শিক্ষক তাঁর খাতা ছিড়েছিলেন, আজ তাঁকে বিশ্ব চেনে

কথায় আছে, কারো প্রতিভা থাকলে তাঁকে কখনো আটকে রাখা যায় না। প্রতিভা হল পানির মত। কাটাযুক্ত বন আর পাহাড় পর্বত আসুক না কেন, এটা ঝর্ণা হয়ে নামবেই। যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি, সেটাও এই ঝর্ণার পানির মত। সামাজিক নানা বিপত্তিতেও প্রতিভার নিজস্ব গতি কখনো থেমে থাকেনি।

গল্পটা মনোজ যাদবের। উপমহাদেশের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিপরীতে হাঁটতে গিয়েছিলেন তিনি। এই অঞ্চলের মানুষের ধারণা হল যারা কলা বিষয়ে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা তুলনামূলক কম মেধাবী হন। এই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙেছেন যাদব। ‘শেরো-শায়েরি’ করে, বা সোজা বাংলায় স্রেফ কবিতা লিখে তিনি উঠেছেন সাফল্যের শিখরে। তিনি নিজের এমন একটা পরিচয় গড়েছেন, যার কল্যানে এখন পুরো বিশ্বের মানুষই তাঁকে কম-বেশি চেনে। যারা চেনেন না তাঁরাও এই ব্যক্তির কাজের সাথে পরিচিত।

মনোজ যাদবের বাড়ি উত্তর প্রদেশের আযমগড়। বলিউডে এখন এই নামটা বেশ জনপ্রিয়। কারণ, এই এলাকায় বড় হওয়া মনোজ ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য গান লিখেছেন। ‘রাইস’সহ নামকরা একগাদা বলিউডি সিনেমার গানও এসেছে তার কলম থেকে।

ষাটের দশকে বাবা অবশ্য তাদের নিয়ে চলে এসেছিলেন মুম্বাইয়ে। বাবা ছিলেন মিলে কাজ করা সামান্য এক শ্রমিক। মুম্বাই থেকে উত্তর প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ থেকে মুম্বাই – এই করেই কেটেছে মনোজের শৈশব।

মুম্বাইয়ের স্কুলেই তাঁর পড়াশোনা। গরমের ছুটির দুই মাস কাটাতেন আজমগড়ে। পড়াশোনায় তিনি যথেষ্ট ভাল ছিলেন। শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন ভিষণ জনপ্রিয়।

সেটাই তার জীবনের কাল হয়েছিল। অন্য সব বাবা-মার মত তার বাবা-মাও ভাবতে থাকেন বড় হয়ে তাঁর সন্তান ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবেন। কিংবা হবে বড় সরকারী চাকুরে।

তবে, মনোজ এমন ‘সাদামাটা’ জীবন চাননি। তিনি ডুবেছিলেন কবিতায়। একে ঘিরেই তিনি দেখতেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষকরাও। একদিন ইতিহাসের ক্লাসে বসে নিজের নোটবুকে একটা কবিতা লিখছিলেন মনোজ। শিক্ষক ব্যাপারটা খেয়াল করেন। ক্ষেপে গিয়ে ছিড়ে ফেলেন মনোজের কবিতার খাতা।

মনোজের সেদিন খুব রাগ হয়েছিল। আর সেটা এতটাই যে তিনি ইতিহাসের বই ছুঁড়ে ফেলে বলেছিলেন, ‘আমার ইতিহাস ভাল লাগে না। ভাল লাগে কবিতা।’ এমন প্রতিক্রিয়া দেখার পর শিক্ষকও বুঝে ফেলেন, মনোজ আর ১০টা সাধারণ শিক্ষার্থীর মত নন।

এ যাবৎকালে মনোজ দুই ডজনের বেশি সিনেমায় গান লিখেছেন। জিঙ্গেল করেছেন অসংখ্য বিজ্ঞাপনের। তিনি ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের থিম সং ‘দে ঘুমাকে’র রচয়িতা। রিয়েলিটি শো ‘কওন বানেগা ক্রোরপতি’র আবহ সঙ্গীতও করেছেন তিনি। বড় সিনেমার মধ্যে তাঁর নামের পাশে রাইস ছাড়াও আছে গাব্বার ইজ ব্যাক, পিকু, উংলি, বস ও সন অব সর্দার।

মনোজ বলেন, ‘আমার বাবা গ্রাম থেকে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন মুম্বাই। আমি ওয়ালপেইন্টিং ও ছোট খাটো প্রতিষ্ঠানের জন্য জিঙ্গেল বানানোর কাজ করতে থাকি। ২০১০ সালে লাক্সের বিজ্ঞাপনে কাজ করার পর আমি বলিউডে পা রাখি। ওই বিজ্ঞাপনে ছিলেন অভিষেক বচ্চন ও ঐশ্বরিয়া রায়। ওই সময় আমি ব্যাপারটাকে নিজের প্রচারণা হিসেবে দেখেছিলাম, তাই কোনো পারিশ্রমিক নেইনি। সেটাই ছিল আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর আমার সামনে ২০১১ বিশ্বকাপের থিম সং দে ঘুমাকে লেখার সুযোগ আসে। এরপর থেকে একটার পর একটা সুযোগ আসতেই থাকে।

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির জন্য মনোজের লেখা ‘কাম বলতা হ্যায়’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বলিউডে কাজ করার সুবাদে তিনি অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, শঙ্কর এহসান লয় ও প্রীতমের মত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

একবার ভাবুন তো, শৈশবে যদি তিনি প্রতিভার পথে না হেঁটে বাবা-মা ও শিক্ষকের মন মত চলতেন তবে কি হতো?

– কেনফলিওস.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।