শুভ বিবাহের আগে || ছোটগল্প

সমীরদা খুবে চেপে ধরলো, ‘প্রভাসের বিয়েতে যেতেই হবে।’

প্রভাস এই বুড়ো বয়সে এসে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলো কেনো, সে নিয়ে আমরা গল্প করতে পারি। এমনকি প্রভাসের বাবার এই যে মেয়ের বাপের জায়গা জমি দেখে পাগল হয়ে যাওয়াটা; এ নিয়েও খানিকটা সময় ব্যয় করা যায়। কিন্তু প্রভাসের বিয়ের বরযাত্রী যাওয়াটা নিতান্ত বাড়াবাড়ি।

সমীরদাকে মুখের ওপরই বলে দিলাম, ‘আমার এই দুনিয়ায় অনেক কাজ আছে। কোনো কাজ না থাকলে ছাদের ঘরে উঠে ঘুমাবো। কিন্তু প্রভাসের বিয়েতে যাবো না।’

সমীরদা একটু খেপে ওঠার মতো করে বললো, ‘আরেহ, বুঝতেছিস না। প্রভাসের শ্বশুর বাড়ি বিরাট বড় লোক পার্টি। গেলে খুব ভালো খাওয়া পাবি।’

‘আচ্ছা। খাওয়া নিয়ে তোমার টেনশন? তোমারে আমি এক বেলা বাদশাহর হোটেলে খাওয়ায়ে দেবানি। এসব বরযাত্রী যাওয়ার চিন্তা বাদ দাও।’

সমীরদার মুখ দেখে মনে হলো না যে, সে চিন্তাটা বাদ দিয়েছে। বরং পরাদিন সাইদুলের কাছে শুনলাম, সে বাকীদের প্রায় ম্যানেজ করে ফেলেছে। আমি ছাড়া সবাই মোটামুটি রাজী।

মেজাজটাই খারাপ হলো। কী এক দলের সাথে ঘুরি। একটু খাওয়ার নাম শুনেছে, অমনি সেই পোরগোলায় যেতে রাজী আছে। তাও আজকের দিনে বাস নয়, মাইক্রো নয়, মটরসাইকেল নয়; ট্রলারে করে বরযাত্রী যাবে। এই পোরগোলা জায়গাটা কোথায়, তাই আমরা কেউ জানি না। জানি শুধু, সেখানে ট্রলার ছাড়া যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

দুটো দিন খুব নির্বিষ কাটবে, এটা মেনেই নিলাম। তাসের আড্ডার সব আজ বিকেলে বরযাত্রী যাচ্ছে। আমারও বিকেল বেলায় কোনো কাজ ছিলো না। মটর সাইকেল নিয়ে তাই ঘাটে গিয়েছিলাম ওদের বিদায় করে দিয়ে আসতে।

বর প্রভাস মহাখুশী। তার কিপটে বাপের কারণে কোনো বন্ধু তার বাড়ির আশেপাশেও আসে না। এমনকি বন্ধু মহলে সে খুব একটা সুবিধেও করে উঠতে পারে না। কারণ বন্ধুরা দুটো সিগারেট খাওয়ালে তার একটা অন্তত খাওয়ানো উচিত। কিন্তু প্রভাসের কাছ থেকে আমরা সিগারেট তো দূরে থাক, কোনোদিন একটা বিড়িও বের করতে পারিনি। বের হবে কি করে? ওর বাপ ওকে মাসে এক শ টাকা দেয় হাত খরচ!

এরকম ছেলের তো বন্ধু থাকার কথা না। তারপরও ও কিভাবে যেনো আমাদের দলে ভিড়ে আছে। এই ভিড়ে থাকতে পারার একটা কারণ অবশ্য প্রভাসকে সবাই ইচ্ছেমতো খ্যাপাটে পারে; আজকাল যেটাকে বুলিং বলে আর কী।

একটু মোটাসোটা ছেলে। ফলে কুমড়ো, ভোটকা; ইত্যাদি বলে ডাকার একটা কমন ব্যাপার তো আছেই। এর পাশাপাশি শরীরের আরও কিছু দিকে ইঙ্গিত করে কিছু আদি রসাত্মক ব্যাপার স্যাপারও চলে। প্রভাস এগুলোতে কখনোই বেশী একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। রাগ করে দল ছেড়ে চলেও যায় না। এই দল ছেড়ে গেলে ও এই বয়সে আর দল পাবে কোথায়?

বয়সের কথা যখন এলো, তখন সত্যি কথাটা বলা যাক। আমরা কেউ আর কচি খোকাটা নেই। আমাদের সমীরদা পঞ্চাশ পার করে ফেলেছে। সাঈদের বয়স ৪৫-এর কম হবে না। বাকী আমরা সবাই কমবেশী চল্লিশ। প্রভাসও এই চল্লিশে এসে বিয়ের মুখ দেখতে পেলো।

এর আগেও প্রভাসের কিছু বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু মেয়ের বাপ খুব বড়লোক না বলে প্রভাসের বাপ রাজী হয়নি। এবার একেবারে ব্যাটে বলে লেগে গেছে আর কী। মেয়ে দেখতে নাকি সামান্য টেরা। তাতে কিছু যায় আসে না। মেয়ের বাপের সোনার দোকান আছে। এরপর আর কী লাগে!

আমি প্রভাসকে সেটাই বললাম, ‘তোর আর কী? এখন থেকে শ^শুরের কাছ থেকে হাতখরচ নিবি। মোটর সাইকেল তো একটা পাচ্ছিসই।’

সিগারেট টানবে বলে একটু আলাদা হয়ে এসেছিলো প্রভাস। আমরা দল বেঁধে ওকে ঘিরে দাড়িয়েছিলাম। জীবনে এই প্রথম এতো গুরুত্ব পাচ্ছে। সে জন্যই ঠোটটা বাকিয়ে উত্তর দিলো,

‘এহ। মেয়ের বাপও নাকি আমার বাপের মতো। হাত দিয়ে জল গলায় না। আর মটর সাইকেল দেখবি বাবা বেচে দেবে।’

সমীরদা সিগারেটের ধোয়ার একটা রিং বানিয়ে বললো, ‘বেচতেই যদি হয়, আমাদের বলিস। আমরা বেচে মেরে দেবো। তোর বাপ টেরও পাবে না। হাইজ্যাক হয়ে গেছে বলে চালিয়ে দিবি।’

আমাদের মধ্যে সমীরদাই সবচেয়ে বড়লোক। বাপের বিশাল জায়গা সম্পত্তি তো আছেই। নিজের কাপড়ের দোকান দুটো। খুব ভালো বেচা বিক্রি হয়। সারাদিন দোকানদারি করে সন্ধে বেলা আমাদের সাথে এসে ভেড়ে। যেমন আয় করে, তেমনই দুই হাতে টাকা ওড়াতে পারে।

কথা বলতে বলতেই প্রভাসের বাপের গলা পাওয়া গেলো, ‘কই রে তোরা। এখন ট্রলার ছাড়তে হবে।’

সবাই আস্তে ধীরে সিগারেট ফেলে ট্রলারের দিকে এগোলো। আমিও এগোলাম মটর সাইকেলের দিকে। এর মধ্যেই বিপত্তিটা ঘটে গেলো। সাঈদ, সমীরদা আর রাসেল আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন জনে মাথার উপর তুলে ট্রলারে নিয়ে গেলো। আমি যথেষ্ঠ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মুশকো তিন জানোয়ারের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারলাম না।

ট্রলার স্টার্ট করে ফেলার পর বুঝলাম, আর কিছু করার নেই। ছোট ভাইকে ফোন করে বললাম, মটরসাইকেলটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। চাবি ওর কাছে একটা বাড়তি আছে; সে নিয়ে চিন্তা নেই।

ছাড়া পেতেই এক পশলা গালি গালাজ করে সিগারেট ধরালাম একটা। আমাদের বহরে ট্রলার তিনতে। প্রভাস তার বাসের সাথে ছোট একটা ট্রলারে। আমরা বন্ধু বান্ধবরা এক ট্রলারে, আমাদের সাথে ওদের কয়েক জন আত্মীয় আছে।

ছোট খাল ধরে যাত্রা শুরু করার একটু পরই রূপসা নদীতে পড়লাম। আমি জানতাম এই যাত্রা শুভ হবে না। নদীতে আসতে না আসতেই মাথার ওপর কালো মেঘ করে এলো। শালার ট্রলারে ছাউনি আছে। কিন্তু তাতে এতোগুলো লোকের জায়গা হওয়া কঠিন।

সাঈদকে গালি দিয়ে বললাম, ‘হারামী, ধরে আনলি। এখন বৃষ্টি পড়লে তোর জামা খুলে আমি মাথায় বাধবো।’

জামা খোলা হলো না। কিন্তু বৃষ্টি নামলো। একেবারে যাচ্ছেতাই ধরণের বৃষ্টি। সাথে বাতাসও। বিয়েতে যাওয়ার শখ একেবারে মিটে যাওয়ার মতো অবস্থা। বাতাসে ট্রলার দুলতে শুরু করলো। সে একটা যাচ্ছেতাই অবস্থা। আমরাও তখন ভয়ে চুপ মেরে গেছি।

সব বিপদেরই নাকি শেষ আছে। তাই বৃষ্টিও এক সময় কমলো, বাতাস থামলো এবং আমরা মেয়ের বাড়ির ঘাট খুজে পেলাম।

এই দিকটায় মনে হয় বৃষ্টি তেমন হয়নি। লাল রংয়ের বিয়ের গেট আর প্যান্ডেল ঠিকই আছে। সামান্য একটু ভিজে গেলেও ধ্বসে পড়েনি। গেটে এসে পড়লাম আরেক বিপদে। গেট আটকে দাড়িয়ে আছে কয়েকটা ছেলে মেয়ে। এটা আমার কোনো বিপদ না; এটা রেওয়াজের অংশ। কিন্তু সমস্যা হলো, এরা টাকার জন্য গেট আটকায়নি। একটা মেয়ে বললো,

‘এখনও ভেতরে কিছু গোছানো হয়নি। আপনারা এখন ঢুকতে পারবেন না।’

আমাদের তরফে একজন মাতবর আবিষ্কার হলো। পরে জানা গেলো এই লোকটা প্রভাসের কিরকম ভগ্নিপতি। তিনি খেপে গিয়ে বললেন, ‘ছয়টার সময় বিয়ে। এখনও গোছানো হয়নি মানে কী? এখন তো পাচটা বাজতে চললো।’

মেয়েটাও একটু চটে গিয়ে বললো, ‘ছয়টায় বিয়ে তো এখনই কী? আপনারা ওয়েট করেন।’

এই নিয়ে মিনিট পনেরো তর্কতকির এক পর্যায়ে বোঝা গেলো এই ‘ছয়টা’ ব্যাপারটাই গোলমেলে। এটা নিয়েই লেগেছে গোলমাল। বিয়ে আসলে ভোর ছয়টায়; আমরা ভেবেছি সন্ধে ছয়টায়।

কী আর করা! বলদের হাতে পড়েছি। এখন আমার এইসব বলদামি সহ্য করতে হবে।

ভেতরে ঢোকার পর মেজাজটা আরও বিগড়ে গেলো। এই গন্ডগ্রামে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুত নেই। এরা একটা জেনারেটরের ব্যবস্থাও করেনি। সেই আদ্যিকালের কতোগুলো হ্যাচাক নিয়ে এসেছে। সমস্যা হলো, এই বাড়িতে কেউ হ্যাচাক জ¦ালাতে পারে না। ডেকরেটেরের লোক রাত আটটার দিকে এসে জ¦ালাবে। ততোক্ষন এই চার্জার লাইটের আলোয় বসে থাকতে হবে।

একটা টেবিল পেতে একটু তাস পিটিয়ে নেবো, সে উপায়ও নেই। তাস সমীরদা নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই আলোতে তাস হবে না।

সাঈদ আবার সবকিছু পারে। সে বললো, ‘কই হ্যাচাক নিয়ে আসেন তো। আমি জ্বালায়ে দেই।’

সাঈদ পারলো। একটা হ্যাচাকের পাম্পার ভেঙে ফেললো এবং দুটোর ম্যান্টেল ফেলে দিলো। এরপর ওকে হাতে পায়ে ধরে সবাই থামালো।

অবশেষে রাত নয়টার দিকে ডেকরেটরের লোক আসলো। এসে নিজেদের হ্যাচাকের দূরাবস্থা দেখে খানিকক্ষন চিল্লা পাল্লা করলো। তারপর গোটা পাচেক জ্বালিয়ে দিতে পারলো।

হ্যাচাকের আলোতে আমরা কেবল এক রিল খেললাম। এর মধ্যে খাবার ডাক এলো। ডাক এলো মানে কঞ্চির মতো লম্বা এক লোক এসে বললো, ‘বাবুরা একটু সরে বসলে আমরা টেবিল পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা করতাম।’

একবার মনে হয়েছিলো, গালি দেই। পরে মনে হলো, খাওয়াটা দরকার। কিন্তু সে খাওয়ার কী ছিরি!

খুব সমীরদা বলেছিলো, বড়লোক মেয়ের বাপ-ভালো খাওয়াবে। কাজের বেলায় দেখা গেলো চালকুমড়ো ভাজি, ঘন্ট, মাছের মাথার ডাল, রুই মাছ। সে রুই মাছের চেয়ে বড় বড় টাটকিনি পাওয়া যায় আমাদের পুকুরে। খেতে বসে আরেক পশলা মেজাজ খারাপ হলো।

সাঈদ তো কা-ই করে ফেললো। ও বারবার লোকটাকে বলছিলো একটা মাছের মাথা দেওয়ার জন্য। যে লোকটা দিচ্ছিলো, সেও বারবার বালতির মধ্যে চামচ ঘুরিয়ে বলে, ‘নেই তো মাছের মাথা।’

সাঈদ ফস করে হাত ডুবিয়ে দিলো বালতিতে। স্যালাইন ঘোটার মতো ঘুটে একটা মাথা তুলে এনে বললো, ‘নেই মানে কী? এটা কার মাথা?’

চারদিকে হইহই পড়ে গেলো। মেয়ের বাপ এসে সবার কাছে কেনো যেনো ক্ষমা চাইতে শুরু করলো।

খাওয়ার পর্ব মেটার পর প্রথম পরিকল্পনা হলো, এখানেই বসে বসে তাস খেলে সময় পার করবো। কিন্তু সমীরদা বললো, ‘শরীরটা ভালো লাগছে না। একটু শোয়া দরকার।’

আমি খেকিয়ে উঠলাম, ‘শোয়া দরকার! আগে মাথায় ছিলো না। আমারেও টেনে আনলে এই বালের বিয়েতে। এখন শোও এই উঠোনে।’

সত্যি কথা। মেয়ের বাপ একটু শোয়ারও ব্যবস্থা করেনি।

খানিক সময় গোম মেরে থাকার পর রাসেল বললো, ওর মামার এক বন্ধুর বাড়ি এই পোরগোলায়। ও নাকি একবার এসেছে। বেশ বড় বাড়ি। সেখানে গেলে নাকি শোয়ার ব্যবস্থা হতে পারে। ঠোট কামড়ে বললো, ‘চলো, সেদিকে যাই।’

সমীরদা এবার খেপে গেলো,

‘তুই সেই বাড়ি চিনিস? যে যাওয়ার কথা বললি!’

‘চেনার ব্যবস্থা হবে। মামাকে ফোন করে ওনার নাম জেনে নেই।’

তাই হলো। মামা বললেন, ওই লোকের নাম শম্ভু সাহা। বিরাট দোতলা বাড়ি আছে। কোনো সমস্যা নেই।

শম্ভু সাহার বাড়ির কথা বলতে এই বাড়ির লোকজনও চিনে ফেললো। এমনকি আমাদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য একটা ছেলেকেও পাওয়া গেলো। যতোটা ভেবেছিলাম, ততো খারাপ না লোকজন।

অন্ধকারে পা টিপে টিপে শম্ভু সাহার বাড়িতে চললাম। এ বাড়িতে বলে এলাম, বিয়ের আগেই চলে আসবো।

বাড়ি তো নয়; পোড়োবাড়ি। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকারে দাড়িয়ে আছে সেকালের এক দালান। সদর দরজা মনে হয় সেকালের লোহা কাঠ দিয়ে বানানো। প্রথমে রাসেল ডাক দিলো, ‘শম্ভু মামা আছেন নাকি?’

এই ডাক ভেতরে পৌছানোর কোনো কারণ নেই। তাই আমরা ইচ্ছেমতো দরজার কিল-ঘুষি চালালাম। ভেতর থেকে একটা পায়ের শব্দ ভেসে এলো; যাক কেউ একজন আসছে।

শব্দটা কাছাকাছি এসে বললো, ‘কেডা? এতো রাত্তিরে কেডা?’

সবার মেজাজ তিরিক্ষি। সমীরদা খেপে যেয়ে বললো, ‘ডাকাইত। দরজা খোল।’

ওপর থেকে কামান গর্জনের মতো একটা আওয়াজ এলো। টর্চের নিভু নিভু আলোয় দেখলাম সমীরদার বুক ভেসে যাচ্ছে রক্তে। চিৎ হয়ে পড়ে আছে আমার কোলের উপর।

ওপরে একটা জোর কন্ঠ শোনা গেলো, ‘বাবা, আইজ গুলি করে দিছি। শালা এই সপ্তাহে তিন দিন ডাকাইত পড়লো। আইজ এট্টারে মাইরে দিছি।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।