শুদ্ধতম কবি

১.

‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ – লাইনটা যদি আপনি কখনো না শুনে থাকেন তাহলে ভাবতে হবে আপনি আসলে এখনো সত্যিকার সাহিত্যপ্রেমী বাঙ্গালী এখনো হয়ে উঠেননি।

আচ্ছা, এটা বাদ দিলাম। কবিতা অনেকেই পছন্দ করেন না। কাজেই এই কবিতা না শুনলেও হয়তো খুব বেশি দোষ আপনাকে দেওয়া যাবে না। কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবনেই কখনো না কখনো প্রেম আসে। আর প্রতিটা প্রেমিকেরই ‘বনলতা সেন’ এর নামটা না শোনা কিছুটা পাপের মতো। আপনি যদি বনলতা সেন এর নাম শুনে থাকেন তাহলে সেই কবিতার কবির নামটাও শোনাটা জরুরী।

অমর হবার আকাঙ্ক্ষা প্রায় সব মানুষেরই থাকে। তবে প্রতিটা মানুষই যেহেতু জানে যে সে অমর হতে পারবে না তাই প্রত্যেকেই চায় এমন কিছু কাজ করতে যাতে সেই কাজের দ্বারা সে মানুষের মনে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে পারে। অথচ কেউই জানে না যে ঠিক কোন কাজটা করলে মানুষের মনে চিরস্থায়ী হওয়া যাবে। কত কবি সাহিত্যিক দিনের পর দিন সাহিত্য চর্চা করে যাওয়ার পরেও মানুষের নজরে আসে নি। আবার কারো কারো এক দুটি লাইন এমন ভাবে মানুষের মনে গেঁথে আছে যে সেই লাইনটা কে লিখেছে সেটাও অনেক মানুষ জানে না।

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে? – এই লাইন দুটো এমন বাঙ্গালী খুব কমই পাওয়া যাবে। কিন্তু এই লাইন দুটোর স্রষ্টা যে কুসুম কুমারী দাস সেই কথাটাও খুব কম মানুষই জানে।

‘বনলতা সেন’ এর স্রষ্টা হচ্ছেন এই কুসুম কুমারী দাশের পুত্র জীবনানন্দ দাশ।

২.

জীবনানন্দ দাশকে বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার আবার আসিব ফিরে কবিতায় দেশের প্রতি মমত্ববোধটাও খুঁজে পাওয়া যায়।

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়;

হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,

সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে-ভেসে;

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেচাঁ ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;

হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;

রূপসা ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙা রায় — রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে

প্রচার বিমুখ হওয়ার কারণে জীবত অবস্থায় তার সাহিত্য প্রতিভা খুব বেশি মানুষের কাছে পৌছ নি। এছাড়া ব্যক্তিগত জীবনে তাকে প্রায়ই চরম আর্থিক দারিদ্রতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

দিল্লীর এক কলেজে অধ্যপক হিসেবে যোগ দিলেও মাত্র চারমাস তার চাকুরি টিকে। বিয়ের পর একপর্যায়ে প্রায় পাচ বছর চাকুরী বিহীন অবস্থায় ছিলেন। কিছুদিন এক বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে চাকুরী করেছেন, মাঝে ছোট ভাই এর কাছ থেকে ধার করে ব্যবসা করে তাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

প্রায় পুরোটা জীবন তাকে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর কলকাতায় একটা ট্র্যাম দূর্ঘটনায় তিনি আহত হন। পরবর্তীতে ২২ শে অক্টোবর হাসপাতালে চিকিৎসা রত অবস্থাতেই তিনি মারা যান। তখন তার বয়স মাত্র ৫৫ বছর।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে জীবনানন্দ দাশ প্রায়ই নাকি ট্রাম দূর্ঘটনায় মৃত্যূর কথা ভাবতেন। এর চেয়েও আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে গত একশত বছরে কলকাতা শহরে ট্রাম দূর্ঘটনায় মৃত্যূর ঘটনা একটাই।

৩.

মৃত্যূর পর তার বিভিন্ন পান্ডুলিপি পাওয়া যায় যা কিনা জীবত থাকা অবস্থায় কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এর সংখ্যা ছিল ২১ টি উপন্যাস আর ১০৮ টি ছোট গল্প। মূলত কবি হিসেবে তার পরিচিত থাকলেও তার প্রবন্ধ, ছোট গল্প আর উপন্যাস এটা প্রমাণ করে যে সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তার দক্ষতা অসীম ছিল।

মৃত্যূর পর থেকে মূলত তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকেন। জীবনানন্দ দাশের জীবন ও কবিতার উপর অসংখ্য লেখা আছে এবং বর্তমানেও রচিত হচ্ছে। এর বাইরে ইংরেজীতেও তার উপর একটা বই লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি, আ পোয়েট আপার্ট নামে। তার অসংখ্য কবিতা ইংরেজী ও ফরাসী সহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত কবির কবিতাতেই শান্তির খোজ খুঁজে পাওয়া যায়।

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

এই দু দন্ড শান্তিই তিনি সারা জীবন ব্যপি খুঁজে পাননি। ওপারে তিনি শান্তিতে থাকুক মৃত্যূ দিবসে এই কামনাই রইলো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।