সবার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি: আশীফ এন্তাজ রবি

আশীফ এন্তাজ রবি একাধারে একজন লেখক এবং সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি একটি ফেলোশিপ নিয়ে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। লেখালেখির জগতে তার অনুপ্রবেশ ঘটে সেই কলেজ জীবনে। আর কলেজে থাকাকালীন অবস্থাতেই তার প্রথম উপন্যাস ‘জলসিঁড়ি’ প্রকাশিত হয়। তবে পাঠকদের জনপ্রিয়তা পান তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত ‘কাগজের নৌকো’ উপন্যাসটি দিয়ে। এরপর দীর্ঘ চার বছর পর্যন্ত কোনো উপন্যাস লিখেন নি এই লেখক।

তবে এবারের বইমেলায় থাকছে তার নতুন উপন্যাস ‘চন্দ্রমুখী’। ‘চন্দ্রমুখী’ উপন্যাসটিকে নিয়েই লেখক আশীফ এন্তাজ রবি মুখোমুখি হয়েছেন অলিগলি.কমের।

কেমন আছেন? 

– এটা তো অনেক কঠিন প্রশ্ন রে ভাই।  আমি যে কেমন আছি, এটা আমি নিজেও জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় খুব ভালো আছি। কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দুখী মানুষ আমি।  আসলে আমি আছি এক দ্বিধার জগতে। যে জগতে ভালো মন্দ বলে কিছু নেই।

দীর্ঘ চার বছর পর এবারের বইমেলায় আদর্শ প্রকাশনী থেকে আপনার নতুন উপন্যাস ‘চন্দ্রমুখী বেরুচ্ছে। ‘চন্দ্রমুখী’কে পরিপূর্ণ রুপ দিতেই কি আপনি চারটি বছর সময় নিয়েছেন?

–  না। দীর্ঘদিন ধরে আমি আসলে লিখতে পারছিলাম না। কাগজের নৌকা বের হবার পর, আমি ষাট দশকের ঢাকার উপর একটা ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস লেখা শুরু করি।  খুব পরিশ্রমের কাজ ছিলো সেটা। অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছে।  সেই উপন্যাসটার অনেকখানি লেখাও হয়ে গেছে।  কিন্তু এরপর আমার কি যেন হয়, লেখাটা বন্ধ করে দিই। তারপর দীর্ঘদিন ৩ বছর আমি একটি লাইনও লিখি নি।

উপন্যাস লেখা শুরু করে, মাঝপথে সেটি বন্ধ করে দেয়ার অভ্যাসটা আমার পুরনো। ২০১৩ সালে কাগজের নৌকা লেখার ক্ষেত্রে আমি এই কাণ্ড করেছিলাম। তখন পোলাপান ফেসবুকে একটা পেইজ খুলেছিলো। পেইজটার নাম, রবি ভাই, উপন্যাসটা শেষ করেন।

লেখক হিসেবে আমি খুবই ভাগ্যবান। এমন ভাগ্য নিয়ে খুব কম লেখক এই বঙ্গে জন্মেছেন। সাধারণ মানুষ আমাকে যেভাবে মনোযোগ আর ভালোবাসা দিয়েছেন, এটা দুর্লভ। আমি সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে পারিনি। গত ৪ বছরে একটা লাইনও লিখি নি।

এর বদলে রেডিও-তে গল্প শোনাতাম। লাখ লাখ মানুষ রাত দুইটা অবধি জেগে- সেই গল্প শুনতো। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে দুম করে আমেরিকায় চলে এসেছি।

এই অপরাধের ক্ষমা নেই- আমি জানি। তবুও সবার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। এই ক্ষমা চাওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে, চন্দ্রমুখী লেখা। এরপর আমি প্রতিটি মানুষের কাছে যাবো এবং তাদের পায়ের ধুলো নেবো। আমি মনে করি, সেই ধুলায় আমার হাত পবিত্র হবে।

ভালোবাসা উপেক্ষা করার মতো বড় পাপ -পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এই পাপ কাটানোর জন্য এখন থেকে বেশি করে গল্প বলবো। আমি কড়ায় গন্ডায় গল্পের ঋণ শোধ করবো। আমার জীবনের লক্ষ্য এখন এটাই।

চন্দ্রমুখী অন্য গল্প। হঠাৎ করে লেখা শুরু করেছি। তারপর পাগলের মতো একটানা  লিখে গেছি।  এত কষ্টের গল্প আমি কোনোদিন লিখি নাই।  কখনো লিখতে পারবো বলেও মনে হয় না।

আমার ধারণা, চন্দ্রমুখী উপন্যাসটা আমাকে বেশ বিপদে ফেলবে। এটা প্রেম এবং যুদ্ধের কাহিনী। দুটোই জটিল বিষয়। জানি না পাঠক এটাকে কীভাবে নেবে।

চন্দ্রমুখী উপন্যাসে একটা লাইন আছে: বাংলাদেশ হচ্ছে অর্ধেক ইতিহাসের দেশ।  ইতিহাসের যে অংশটা অপ্রয়োজনীয়, সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়। বাদ পড়ে যায় আসল অংশ।

আমি সেই আসল অংশ বলার চেষ্টা করেছি। কাজটা ঠিক হলো কিনা জানি না।  বেশ ভয়ে আছি।

আপনার উপন্যাসগুলোর গল্পরা যেমন পাঠকদের মনে এক ধরণের ভালো লাগা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তেমনি উপন্যাসের নামগুলোও অনন্য। ‘চন্দ্রমুখী’ নামটির রহস্যটি যদি বলতেন।

–  কোনো রহস্য নেই। চন্দ্রমুখী একটা মোটামুটি ঐতিহাসিক চরিত্র। শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাসে দুইটি নারী চরিত্র আছে। একটি পার্বতী এবং অন্যটি চন্দ্রমুখী।

কেন জানি, পার্বতী চরিত্র আমাকে তেমন টানেনি।  আমাকে মোহিত করেছে চন্দ্রমুখী।  এই উপন্যাসটার মুনা চরিত্রের সাথে চন্দ্রমুখীর অনেক মিল আছে।  চন্দ্রমুখীর মতোই সে ত্যাগী, নিষ্ঠাবান এবং হেরে যাওয়া এক নারী।  এই কারণেই এমন নাম দিয়েছি।

উপন্যাসে গল্প বলার পাশাপাশি গল্পকে একটু হিউমারাস করে তোলবারও প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় আপনার লেখায়। ‘চন্দ্রমুখীতেও কি এমনটি লক্ষ্য করা যাবে?

– হ্যাঁ। জোকারি করা আমার একটা বদভ্যাস। ঠাট্টা তামাশা করতে গিয়ে জীবনে বহুবার বিপদে পড়েছি। অপমানিতও হয়েছি অনেকবার । শুধুমাত্র হাসিঠাট্টার কারণে আমার বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটেছে, কাছের মানুষ শত্রুতে পরিণত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে এই উপন্যাসের মূল চরিত্র ফরিদের অবস্থাও একই রকম। ডার্ক হিউমারে সে ওস্তাদ ধরণের লোক।  তার কান্ডকীর্তি আমাকে আনন্দ দিয়েছে।  হয়তো পাঠকরাও সেই আনন্দ পাবেন।

আপনার এক ফেসবুক লাইভে বলেছিলেন, ষাটের দশকের ঢাকার উপর আপনি একটি উপন্যাস লিখছেন যা ২০১৮ এর বইমেলায় বেরুবে এবং সেটিই হবে আপনার লেখা শেষ উপন্যাস। যেহেতু ষাটের দশকের ঢাকার সেই উপন্যাসটির পরিবর্তে  ‘চন্দ্রমুখী’ থাকছে এবারের বইমেলায়।  তবে কি ধরে নেব   ‘চন্দ্রমুখীই আপনার লেখা শেষ উপন্যাস ? আর যদি তাই হয় তবে প্রশ্ন থেকেই যায়   এত দ্রুতই বা কেন লেখার জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছেন ?

– ও ওই কথা আমি ঝোঁকের মাথায় বলেছিলাম। তখন আমার এক বান্ধবী হয়েছিলো, সে স্প্যানিশ। ভেবেছিলাম, বাংলায় লেখালেখির ইস্তফা দিয়ে স্প্যানিশে লিখে যাবো। এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি। এখন আমার একটি মালয়েশিয়ান বন্ধু হয়েছে। তার কাছ থেকে মালয়ভাষা শিখছি । অতি মধুর সেই ভাষা। ভাবছি, আঁটঘাট বেঁধে মালয় ভাষায় লেখালেখি শুরু করবো।

বইমেলা মানেই যেন লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের এক মিলনমেলা। কিন্তু এবারের বইমেলায় পাঠকরা ‘চন্দ্রমুখীকে পেলেও গল্পের মূল কারিগর আশীফ এন্তাজ রবিকে তো পাচ্ছে না। সুদূর এই আমেরিকায় বসে পাঠকদের কোলাহল ঠিক কতটুকু মিস করবেন? 

–  দেশে থাকা অবস্থাতেও কিন্তু আমি বইমেলায় তেমন যেতাম না। আমি অলস প্রকৃতির মানুষ। বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে থাকার মধ্যেই জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পেতাম। তবে পাঠকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। আমি আড্ডাপ্রিয় মানুষ।  এবং আমার পাঠকরা হচ্ছে আমার আসল পরিবার। ঢাকায় আমার বাসার উপরে আরেকটি ফাঁকা ফ্ল্যাট ছিলো। ওখানে দিনরাত আড্ডা হতো। রাত দুইটা তিনটার দিকে আমরা দলবেঁধে চলে যেতাম পুরান ঢাকায়। কখনো কখনো মানিকগঞ্জে। সারা রাত নৌকায় ঘুরতাম। আমি আমার পরিবার থেকে বরাবরই বিচ্ছিন্ন মানুষ। আমার আসল পরিবার আমার বন্ধুবান্ধব আর পাঠকরা।  একটা ঘটনা বলি। বেশ কিছুদিন আগে দেশে ফিরলাম। নিজের বাবা মাকে জানাইনি। এয়ারপোর্টে অামার এক বন্ধু এসেছিলো।  তাকে নিয়ে বাসায় গেলাম।  এই হচ্ছি আমি।

আরেকটা কথা। আমি প্রবাসী কোনো মানুষ নই।  একটা ফেলোশীপে আমি আমেরিকায় আছি , এই যা। আমেরিকায় পড়তে আসা আর আমেরিকায় থাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। দু্ইটা দুই জিনিস।

এখন ইন্টারনেটের যুগে যোগাযোগ কোনো সমস্যা না। দেশেও যখন ছিলাম – পাঠকদের সাথে ইনবক্সেই কথা হতো। এখনো তাই হয়। ভবিষ্যতেও হবে। চিন্তার কিছু নেই।

আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে ইনবক্সের সামনে বসে থাকি। কেউ যদি আমাকে একটা লাইন লিখে, তিন লাইন উত্তর দেবার চেষ্টা করি।

আপনার সর্বশেষ ‘কাগজের নৌকো’ উপন্যাসটি  পাঠকসমাজে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এবারের বইটি নিয়ে আপনি ঠিক কতখানি আশাবাদী ?

– মোটেও আশাবাদী না। কাগজের নৌকার মতো এই উপন্যাসটিও আমাকে ডোবাবে।

খন্দকার মো.জাকিরের পরিচালনায় স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচিত্র   ‘নাগরিক’ ২০১৭ তে নির্মিত হয়েছিল। যা পরবর্তীতে  কানাডার ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল অফ সাউথ এশিয়া ২০১৭ তে অফিসিয়ালি সিলেক্টেড হয়েছিল। সেই চলচিত্রটি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

–  আমার একটা মামুলী ছোটগল্পের অনুসরণে এই ফিল্মটি বানানো হয়েছে।  গল্পটা অনেক আগে লেখা। তখন দেশের পরিস্থিতি অন্য রকম ছিলো। খন্দকার জাকির ওই পুরনো গল্পটাকে বর্তমান পরিস্থিতির ছাঁচে ফেলে সিনেমাটা বানিয়েছে। অপূর্ব কাজ ! খুবই অল্প পয়সায় ছেলেটা এই শর্টফিল্ম বানিয়েছে। তারপর এটার আন্তজার্তিক স্বীকৃতি পাবার পর সে চমকে গেছে। আমিও আনন্দিত হয়েছি। সমকালীন অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারের তুলনায় তার স্টোরি টেলিং অনেক বেশি এগিয়ে।

আপনার লেখা পড়ে অনেকেই বলেছেন আপনার লেখায় হুমায়ুন স্যারের আভাস পাওয়া যায়। আপনি কি তবে লেখার ক্ষেত্রে সত্যিই স্যারকে (হুমায়ুন আহমেদ) অনুকরণ করতে ভালোবাসেন।

–  আমাদের দেশে কোনো লেখক জনপ্রিয় হলেই বলা হয়, আপনি তো হুমায়ূন আহমেদের মতো। যেমন ফুটবলে কেউ ভালো খেললেই আমরা বলি, ইনি তো পুরাই ম্যারাডোনা।

হুমায়ূন আহমেদ একজন জাদুকর ছিলেন। তাকে অনুকরণ করার প্রতিভা আমার অন্তত নেই।

চন্দ্রমুখীসহ এখন পর্যন্ত আপনার প্রকাশিত বইগুলোর মাঝে আপনি কোন বইকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখবেন?

– চন্দ্রমুখী।  এই উপন্যাসটি হয়তো আমাকে কিছু দিনের জন্য অমরত্ব দেবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।