলিউডের এই ‘লাভারবয়’ কে। তার ধারাবাহিক সাফল্যের ইতিহাস মোটামুটি সবারই জানা। চলুন তারপরও কিছুটা আলোচনা করা যাক।

২০০৯ সালে তিনি অভিনয় করেন অয়ন মুখোপাধ্যায়ের ‘ওয়েক আপ সিড’। কঙ্কনা সেনশর্মার বিপরীতে এই ছবিটিও বক্স অফিসে ঝলক দেখায়। ছবিতে তিনি বখাটে, আত্মপর, বোহেমিয়ান কলেজ ছাত্রের ভূমিকায় অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। ফিল্ম ক্রিটিকদের দ্বারাও ভালো প্রশংসিত হয়। এই ছবির জন্য রণবীর একাধিক চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ বিভাগে মনোয়ন পান।

একই বছর মুক্তি পায় ‘আজব প্রেম কি গজব কাহানি’ সিনেমাটিও। এই ছবিতে তাকে দেখা যায় ক্যাটরিনা কাইফের বিপরীতে। ছবিটি বক্স অফিসে অসম্ভব হিট করে। এ ছবিটি রণবীরের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ছবিগুলির একটি। এরপর শিমিত আমিনের ড্রামা ‘রকেট সিং: সেলসম্যান অফ দ্য ইয়ার’ ছবিতেও অভিনয় করেন। এটি সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হলেও বক্স অফিসে সাফল্যের খাতা খুলতে ব্যর্থ হয়।

রণবীরের ক্যারিয়ার দুর্বার গতিতে সাফল্যের পথে এগোতে থাকে। পরবর্তী বছর ২০১০ থেকে বি-টাউনের প্রথম সারির নায়িকাদের সঙ্গেও জুটি বাঁধতে শুরু করেন তিনি। ওই বছর মুক্তি পায় প্রকাশ ঝা পরিচালিত মাল্টিস্টারার মুভি ‘রাজনীতি’ ও সিদ্ধান্ত আনন্দ পরিচালিত প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সঙ্গে ‘আনজানা আনজানি’।

২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইমতিয়াজ আলির ‘রকস্টার’ ও পরবর্তী বছরের রোমান্টিক কমেডি ‘বরফি’র কথা বিশেষভাবে বলতেই হয়। ছবি দুটি রণবীরের বায়োগ্রাফিতে এক অন্যন্য সংযোজন। বক্স অফিসেও বাজিমাত করে। ২০১৩ সালে আসে বলিউড ডিভা দীপিকা পাড়ুকোনের সঙ্গে ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’। বক্স অফিসে ব্লকবাস্টার হিট এই ছবিটিও রণবীরের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ছবিগুলির একটি।

এই তো গেলো সাফল্যের কথা। বলিউডের এই হার্টথ্রবের ক্যারিয়ারের দিকে নজর দিলে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুটোই বেশ প্রকটভাবে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, রণবীর কাপুরের ভাগ্য খুবই খারাপ। তাঁর বড় বাজেটের ছবিগুলোই ফ্লপ হয়! প্রথম ছবি ‘সাওয়ারিয়া’ কথা না হয় বাদই দিলাম। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বেশরম’ ছবির বাজেট ছিল ৬০ কোটি রুপি। এ ছবিতে রণবীর কাপুর তাঁর মা-বাবা নিতু কাপুর ও ঋষি কাপুরের সঙ্গে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান। কিন্তু অনেক প্রচার-প্রচারণার পরও দর্শকদের খুশি করতে পারেনি ছবিটি।

বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে অনুরাগ কাশ্যপের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় আছে। সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে আলাদা ডাক-নাম আছে। তারই সিনেমা ‘বোম্বে ভেলভেট’। ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর নির্মিত এ ছবিতে লগ্নি হয়েছিল ১২০ কোটি রুপি। কিন্তু ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, হার্টথ্রব নায়ক-নায়িকা থাকা সত্ত্বেও দর্শকদের হলে টানতে ব্যর্থ হয় ছবিটি। ব্যয়ের অর্ধেক টাকা তুলতেও হিমশিম খায় ‘বোম্বে ভেলভেট’। জ্যাকলিন ফার্নান্দেজের সঙ্গে ‘রয়’ কিংবা  অনুরাগ বসুর ‘জাগ্গা জাসুস’-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ক্রিটিদের দ্বারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও বক্স অফিসে তেমন আলোড়ন তুলতে পারেনি।

যদিও, ‘সাঞ্জু’ দিয়ে আবারও তিনি বড় সাফল্যে ফিরেছেন। সঞ্জয় দত্তর জীবনী অবলম্বনে আসন্ন সিনেমা ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ও ‘শমসেরা’ দিয়ে সাফল্য আরো বাড়ারই কথা।

সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ২৬ টি সিনেমায় ছবিতে অভিনয় করেছেন। ৮-১০ বছরের ক্যারিয়ারে সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই আছে। তবে তার অভিনয় নিয়ে কখনো বেশি উচ্চবাচ্য হয়নি। মাঝে মাঝে কিছু ছবি ফ্লপ গেলেও তার অভিনয় গুণ ব্যাপক হারে প্রশংসিত হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন লুক, হেয়ার স্টাইল, ফিগার কিংবা অসাধারণ এক্সপ্রেশনের কারণে বরাবরই আলোচনায় এসেছেন। তাছাড়া খানদের একচ্ছত্র দাপট ও এক চেঁটিয়ে ব্যবসার এই যুগে সমসাময়িক অনেক অভিনেতাকে ছাড়িয়ে বলিউডে স্বতন্ত্র জায়গা করে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

পর্দায় সাবলীল অভিনয়ের পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও ‘লেডি কিলার লুক’ দিয়ে কতো শতো জনকে যে গায়েল করেছেন, তার হিসেবে নেই। বলিউডের এই হার্টথ্রব ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছরের জীবনে হাফ ডজনেরও বেশি নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে সোনম কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন ও ক্যাটরিনা কাইফের সঙ্গে মন দেয়া-নেয়াটা।

এক সময়ে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত জুটি ছিলো নিঃসন্দেহে রণবীর-দীপিকা। ‘বাঁচনা অ্যায় হাসিনো’-র সেটে কাজ করতে গিয়েই রণবীরের হৃদয়ে জায়গা করে নেন দীপিকা। দুজনকে একসাথে মানাতোও বেশ। কিন্তু ২০০৯-এর শেষের দিকে অজ্ঞাত কারণে তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়।

মাঝে দিয়ে আরো কয়েকজন নারীকে মন দিলেও এখন পর্যন্ত রণবীরের সর্বশেষ বান্ধবী ছিলো ক্যাটরিনা কাইফ। গুঞ্জন আছে, রণবীরের জন্যই নাকি ব্রেক-আপ হয়ে যায় সালমান-ক্যাটরিনা জুটির। ‘আজব প্রেম কি গজব কাহানি’তে কাজ করতে গিয়ে একে অপরকে মন দিয়ে বসেন। কিন্তু এই সম্পর্কটিও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গিয়েও শেষ রক্ষা হলো না। ভেঙে যায় প্রেমের সম্পর্কটি। এখন আরেক নায়িকা আলিয়া ভাটের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছেন।

১৯৮২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এই নায়ক। ক্যারিয়ারের মোটামুটি অনেকগুলো বসন্ত পার করে এসেছেন। রণবীর জানেন, বলিউডে তার অভিষেকটা পুষ্প-সজ্জার মতো হলেও এখানে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়— টিকে থাকার লড়াই। ফেলে আসা ক্যারিয়ারের সময়টুকু কিন্তু বেশি বড় কিছু নয়। সামনে আরো অজস্র সময় পড়ে আছে। নি:সন্দেহে সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইবেন তিনি, হেলায় হারাবেন না কখনোই। ‘ইয়ে তো স্রেফ ট্রেলার হ্যায়’— এই তো সবে শুরু, আরো দূর যেতে হবে। রণবীরের জন্য শুভকামনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।