শাহরুখ কী এখন স্ক্রিপ্ট না পড়েই সিনেমা করেন!

শাহরুখ খান— তিনি কিং অব রোমান্স, কিং অব বলিউড। তার ছবি মানেই বক্স অফিসে ধুন্ধুমার কাণ্ড। আপাতত নতুন করে আর কিছু বলতে চাই না। টানা ২৫ বছর ধরে রাজ কাজটা তিনি খুব ভালোভাবেই সামলে যাচ্ছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাদশা খানের সময়টা মোটেও সুখকর যাচ্ছে না। ইদানীং কিং খানের মুভি মানেই যেনো ভক্তদের হতাশা।

একটু পেছনে চোখ রাখা যাক, ২০১২ সালে মুক্তি পায় মহামতি যশ চোপড়ার শেষ চলচ্চিত্র ‘যব তক হ্যায় জান’। ওই ছবির কাহিনী আসলে আহামরি কিছু ছিলো না। কিন্তু বলিউড বাদশা বলে কথা। ছবিটি ২১১ কোটি রুপি আয় করেছিলো। পরের বছর মুক্তি পায় রোহিত শেঠি পরিচালিত ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’। পুরোপুরি কমার্শিয়াল ধাঁচের এই ছবিটি ৪০০ কোটিরও বেশি আয় করে। সম্ভবত এটাই শাহরুখ খানের সর্বশেষ ব্লকব্লাস্টার মুভি। এরপর ২০১৪ সালে আসে ফারাহ খানের ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’।

বিশাল অ্যারেঞ্জমেন্টের ফুলঝুরি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। কিন্তু বাদশার পাওয়ারে প্রথম দিনেই ছবিটি বক্স অফিসের অতীত সব রেকর্ড চুরমার করে ৪৫ কোটি রুপি ঘরে তোলে। যদিও এরপর সমানতালে এগুতে পারেনি। তারপরও ৩০০ কোটির ক্লাব পেরিয়ে যায় খুব সহজেই। ২০১৫ সালে আবারও সেই রোহিত শেঠি, ছবি ‘দিলওয়ালে’। সেই সাথে শাহরুখ-কাজল জুটির প্রত্যাবর্তন। গতানুগতিক প্রেম কাহিনী হলেও শাহরুখের জোরে ছবিটি সর্বসাকুল্যে ৩৫০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়।

একেরপর এক বস্তাপচা আর মানহীন গল্পের পর মোটামুটি ভালো গল্পের ‘ফ্যান’ মুক্তি পায় গত বছরের এপ্রিলে। মনীশ শর্মার এই সিনেমা কিছুটা আশা জাগানিয়া ছিলো। সমালোচকদের দ্বারা বেশ প্রশংসিতও হয়। অভিনয়ের বিচারে একটি আউটস্ট্যান্ডিং মুভি হলেও দূর্বল স্ক্রিনপ্লের কারণে বক্স অফিসে চমক দেখাতে ব্যর্থ। বাদশাহ খানের দাপটেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১০০ কোটি বাজেটের ছবিটি টেনেটুনে ১৫০ কোটি আয় করে। তাছাড়া ছবিটির বিরুদ্ধে একটি হলিউডি সিনেমা থেকে গল্প চুরির অভিযোগও রয়েছে। এরপর মুক্তি পায় আলিয়া ভাটের বিপরীতে গৌরি শিন্ডের ‘ডিয়ার জিন্দেগি’। থেরাপিস্ট জাহাঙ্গীর খানের ভূমিকায় শাহরুখ ছিলেন অনবদ্য। কিন্তু ছবিটিও বক্স অফিসে তেমন উত্তেজনা ছড়াতে পারেনি।

শেষমেশ, এই বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে মুক্তি পায় রাহুল ঢোলাকিয়ার ‘রইস’। গুজরাটের সন্ত্রাসী আবদুল লতিফের জীবনকাহিনী অবলম্বনে তৈরী এই ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করা শাহরুখকে নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন ক্রিটিকরা। ছবিটিতে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে সানি লিওনের একটি আইটেম গানও রাখা হয়। কিন্তু ছবিটি মোটামুটি ভালো হলেও ফিন্যান্সিয়ালি আশানুরূপ ফলাফল পায়নি। এই ছবির মাধ্যমেই পাকিস্তানি অভিনেত্রী মাহিরা খানের বলিউডে অভিষেক হয়। ছবিটি সুপারহিট না হওয়ার পেছনে অনেকে তাকে কিছুটা দায়ী করে থাকেন। ছবিটির বক্স অফিস কালেকশন ছিলো ২৫০ কোটির মতো।

যাই হোক, এতো কিছুর পরও শাহরুখ ভক্তরা মুখিয়ে আছেন। তাদের বিশ্বাস, শাহরুখ রাজকীয় হালেই ফিরবেন। স্ব-মহিমায় আবার জ্বলে ওঠবেন। তিনি আর এ ধরণের মানহীন ছবিতে নিজেকে জড়াবেন না। গত বছর শাহরুখ খানের ‘ফ্যান’ মুভিটি দেখার পর পরিচালক গোপাল ভার্মা বলেছিলেন, ‘শাহরুখ খানের একজন ভক্ত হিসেবে আমি ব্যথিত, কারণ তিনি যে ধরনের ছবিতে ইদানীং করছেন, তাতে তাঁর সুপারস্টার ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি জানি না তাঁর পরামর্শদাতা ও কাছের মানুষেরা উনাকে সঠিক বুদ্ধি দিতে পারছে কি না?’

এবার নতুন কাহিনীতে ফিরি, গত শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে শাহরুখ খানের ‘জব হ্যারি মেট সেজাল’। ‘রব নে বানা দে জোড়ি’ এবং ‘জব তক হ্যায় জান’-এর পর শাহরুখ এবং আনুশকা এই ছবিতে আবারও জুটি বেঁধেছেন। মুভিটি নিয়ে সমালোক-দর্কশকদের প্রত্যাশার পারদ কিন্তু খুব উঁচুতেই ছিলো। কিন্তু কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে তা ইতোমধ্যে আন্দাজ করা গেছে। তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে ছবিটি বক্স অফিসকে কতটা জমজমাট রাখতে পারে তা জানার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে চলুন, ছবিটিকে ব্যবচ্ছেদের টেবিলে নিয়ে যাই।

গুজরাটের মেয়ে সেজাল তার পরিবারের সঙ্গে ইউরোপ সফরে আসে। অ্যামস্টারডমের কোনো জায়গায় তার বাগদানের আংটি হারিয়ে যায়। হবু বরের আংটি না নিয়ে সেজাল কোনক্রমেই দেশে ফিরতে রাজি নয়। সুতরাং হারানো আংটির খোঁজে বেড়িয়ে পড়ে সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পাশে দাঁড়াতে হয় ট্যুরিস্ট গাইড ‘হ্যারি’কে। আংটি খোঁজার ছলে হ্যারি-সেজাল ঘুরে বেড়ায় পুরো ইউরোপজুড়ে। বুদাপেস্ট থেকে প্রাগ, সেখান থেকে পর্তুগালের লিসবন হয়ে ভিয়েনা, এরপর ইন্ডিয়া। নিজেদের লম্বা সফরে তারা অবিষ্কার করেন একে অপরকে। ধীরে ধীরে হ্যারি-সেজাল খুঁজে পায় জীবনের মানে। খুঁজে পায় ট্রু ভালোবাসা। ব্যস, এতটুকই!

একদম সাদাসিধে গল্প। সেই চেনা সুর, চেনা প্রেম। নতুনত্ব বলতে কিছু নেই। একটা বিষয় খুবই হাস্যকর যে শুধুমাত্র একটা আংটির জন্যই সেজাল ইউরোপে থেকে গেলেন। আর, শাহরুখও বাগদত্তা মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলেন। চিত্রনাট্য এতোটাই দুর্বল যে প্রথমার্ধ কিছুটা এগুলেও দ্বিতীয়ার্ধ যেনো কিছুতেই এগুতে চায় না। শুধু শুধু কোনো কারণ ছাড়াই এক ঘন্টার কাহিনীকে টেনে আড়াই ঘন্টার মতো করা হয়েছে।

প্রথমেই ডিরেক্টর ইমতিয়াজ আলির কথা বলে নিই। এই ভদ্রলোকের প্রত্যেকটা ছবিই আলাদা। তার নিজস্ব একটা স্বকীয়তা আছে। বিশেষ করে, তার ছবির প্রেমের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এজন্য শিক্ষিত শ্রেণীর দর্শকের কাছে তার বেশ গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। ‘জব উই মেট’ ‘রকস্টার’ ‘হাইওয়ে’ কিংবা ‘তামাশা’— তাঁর নির্মিত প্রতিটা ছবিই দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছে।

কিন্ত ইমতিয়াজ আলি যে শাহরুখের হিরোইজমটা এভাবে ডোবাবেন, কিংবা এমন একটা গল্পহীন সিনেমা বানাবেন সেটা সম্ভবত কারোর কল্পনাতেই ছিলো না। সবাই জানে ইমতিয়াজের সিনেমা মানেই দারুণ একটা গল্প। সাদামাটা হলেও তার নিজস্ব একটা ভাষা থাকে। থাকে গল্প বলার নিজস্ব ঢং, যা দর্শককের চোখকে পর্দায় ধরে রাখে। কিন্তু এই ছবিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইমতিয়াজকে দেখা গেছে। যেন আগের ছবিগুলোর সাথে তার কোনও যোগ নেই।

এই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তিশালী জায়গা হলো শাহরুখ-আনুশকার দুর্দান্ত রসায়ন। ৫০ পেরিয়ে গেলেও শাহরুখ আজও রোমান্স জগতের অলিখিত সম্রাট। ‘জব হ্যারি মেট সেজাল’-এর মধ্যদিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হলো। শুধু এই দু’জনের রোমান্স দেখার জন্য হলেও আপনি চাইলে আড়াই ঘন্টা পর্দায় চোখ ধরে রাখতে পারবেন।

শাহরুখের অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই। তিনি বরাবরই দুর্দান্ত। এই ছবিতে তাকে গত কয়েক বছরের তুলনায় একেবারে অন্য এক অবতারে পাওয়া যাবে। একটা কথা ক্রিটিকরা প্রায়শই বলে থাকেন— শাহরুখ যেন অনেকটা পুরনো মদের মতো, যত বয়স বাড়ছে তত নেশা ধরাচ্ছেন দর্শকদের। আসলে তা ঠিক, এই ছবিতে আবারও প্রমাণিত হলো। কিছুটা ন্যাকামোর কথা না বললে আনুশকা শর্মাও মোটামুটি সফলভাবে উতরে গেছেন।

ছবির গানগুলোর প্রতিস্থাপন বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। বলা নাই, কওয়া নাই, হুট-হাট গান শুরু হয়ে যায়। প্রীতম চক্রবর্তীর করা এই ছবির গান তেমন একটা কানে ধরে না৷ তবে আহামরি না হলেও সঙ্গীত মোটামুটি চলে। ‘হাওয়ায়ে’ ‘রাধা’ কিংবা ‘বাটারফ্লাই’ ইতোমধ্যে অনেকের প্লে লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে।

সবাই জানে ইমতিয়াজের সিনেমা মানেই অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি। এই ছবির প্রেক্ষাপট ইউরোপ হওয়ায় অ্যামস্টারডাম থেকে শুরু করে ইউরোপের নানা চোখ ধাঁধানো লোকেশন এবং শেষে পাঞ্জাবের নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ছবির গল্প। লোকেশনের সৎ ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেননি ইমতিয়াজ।

সবশেষে বলি, এই ছবিতে সবই আছে। নাচ, গান, রোমান্স। শুধু গল্পটাই যেনো নেই! তবে ছবিটিকে পুরোপুরি অখাদ্য বলা যায় না। শাহরুখ-আনুশকার রোমান্সের দেখার জন্য হলেও সিনেমাটি একবার দেখা যায়। তবে, এর বাদে সিনেমায় আর কিছু নেই। আবারো স্ক্রিপ্ট পড়ে বুঝেশুনে সিনেমা করার সময় চলে এসেছে শাহরুখের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।