সবার পরে টেস্ট থেকে অবসর নেবো: সাকিব

সংবাদ মাধ্যমের সামনে সাকিব আল হাসান সাধারণত নিজের ভেতরই গুটিয়ে থাকেন। অথচ, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে দুই টেস্টের জন্য বোর্ডের কাছ থেকে চেয়ে ‘বিশ্রাম’ নেওয়ার পর নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অন্য এক সাকিবেরই দেখা মিললো।

বিরতির কারণ কী?

সব থেকে বড় কারণ হচ্ছে, আমি মনে করি আমার আরও বেশ অনেকদিন খেলা বাকি আছে। এবং আমি যদি ওটা খেলতে চাই এবং ভালো ভাবে খেলতে চাই, তাহলে এই বিশ্রামটা আমার জরুরী। আমি চাইলেই খেলতে পারি। কথা হচ্ছে, আপনারা কি চান যে আমি আরও ৫-৬ বছর খেলি নাকি ১-২ বছর? নির্ভর করছে সেটার ওপর। আমি যেটা অনুভব করি, এভাবে খেলতে থাকলে ১-২ বছরের বেশিখেলতে পারব না। ওভাবে খেলার থেকে না খেলা আমার কাছে ভালো। যতদিন খেলব, ততদিন যেন ভালোভাবে খেলতে পারি। সেটিই লক্ষ্য আমার। সেই কারণেই এই বিরতিটা পেলে আমি আমার তরতাজা হয়ে, মানসিকভাবে..শারীরিক ভাবে যতটা না, তার চেয়ে বেশি মানসিক ভাবে চাঙা হয়ে ফিরলে হয়ত পরের ৫ বছর আমার টেনশন ছাড়া খেলা সম্ভব হবে। যেটা আমি মনে করি বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি-দুটি ম্যাচ বা একটি-দুটি মাস না খেলা থেকে।

দুই টেস্টের বিরতি যথেষ্ট?

দুটি টেস্টের পরও যদি যাই, প্রায় এক মাসের একটি বিরতি হয়ে গেল কিন্তু। এরকম বিরতি আমি গত ৩-৪ বছরে পাইনি। আমার জন্য এটি অনেক বড় বিরতি আমি মনে করি। আমি বিসিবিকে ধন্যবাদ জানাইয যে তারা আমার ব্যপারটি বুঝতে পেরেছেন। যেভাবে আপনাদের মাত্র বললাম, আমি তাদেরকে সেটি বুঝিয়ে বলার পর, তারা বলেছে যে ঠিক আছে, আইডিয়া ভালো আছে। কারণ দিন শেষে আমার শরীর আমি যে কারও চেয়ে ভালো বুঝতে পারব। আমার এটা ম্যানেজ করার দরকার আছে। এই কারণেই এই সিদ্ধান্ত।

বোর্ডকে বোঝানো কতটা কঠিন ছিল?

খুব যে কঠিন ছিল বোর্ডকে বোঝানো, তা নয়। সুবিধা যেটা ছিল যে, আমি যখন কথা বলেছি, যাদের সঙ্গে বলেছি, আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা বলার পর মনে হয়নি যে এটি অনৈতিক (আনএথিক্যাল) কিছু। সে কারণেইতারা হয়ত এটি গ্রহণ করেছে।

৬ মাসের জন্যই আবেদন করেছি। এখন এই সিরিজের পর দুটি টেস্ট ম্যাচ আছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। এখন পর্যন্ত এবারের দুটি টেস্ট অনুমতি দিয়েছে। এরপর যখন খেলা শুরু হয়ে যাবে দক্ষিণ আফ্রিকা, বিপিএল, তার পর ওই সময়টা চিন্তা করব যে ওই দুটি টেস্ট খেলব কী খেলব না। সেভাবে কথা বলব তখন। তার পর যদি তারা মনে করে যে আমার খেলার দরকার বা আমার নিজের যদি মনে হয় যে মানসিক ভাবে এমন অবস্থায় আছি যে পুরোটা দিতে পারব, তখন অবশ্যই খেলব।

শুধু টেস্ট কেন? ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি কেন নয়?

সীমিত ওভারের খেলা ১ ঘন্টার হয় বা ৩ ঘন্টার হয়। টেস্ট ম্যাচ ৫ দিনের হয়, প্রস্তুতি আরও ১০-১৫ দিনের হয়,প্রস্তুতি ম্যাচ ৩ দিনের থাকে। তো একটি টেস্ট সিরিজ থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যায় এক মাসের বিরতি। টি-টোয়েন্টি থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যায় ৩ দিনের বিরতি, ওয়ানডে সিরিজ থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যাবে ৭ দিনের বিরতি। আমার একটু বড় বিরতি দরকার। এই কারণেই টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম।

টি-টোয়েন্টি বেশি প্রাধান্য দেওয়ার সমালোচনা হচ্ছে কোথাও কোথাও। বিষয়টাকে কিভাবে দেখছেন?

(এসবে) প্রতিক্রিয়াই দেখাই না। কারণ আমার শরীর আমি বুঝতে পারব যে কতটা ধকল যাবে। এই যে ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টি কেন বিশ্রাম নিলাম না, বাইরের টি-টোয়্টে কেন নিলাম না, এই প্রশ্নগুলো আসলে একটু অবাকই লাগে। কারণ আমি যখন বাইরের টি-টোয়েন্টি খেলি, তখন না কোনো চাপ আছে, না কোনো ভাবনা আছে। আমার কছে মনে হয় হলিডে ধরণের। সাথে একটা অভিজ্ঞতাও হয়। অর্থনৈতিক দিক অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও থাকে। টেস্ট ম্যাচে আমার যেটা হয় যে যেহেতু আমি ব্যাটিং-বোলিং দুটিই করি, চারটা ইনিংসেই আমার অবদান রাখার দরকার হয়। দলও আশা করে। যদি আমি অর্ধেক অবদন রাখতে পারলাম,অর্ধেক পারলাম না, তাহলে দল যেটা আশা করেসেটা তো পুটো দিতে পারলাম না। পুরোটা না দিতে পারা আমার মনে হয় না ভালো দিক। আমিযখন চারটা ইনিংসেই ভালো করতে পারব, এবং আমার মনে হবে সেই সামর্থ্য আমার আছে বা সেই ইচ্ছাটাও থাকবে,আমার মনে হয়, তখনই খেলার সেরা সময়। আমিতো চাইলেই খেলতে পারি। ম্যাচ ফি পাব, পারিশ্রমিক পাব। সবই পাব। কিন্তু ওভাবে খেলাটা আমার মনে হয় না খুব একটা গুরুত্ব বহন করে আমার কাছে। ঠিক আছে, এটা আমার চাকরী। কিন্তু দিন শেষে এখানে আমার আগ্রহ, আমার প্যাশন, ভালোবাসা থেকেই খেলাটা শুরু করা। ওইটা যদি না থাকে, ওই খেলাটার মানে আছে বলে মনে করি না।

কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত?

বেশ কিছুদিন ধরেই মনে হচ্ছে। এটা আমি আগে আলোচনাও করেছি। এমনকি এই টেস্ট সিরিজের আগে কথা বলে রেখেছি। আমার পরিবারের সঙ্গে… পরিবার বলতে স্ত্রীর সঙ্গে এবং আমার কাছের যারা আছে, সবাই জানত যে আমি এরকম চিন্তা করছি। আমি মনে করি এটা আমার জন্য উপকারী হবে। যেহেতু অনেক বেশি খেলা হয়, আমার ফিটনেসটাও(ট্রেনিং) ওভাবে করা হয় না বা করা হলেও মানসিকভাবে চাঙা থাকার যে ব্যাপারটি আছে,সেটি হয় না। এমন তো নয় যে দু-একদিন খেলেই ছেড়ে দিচ্ছি। ১০-১১ বছর হয়ে গেল, একটি বিরতি তো নিতেই পারি। এটা আমার প্রাপ্য।

টেস্টে ফিরবেন তো ভবিষ্যতে?

এমন তো নয় যে আমি আর ক্রিকেটই খেলছি না! অবশ্যই খেলব। কেন খেলব না! আমার ইচ্ছে আছে, সবার পরে টেস্ট থেকে অবসর নেব। তার আগে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে থেকে অবসর নেব। সবার শেষে টেস্ট থেকে। কিন্তু আমার মনের কথা সবসময় সবাইকে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। আমার ভেতরে কি আছে, আমি জানি। এবং লোকে যেমন সচেতন, আমিও সচেতন যে কী করলে ভালো হয়, কী করা যায়। আমি ওভাবেই চেষ্টা করব। গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে যে, আমার কাছে মনে হয়, স্রেফ খেলার জন্য ২-১ বছর খেলার থেকে ৫ বছর মন দিয়ে খেলা বেশি জরুরী।

শ্রীলঙ্কা সফরে টেস্ট খেলবেন?

বললাম তো যে ওটা এখনও ঠিক করিনি। আপাতত ছুটি এই দুই টেস্টের জন্য আছে। তো এতটুক নিয়েই খুশি আছি। তখন যদি মনে হয় যে খেলতে পারব,তাহলে খেলব।

বিরতিটা কী কাজে লাগবে আদৌ?

কাজে লাগাব কিভাবে… জানি না। পরিবারের সঙ্গে সময়…ঘুরতে যাওয়া..। পরিবার-বন্ধুদের সঙ্ড়ে আড্ডা দেওয়া। মাঝেমধ্যে ক্রিকেট থেকে বাইরে থাকা খুবই জরুরী। চেস্টা থাকবে যত বেশি বাইরে থাকতে পারি। যেহেতু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি আছে, সেটির প্রস্তুতিও শুরু করব। কিন্তু কয়েক দিন পর।

দল কতটা মিস করবে?

আমার থাকা না থাকায় খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারণ দুনিয়াতে কোনো জিনিসই কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আমি আশা করি এবং মন থেকে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ধারাটা অব্যাহত থাকবে। যে যাবে ,সে ভালো করবে। দক্ষিণ আফ্রিকা সবার জন্য চ্যালেঞ্জিং। সবার ভেতর বাড়তি চেষ্টাও থাকবে ভালো করার।

বিরতিটা দক্ষিণ আফ্রিকার পরে নেওয়া যেত কী? বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা সিরিজ…

পরে নিলেও হতো, এমন যদি মনে হতো আমার কাছে, তাহলে পরেই নিতাম। আমার কাছে মনে হলো, এখনই বিশ্রামের উপযুক্ত সময়। এ কারণেই নেওয়া। সবার মনের সঙ্গে সবার মিল থাকবে না, মতের সঙ্গে মতের মিল হবে না এটাই স্বাভাবিক। দিন শেষে আপনি আমার অবস্থানে থাকলে হয়ত আমার অবস্থানটা বুঝতে পারতেন। কিংবা আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সে বুঝতে পারত। যার যার অবস্থানটা কিন্তু সেই ভালো বুঝতে পারে। অন্য কারো পক্ষে এতটা বোঝা সম্ভব না। অনেকের অনেক মন্তব্য তাই থাকবে। অনেক মত থাকবে। সেগুলো তাদের মত,তাদের চিন্তা ভাবনা। আমার কাছে আমার মত থাকবে। আর যেহেতু আমরা সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার কাছে মনে হয় অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত। এবং এটা অবশ্যই ভালো কিছু ফল দেবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের সম্ভাব্য ফলাফল

ফল বলা কঠিন। প্রেডিকশন করাও কঠিন ব্যাপার। টেস্ট সিরিজ অবশ্যই কঠিন হবে। ওয়ানডেতে আমাদের খুব ভালো সম্ভাবনা আছে। টি-টোয়েন্টি বলাটা কঠিন। কারণ ওরকম কন্ডিশনে আমরা ৬-৭ বছরের বেশি সময় খেলিনি। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। ওয়ানডের তুলনায় টি-টোয়েন্ট ও টেস্ট বেশি কঠিন হবে।

বেশি চাপ হবে কী বাংলাদেশের জন্য?

এটা বলা মুশকিল। এমন নয় যে আমি বোলিং করতে পছন্দ করি না। অনেক বোলিং করতে পছন্দ করি। চেষ্টা তো থাকে যে সবার আগে ব্যাটিংয়ে নেমে সবার শেষ পর্যন্ত থাকি। মাঠেও থাকার চেষ্টা করি সবসময়। যখন মাঠে থাকি, শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করি। যখন মনে হয় যে আমি হয়ত শতভাগ দিতে পারব না পুরোটা সময়, তখনই বিরতির কথা মাথায় আসে। ওখান থেকেই এই ভাবনাটা শুরু।

অবসাদ কতটা জাস্টিফায়েড হল?

লোকে সমালোচনা করবে, সেটা তো স্বাভাবিক। দুনিয়াতে কোনো কিছুই এমন নয় যে কেউ বলল আর সবাই সেটার সঙ্গে একমত হলো। সেটা কখনোই হয় না। স্বাভাবিক ভাবেই আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত হবে না। তবে যেটা বললাম, আমার দিক থেকে আমি বলেছি। এগুলো নিয়ে খুব বেশি মন্তব্য করার কিছু নেই।

যদি কখনও কারও মনে হয় যে আমার আসলে খেলা বেশি হয়ে যাচ্ছে বা বেশি খেলেছি, একটি বিরতি দরকার, আমি মনে করি তাদের অবশ্যই মন থেকে বলা উচিত। এটা করে তাদের ক্যারিয়ার আরও ভালোই হতে পারে। আমি ধরেন, এখন ইচ্ছে হচ্ছে না, তবু জোর করে খেললাম, আপনারই বলবে আমাকে বাদ দেওয়া হোক। স্বাভাবিক না? কি দরকার আছে ওটার? যতদিন খেলব, চেষ্টা থাকবে ভালো ভাবে খেলার।

সাবেকদের মন্তব্যকে কিভাবে নিচ্ছেন?

আপাতত এ বিষয়ে আমার ভাবনা নেই। তাদের ভাবনা তাদের কাছে থাক, তারা যেটা মনে করল…বললাম না যে, লোকের ধারণা একেকরকম হবেই। সেসব নিয়ে আ চললে আমার জন্য লাভজনক বা ভালো কিছু হবে না। আমার চিন্তাটা আমিই করি। আমার চিন্তা আমি করলেই সব থেকে ভালো হয়। আমি যেন ভালোভাবে চিন্তা করতে পারি, এই সাপোর্ট আপনারা করবেন।

নিজে থেকে ব্রেক নেওয়া কী নেতিবাচক হল?

বিরতিটা নেওয়ার এটাই বড় কারণ যে আমার যেন ওই অনুভূতি থাকে যে আমি খেলব, ভালো করব কিংবা খেলার প্রতি ভালোবাসা থাকলে বাড়তি কিছু করার আগ্রহ থাকে। ওই আগ্রহটা যেন পাই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।