সত্যজিৎ, তাড়িণীখুড়ো, রণজি ও পূজোর নস্টালজিয়া

‘ফিফটি এইটে গেসলাম-ক্রিকেট খেলতে। জায়গাটা নেহাত ফেলনা নয়।’

 – সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা গল্প বাদশাহী আংটির একেবারে শুরুতে এই কথাটা বলেছিলেন ফেলুদা। বলা হচ্ছিল লখনৌ’র কথা, ওটাই তো গল্পের ঘটনাস্থান।

গল্পে আমরা জানতে পারি ফেলুদা এসময় তুখোড় ক্রিকেটার ছিলেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালের দিনে ‘স্লো-স্পিন’ করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে ক্রিকেট খেলে বেড়াতেন।

পরে আমরা দেখতে পাই গল্পের আরেক মুখ্য চরিত্র মহাবীরের সাথে একটা বুক স্টলে দেখা হয় ফেলুদার। মহাবীরকে দেখতেই পাননি এমন ভান করে দোকানদারের কাছে নেভিল কার্ডাসের ‘সেঞ্চুরিজ’ বইটা চেয়ে বসেন। সেখান থেকেই মহাবীর আর ফেলুদার আলোচনার সূত্রপাত হয়। সেসময়ই ফেলুদা মহাবীরকে নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের কথা বলেন। তখনই জানা যায় যে লখনৌ তে খেলতে এসেছিলেন। মহাবীরও জানিয়ে দেন তিনি ডুন স্কুলের প্রথম একাদশে খেলেছিলেন।

[এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি কার্ডাসের এই বইটা এক সময় খুঁজিনি। পরে জানতে পারি, এই নামের কোনো বই তিনি লিখে আদৌ যাননি। ছি: সত্যজিত বাবু, ছি:]

তদন্ত বিষয়ক আলাপে যাওয়ার আগে এই দু’জন ছোট্ট একটা বিতর্কও করে নেন; রণজি না ব্র্যাডম্যান – কে সেরা? তবে, সেই বিতর্কের ফলাফল অবশ্য আমাদের জানানো হয়নি।

__________

নব্য পাঠক হিসেবে ব্রিটিশদের ক্রিকেট বিষয়ে লেখা অনেক বই পড়তে গিয়ে আমি হোঁচট খেতাম। একটা বিশেষ সময়ের বই পড়তে সমস্যা হত। চট করে মনে করতে বললে আমি থমাস হিউজেসের টম ব্রাউন’স স্কুল ডেস বাদ দিলে কেবল পিজি উডেনহাউজ, জেএম ব্যারি, এএ মিলনে আর আর্থার কোনান ডয়েলের নাম মনে করতে পারি – এদের সবাই বেশ উদ্যমী ক্রিকেটার ছিলেন। এমনকি কোনান ডয়েল তো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও খেলেছেন, ‘রাইট আর্ম স্লো’ বল করতেন। সত্যজিত রয় গোয়েন্দা গল্প লিখতে গিয়ে যে কোনান ডয়েলে অনুপ্রাণিত হতেন, তার কথা তিনি বহুবার বলে গেছেন। ক্রিকেট মাঠে ফেলুদার ওরম পরিচয়ের কারণও এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ ফিকশনে এক সময়ে আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রের মত ঘুরেফিরেই আসতো ক্রিকেট। অনেকটা ডাল-ভাতের মত। যেমন এই চার্লস ডিকেন্সের পিক উইক পেপার্সের কথাই ধরুন না। সেখানে অল-মাগলটন ও ডিংলে ডেল ক্রিকেট ক্লাবের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচের একটা দৃশ্য ছিল। সেসময় এমন সব বই আসতো যাদের অনায়াসে ‘ক্রিকেট সাহিত্য’ বলে রায় দিয়ে দেওয়া যায়। সেটা ব্রিটিশ ফিকশনে যেমন ছিল, তেমনি ছিল উপমহাদেশেও। বুড়ো-যুবাদের কাছে তেমন জনপ্রিয় একটা বই হল শেহান করুণাতিলকা’র চায়নাম্যান। সম্প্রতি সেখানে যুক্ত হয়েছে অরবিন্দ আদিগার সিলেকশন ডে, যদিও আমি ওটার খুব বেশি পড়ে উঠতে পারিনি।

কিন্তু,  ক্রিকেটের এমন সাহিত্যকরণ আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখতো। ইডব্লিউ সোয়ানটনের ভাষায়, ‘ক্রিকেট হল ক্লান্তিকর জীবনের এক ধরণের প্রশান্তি।’

তখনকার বিলেতে, বা এখনকার ভারতবর্ষে, সিনেমা বা সাহিত্যে এটা অনেকটা ‘ঝড়ের আগের প্রশান্তি’র মতন।

__________

আবার সত্যজিত রায়ে ফিরি। একদিন আমার এক কাজিন রায় মশাইয়ের বোলিংয়ের একটা ছবি পাঠালেন। তিনি হয়তো সেই বিখ্যাত ‘স্লো স্পিন’ করছিলেন। ছয় ফুটের সত্যজিৎ রায় গাঢ় রঙা একটা পাজামা, ফুল হাতা শার্ট(বিষেন সিং বেদির মত হাত গোটানো নয়) আর খড়ম পরেছিলেন। আমি মনে মনে রায় বাবু আর ক্রিকেটকে গুলিয়ে ফেলছিলাম, ক্যালকাটার (কলকাতা হওয়ার আগে) গ্রীষ্মের বিকেলগুলে আমার স্মৃতিতে চলে আসছিল বারবার, মুহূর্তের মধ্যে গোগ্রাসে ফেলুদা উপন্যাস গিলে খাওয়ার বয়সটা চোখের সামনে ভাসছিল।

আর সেটা অবশ্যই শুধু বাদশাহী আংটিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্রিকেটের প্রসঙ্গ রায় বাবুর অনেকগুলো সিনেমাতেও এসেছে, যেমন কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৮৫), অরণ্যের দিন রাত্রী (১৯৭০)। কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্রে পরিবারের পৌঢ়ের চরিত্রে দারুণ অভিনয় করা ছবি বিশ্বাসকে এক ছোকড়াকে বলতে শোনা যায় যে, ছাত্র জীবনে তিনি একবার ৯৬ রান করে ব্রিটিশ স্পিনার ‘গ্রিগস’-এর বলে বোল্ড হয়ে যান।

তবে, কোনো সিনেমা নয়, একটা সাহিত্যকর্মই রায় বাবুকে একজন সাচ্চা ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সেটা হল খেলোয়াড় তাড়িণীখুড়ো। তাড়িণীখুড়ো যে সত্যজিৎ রায়ের এক গাদা গল্পের বিখ্যাত চরিত্র সেটা বলাই বাহুল্য। খুড়ো একদল খুঁদে ছেলেদের চা-বিড়ি খেতে খেতে গল্প শোনাতেন। শুধু নিজেই খেতেন, ছেলেগুলোকে কিছু দিতেন না।

সেই গল্পটা পড়েই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে, রায় বাবু রণজিকে ব্র্যাডম্যানের চেয়েও বড় গ্রেট মানতেন। গল্পটার সূত্রপাত ১৯৪৯ সালে। নেটিভ স্টেট প্রথা তখন শেষের দিকে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার কিছুকাল পরেই ভারতবর্ষে এই প্রথা বাতিল হয়ে যায়। সে সময় এই নেটিভ রাজ্য আর ইংরেজ শাষকরাই ছিল ক্রিকেটের মূল পৃষ্ঠপোষক।

তাড়িণীখুড়ো ছেলেপুলেদের সেই সময়ের গল্প বলছিলেন যখন তিনি মধ্যপ্রদেশের মার্তণ্ডপুর রাজ্যে রাজা বীরেন্দ্রপতাপ সিংয়ের কর্মচারী ছিলেন। অনেকদিন ধরেই সেই রাজ্যে মার্তণ্ডপুর ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) ও প্ল্যান্টার্স ক্লাবের মধ্যে বার্ষিক একটা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। শেষ ১০ বার সেই ম্যাচে হারে মার্তণ্ডপুর। বার বার হারতে থাকা সেই দলটার মান বাঁচানোর দায়িত্ব পড়ে তাড়িণীখুড়োর ওপর।

তাড়িণীখুড়ো ছেলেপুলেদের সেই সময়ের গল্প বলছিলেন যখন তিনি মধ্যপ্রদেশের মার্তণ্ডপুর রাজ্যে রাজা বীরেন্দ্রপতাপ সিংয়ের কর্মচারী ছিলেন। অনেকদিন ধরেই সেই রাজ্যে মার্তণ্ডপুর ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) ও প্ল্যান্টার্স ক্লাবের মধ্যে বার্ষিক একটা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। শেষ ১০ বার সেই ম্যাচে হারে মার্তণ্ডপুর। বার বার হারতে থাকা সেই দলটার মান বাঁচানোর দায়িত্ব পড়ে তাড়িণীখুড়োর ওপর।

সেই ডায়রিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, রণজি. দুলীপ, পতৌদির নবাব, এমসিসি, মহারাজ অব পাতিয়ালা, বাউন্সার ও আরও অনেক ক্রিকেটিয় রেফারেন্স ছিল সেই ডায়রীতে। গল্পের ক্লাইমেক্স আসে যখন তাড়িণীখুড়ো ২৪৩ রান করে দলকে জিতিয়ে দেন। তখনই জানা যায় যে ব্যাটটা দিয়ে বীরেন্দ্রপ্রতাপ তাকে খেলতে দিয়েছিলেন সেটা খোদ কুমার শ্রী রণজিৎসিংজির দেওয়া।

সেই ডায়রিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, রণজি. দুলীপ, পতৌদির নবাব, এমসিসি, মহারাজ অব পাতিয়ালা, বাউন্সার ও আরও অনেক ক্রিকেটিয় রেফারেন্স ছিল সেই ডায়রীতে। গল্পের ক্লাইমেক্স আসে যখন তাড়িণীখুড়ো ২৪৩ রান করে দলকে জিতিয়ে দেন। তখনই জানা যায় যে ব্যাটটা দিয়ে বীরেন্দ্রপ্রতাপ তাকে খেলতে দিয়েছিলেন সেটা খোদ কুমার শ্রী রণজিৎসিংজির দেওয়া।

তখন ওই ডায়রীতে লেখা আরেকটা কথার মহত্ব বোঝা যায়। লেখা ছিল, ‘আজ রণজি তার বন্ধুত্বের নিদর্শণ স্বরপুর নিজের একটা ব্যাট আমাকে দিল। এই ব্যাট দিয়েই সে সাসেক্সের হয়ে মিডলসেক্সের বিরুদ্ধে ২০২ রান করেছিল। আমার মত ভাগ্যবান পৃথিবীতে আর কেউ আছে কি?’

সত্যি রণজি সাসেক্সের হয়ে ২০২ রান করেছিলেন। এই একটা দলের হয়ে তিনি কাউন্টি খেলেছেন। মিডলসেক্সের বিপক্ষে সেই ইনিংসটা ছিল ১৯০০ সালে।

তাড়িণীখুড়ো এই বলে গল্পের ইতি টানেন, ‘আজ তাঁর মৃত্যুর ষোল বছর পরে, নিজের খেলা দেখে আঁচ করলুম তিনি কেমন খেলতেন।’

__________

কিন্তু, আমার হঠাৎ ক্রিকেটের ভরামৌসুমে এই সত্যজিৎ রায়ের ক্রিকেট আর এসব নস্টালজিয়ের পেয়ে বসলো কেন? ক্রিকেট ফেলে আমি কেন এসব নিয়ে ভাবছি?

কারণ, এখন পুজোর মৌসুম। দূর্গা পুজো, এই সময়ে এনআরবি মানে নন রেসিডেন্ট বাঙালিরা হঠাৎ একটু বেদনা আক্রান্ত হয়, শেকড়ে ফিরে যাওয়ার অনেকরকম বিষয় মাথায় চলে আসে।

রায় বাবুর ফেলুদা সিরিজটা জমে গিয়েছিল। প্রায় প্রতিবছরই এই রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখতেন। সেসব ছাপতো দেশ পত্রিকা অথবা রায় পরিবারেরই প্রকাশিত সন্দেশ পত্রিকার দুর্গা পূজো সংখ্যা। শিশু হিসেবে ফেলুদা প্রতিবছর একবার করে আসতো আমাদের জীবনে। এই পূজোর সময়, ফলে সময়টা আমাদের জন্য অন্যরকম ভাল লাগার ছিল। তাই, দূর্গা পূজোর উৎসবের শহর কলকাতা থেকে দূরে এই ব্যাঙ্গালুরুতে বসে  একটু-আকটু নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসলে সেটা দোষের কিছু নয়। অন্তত, সেখানে ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বড় অভিজ্ঞতা লুকানো আছে। আর এই ফাকে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতার কে ‘আপনি কি জানেন’ জাতীয় খেলাও জমে গেল।

__________

লেখাটি The nostalgia of Ray, Ranji and Pujo শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দ্য উইজডেন ইন্ডিয়া’য়

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।