সংস্কার ভাঙার সুপারহিরো

আমরা ‘স্পাইডারম্যান’ এর কথা শুনেছি। ‘সুপারম্যান’ ‘ব্যাটম্যান’ কিংবা ‘আয়রনম্যান’কেও নানান অসাধ্য সাধন করতে দেখেছি হলিউডের বড়পর্দায়। কিন্তু ‘প্যাডম্যান’ এর গল্প শুনেছেন কখনো? না শুনলে চলুন এবার বরং আপনাদের এক সত্যিকারের সুপারহিরো—‘প্যাডম্যান’র উপাখ্যান শোনানো যাক। সম্প্রতি যিনি বলিউডের রূপালি পর্দায় ধরা দিয়েছেন।

সময়টা ১৯৯৮ সাল। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডুর ২৬ বছর বয়সী এক দুরন্ত যুবক, নাম—‘অরুনাচালাম মুরুগানানথাম’। পরিবারের পছন্দমতে বিয়ে করে ঘরে তুললেন ‘শান্তি’ নামের এক তরুণীকে। স্ত্রীকে বিয়ের দিন প্রথম দেখার পর থেকেই অসম্ভব ভাল লেগে যায় সহজ সরল অরুনাচালামের।

স্ত্রীর সুবিধা-অসুবিধা ও ভাল-মন্দের প্রতি তার ব্যাপক খেয়াল। কেয়ারিং হাজব্যান্ড বলে কথা! যাহোক, সবকিছু ঠিকঠাক মত চলতে লাগল। বিপত্তি ঘটলো কিছুদিন পর। অরুনাচালাম খেয়াল করলেন, তার স্ত্রী ঋতুস্রাবের সময় কোনো স্যানিটারি ন্যাপকিন তো ব্যবহার করছেই না, উল্টো পুরোনো সব নোংরা কাপড়-চোপড় ব্যবহার করছে। যা মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে না।

কাপড়গুলো এতটাই অপরিচ্ছন্ন যে, যেটা দিয়ে অরুনাচালাম নিজের সাইকেল পরিস্কারের কাজে লাগাতেন কিনা সন্দেহ। তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন সে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার না করে এসব আন-হাইজিনিক বস্ত্র ব্যবহার করছে?

বাস্তবের প্যাডম্যান ও পর্দার প্যাডম্যান

লাজুক স্বভাবের মেয়ে ‘শান্তি’ প্রথমে তাকে কিছুই বলতে চায়নি। কিন্তু নাছোড়বান্দা অরুনাচালামের জোরাজুরিতে সে মুখ খুলতে বাধ্য হল। এবং জানাল, স্যানিটারি প্যাডের অনেক দাম, যা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। স্ত্রীর কাছে এমন কথা শোনার পর অরুনাচালাম স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি দেখলেন, স্যানিটারি প্যাডের দাম আসলেই তার মতো দরিদ্রের নাগালের অনেক বাইরে, তাহলে কী করা যায়?

উপায় তো একটা বের করতেই হবে। এরপর সেই উপায়ের খোঁজেই দক্ষিণ ভারতীয় ওই যুবক তার দৈনন্দিন কাজকর্ম ফেলে নেমে পড়লেন স্যানিটারী প্যাডের পেছনে। যে করেই হোক তাকে স্বল্প মূল্যের প্যাড বানাতে হবে। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে একপর্যায়ে তিনি সাশ্রয়ী দামে ভাল মানের প্যাড তৈরীর যন্ত্র আবিষ্কারে সাফল্য পান। এবং একের পর এক ভাঙতে লাগলেন নারীদের নিয়ে যত সব প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক ট্যাবু।

এমন এক সত্যি ঘটনা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে গল্প লিখেছেন অক্ষয়পত্নী টুইঙ্কেল খান্না। নাম—‘দ্য লিজেন্ড অব লক্ষ্মীপ্রসাদ’। এবার সেই গল্পকেই রূপালি পর্দায় জীবন্ত করে তুললেন দক্ষিণী পরিচালক—‘আর বালকি’। সিনেমায় অর্থায়ন করেছেন অক্ষয়-টুইঙ্কেল দম্পতি। তবে বাস্তব কাহিনীটা দক্ষিণ ভারতে ঘটলেও দর্শকরা দেখতে পাবেন মধ্যপ্রদেশের প্রেক্ষাপটে।

প্রায় তিন হাজার স্ক্রিনে রিলিজ হওয়া এই সিনেমায় অরুনাচালামের মত সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন ‘বলিউড খিলাড়ি’ অক্ষয় কুমার। তার স্ত্রী হিসেবে আছেন—রাধিকা আপ্তে। সিনেমায় তাদের নাম যথাক্রমে—লক্ষ্মীকান্ত চৌহান ও গায়ত্রী।

এখানে দেখা যায়, স্ত্রী গায়ত্রীর পিরিয়ডের সময় তাঁকে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে অনুরোধ করেন বউপাগল স্বামী লক্ষ্মীকান্ত চৌহান। কিন্তু প্যাডের দাম বেশি হওয়ায় গায়ত্রী তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনায় লক্ষ্মীকান্ত খুবই ব্যথিত হলেন, এবং নারীদের এই মাসিক সমস্যা সমধানের জন্য তিনি নিজে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা ভাবলেন। তৈরি করলেন কম দামে সহজলভ্য স্যানিটারি প্যাড।

প্রথমে তিনি তুলা আর সামান্য কাপড় দিয়ে প্যাড বানানোর চেষ্টা করলেন, কাজ হল না। কিন্তু লক্ষ্মীকান্ত চৌহান তো হার মানার পাত্র নন। দামী স্যানিটারি প্যাডের বিকল্প কিছু বানাতে তিনি যে কত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। তিনি নিজের তৈরী প্যাডগুলো শুরুর দিকে স্ত্রীকে পরিয়ে টেস্ট করেছেন।

কিন্তু, সমস্যা হল পিরিয়ড তো প্রতিদিন হয় না। সে-জন্য তাকে একমাস অপেক্ষা করতে হয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন টেস্ট করার জন্য এলাকার অন্য মেয়েদের কাছে যাবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে গ্রামের কোন মেয়ে তাকে পজেটিভলি নেওয়ার প্রশ্নই আসে না!

ইতোমধ্যে ‘চরিত্রহীন পুরুষ’ বলে তার ডাক ওঠে যায়। একে একে সকলে বিরক্ত হয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের কিছু ছাত্রী তার বানানো প্যাড যাচাই করতে রাজি হয়। তবে ব্যবহারের পর কেউ-ই বলে না, কেমন হয়েছে। শেষমেশ তিনি নিজের অন্তর্বাসের ভেতরে প্যাড পরে পরীক্ষা করেছেন!

এভাবেই সিনেমার গল্পটা আবর্তিত হতে থাকে। মোটের ওপর মূল কাহিনীটা এখানে বলে দিলাম, কত সহজে বলা হয়ে গেল। অথচ অরুণাচালমরূপি লক্ষ্মীকান্তের চলার পথটা কিন্তু মোটেও অত সহজ ছিল না, বরং ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ ও মরুময় ছিল। প্রতিটা পদক্ষেপে এই মানুষটাকে পোহাতে হয়েছিল অজস্র ঝামেলা, লাঞ্ছনা ও অপমান।

গ্রামের সবার কাছে তাকে অপদস্থ হতে হয়েছিল, হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছিল। কেউ কেউ ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে একঘরে রাখার ব্যবস্থাও করে ফেলেছিল। মারধরও বাদ যায়নি। এতো অপমানের জ্বালা এবং তার পাগলামীর যন্ত্রণা সইতে না পেরে তার স্ত্রী ও পরিবার-পরিজন তাকে ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই জেদের বশে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসেন।

অথচ এসব কিছু খ্যাপাটে লক্ষ্মীকান্তকে একদম আটকে রাখতে পারেনি। তার মতে, জগতকে বদলাতে চাইলে কিংবা চারপাশের মানুষগুলোর মন ও মননে আমূল পরিবর্তন আনতে চাইলে ‘পাগল’ হওয়া ছাড়া আর বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। কাজ করতে গেলে মানুষ আপনাকে পাগল বলবেই, অজস্র কটুক্তি করবেই, কিন্তু এসবে কান দেওয়া যাবে না। দৃঢ় সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সমুখ পানে।

প্যাড বানানোর কাজটি শুরুর দিকে কেবলমাত্র নিজের স্ত্রীর প্রতি অসীম ভালোবাসার তাগিদে হলেও পরে দেখা যায়, এটি তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকায় চলে আসে। তিনি ভেবে দেখলেন, শুধু তার স্ত্রীই নয় বরং এলাকার হাজার হাজার কিশোরী ও মধ্যবয়স্কা নারী সকলেই মাসের নির্দিষ্ট ওই কয়েকটি দিন অস্বাস্থ্যকর কাপড় পরেই কাটায়। তার ধারণা, এসব নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তার মতো পুরুষদেরই।

‘ঋতুস্রাব’ ‘মাসিক’ ‘পিরিয়ড’ ‘মেনস্ট্রুয়েশন’ কিংবা ‘স্যানিটারি ন্যপকিন’—এই টার্মগুলো শুধু তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশ কেন, বরং ভারতবর্ষের যে-কোনো অনুন্নত এলাকা, গ্রাম কিংবা মফস্বলে আজও ট্যাবু আকারেই দেখানো হয়। এই বিশেষ সময়ে নারীদের পুরুষসঙ্গ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। তাদেরকে অপবিত্র মনে করা হয়! অথচ, ‘পিরিয়ড’ একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া।

এখানে কোনো অপবিত্রতা কিংবা রোগের কিছু নেই। এই বিশেষ সময়ে নারীদের কাছ থেকে দূরে থাকা কিংবা অপবিত্র মনে করার যে ভ্রান্ত কুসংস্কার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে—তার বিরুদ্ধে এই সিনেমার মূল চরিত্র লক্ষ্মীকান্ত জোর গলায় আওয়াজ তুলেছেন।

এবার অভিনয় নিয়ে কিছু বলা যাক। অক্ষয় কুমার—তিনিই এই সিনেমা প্রাণ। তার অভিনয় নিয়ে আসলে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই সিনেমার চিত্রনাট্য তিনি একাই সামাল দিয়েছেন। গোটা ছবিতে পুরো ফোকাসটা তার ওপরেই ছিল। শুধুমাত্র তাকে দেখার জন্য হলেও এই সিনেমাটি একবার দেখা যায়। তিনি চরিত্রের ভিতর এতটাই ঢুকে গেছেন যে, দেখে মনে হয় এই চরিত্র কেবল তার জন্যই! এরচেয়ে ভাল অভিনয় কেউ করতে পারত না।

পাশাপাশি অক্ষয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন রাধিকা আপ্তে। গায়ত্রীর চরিত্রে তিনি ছিলেন জাস্ট অসাধারণ। এ সিনেমায় তার পরিণত অভিনয়ে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। বিশেষ করে, তার এক্সপ্রেশন এতটাই অসাধারণ ছিল যে, আপনার চোখ পর্দায় আটকে থাকতে বাধ্য! সোনম কাপুরের কথা বলতে হবে। মাঝে দিয়ে তার অনবদ্য উপস্থিতি সিনেমাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।

অমিত ত্রিবেদী কম্পোজ করা এই সিনেমার মিউজিকও অসাধারণ। বিশেষ ‘আজ সে তেরি’ এবং ‘লেড়কি সায়ানি হো গ্যায়ি’—এই দুইটা গানের কথা বিশেষভাবে বলতেই হবে। এ গান দুটো খুবই শ্রুতিমধুর।

দক্ষিণী পরিচালক ‘আর বালকি’ এই ছবি বেশ যত্ন নিয়েই বানিয়েছেন, তা দেখলে সহজেই অনুমেয়। তবে মাঝেমাঝে মনে হতে পারে এটি কোন সিনেমা নয়, বরং জনসচেতনতা প্রচারে কোন বিজ্ঞাপন। কিছু কিছু দৃশ্য অতিরিক্ত ছিল মনে হল, যা না থাকলেই আরো ভাল হত। আর, একের পর এক সব বাধা ডিঙিয়ে খুব দ্রুত লক্ষ্মীকান্তের খ্যাতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া—কিছুটা অবাস্তব মনে হতে পারে। যাহোক, বিনোদনের মধ্যদিয়ে পরিচালক সচেতনতা প্রচারে যেই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তার জন্যে কিছুটা সাধুবাদ পেতেই পারেন।

শেষ কথা, এই সিনেমা দেখার পর ভারতবর্ষের নারীরা যদি তাদের কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন, এবং পুরুষেরা যদি নারীদেরকে অপবিত্র না ভেবে কাছে টেনে নেন, তাহলে এটাই যে হবে এ সিনেমার সবচেয়ে বড় সাফল্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।