শাকিবের নবাব, নবাবের ‘নবাবী’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র জগতের চলমান সংকট নিয়ে বলা যেতে পারে গোটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখন দুই ভাগে বিভক্ত। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘নবাব’ ও ‘বস টু’ নিয়ে মূলত আলোচনা নতুন করে তুঙ্গে উঠে। কেউ কেউ যৌথ প্রযোজনার সুফলগুলো মেলে ধরছেন, কেউবা আবার ‘যৌথ প্রযোজনা নাকি যৌথ প্রতারণা?’ এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন। যাই হোক, বহুল চর্চিত ওই বিতর্কে না গিয়ে শাকিব খানের আলোচিত ছবি ‘নবাব’র ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

এমন একটা থ্রিলার মুভির নাম ‘নবাব’ কেনো হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। ছবিতে শাকিব খানের নাম ‘নবাব’, শুধু নায়িকাই এই নামটা জানে। ব্যস এতেই ছবির নাম ‘নবাব’ হয়ে গেলো! এছাড়া এই নাম আর কেউ জানে না। পুরো ছবিতে রাজীব চৌধুরী নামেই পরিচিত।

পরিচালক জয়দীপ মুখার্জি জোর দিয়ে মৌলিক গল্পের সিনেমা দাবী করলেও কেউ কেউ বলছেন ‘নবাব’র সঙ্গে অন্য সিনেমার টুকরো টুকরো গল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে হিন্দি ছবি ‘সারফারোস’, আমির খানের ‘বাজি’ কিংবা শাহরুখ খানের ‘বাদশাহ’র সাথে নাকি বেশ কিছু অংশের মিল পরিলক্ষিত হয়। যাই হোক, বাণিজ্যিক ছবিতে কাহিনি মৌলিক, না ধার করা; এসব বেশি একটা বিবেচ্য নয়। বরং কাহিনি দর্শকের মনকে কতটা নাড়া দিতে পেরেছে, সেটিই বড় কথা, আমরা এবার সেদিকেই একটু চোখ বুলাই।

পেলে ভট্টাচার্যের লেখা এ ছবির চিত্রনাট্য মোটের উপর শক্তিশালী-ই বলা যায়। ভারী কোনও সংলাপ নেই। তবে দর্শকের হাততালি কেড়ে নেয়ার মতো একের পর এক টুইস্ট, থ্রিল আর সাসপেন্সে ভরপুর। শাকিব খানের কণ্ঠে কোনো ‘পাঞ্চ লাইন’ সংলাপ না থাকলেও ‘সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই, দেশ নেই, ওদের একটাই পরিচয়—ওরা সন্ত্রাসী’, ‘সাধারণ মানুষ কাজের মাধ্যমেই অসাধারণ হয়ে ওঠে’ কিংবা ‘দেশকে বাঁচাতে আমি একাই যথেষ্ট’ এ ধরণের মনোমুগ্ধকর সব সংলাপ ছবিটিকে বেশ প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

মূল গল্পে দেখা যায়, কলকাতায় সন্ত্রাসকর্ম বেড়েই চলেছে। যেখানে সেখানে হামলা হচ্ছে, খুন হচ্ছে। ঘটনাক্রমে মুখ্যমন্ত্রীর উপরেও একবার হামলা হয়, তাকে উদ্ধার করেন দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দক্ষ অফিসার রাজীব চৌধুরী ওরফে নবাব। এরপর সন্ত্রাস দমনে মুখ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টিম গঠিত হয়, শাকিব একাই পুরো টিমকে নেতৃত্ব দিয়ে যান। পরবর্তীতে বিভিন্ন চক্রান্তের মধ্য দিয়ে শাকিবকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। আর এভাবেই নানা টুইস্টে এগিয়েছে ছবির গল্প।

কমার্শিয়াল সিনেমার সাফল্যে মিউজিকের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ছবিতে আকাশ-স্যাভি জুটির মিউজিক ভালো ছিলো। গানগুলোর কথা ও কোরিওগ্রাফ মন্দ না। বিশেষ করে, ‘দেবো তোকে দেবো ষোল আনা’ এবং পার্টি সং ‘ও ডিজে…’ গান দুটি ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। তাছাড়া রোমান্টিক সং ‘যাবো নিয়ে…’ গানটিও অসাধারণ।

অ্যাকশন নিয়ে কিছু বলার নেই। থ্রিলার মুভি, সরাসরি ফাইটের চেয়ে গান ফায়ারিং বেশি। আসলে গল্পের প্রেক্ষাপট এমনটাই ডিজার্ভ করে।

শাকিব খান বরাবরই ভালো অভিনেতা, এতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশি পরিচালক-প্রযোজকরা এতদিন ঠিকঠাক পরিচর্যা করতে পারেননি। আগে অনেক ছবিতে পুলিশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি, কিন্তু এই সিনেমার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসার রাজীব চৌধুরীর চরিত্রটি তাকে নতুন আঙ্গিকে মেলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। খান সাহেব দিন দিন ভালোই পরিণত হয়ে উঠছেন।

শুভশ্রী অসম্ভব সুন্দর। ভালো অভিনেত্রীও বটে, কিন্তু অন্যান্য ছবির তুলনায় এ ছবিতে খুব একটা ভালো লাগেনি। তবে, গানের দৃশ্যগুলোতে তার গ্লামারাস উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে দর্শকদের। বিনোদন সাংবাদিক থেকে সদ্য ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে জয়েন করা দিয়া ব্যানার্জির চরিত্রেও কোনো অংশে কম যান না।

অপরাজিতা আঢ্যর কথা বলতে হয়, মুখ্যমন্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন। খরাজ মুখার্জিকে সাধারণত কমেডি চরিত্রেই বেশি দেখা যায়, শুধু কমেডি নয় বরং সবধরণের চরিত্রেই তিনি অনায়েসে ঢুকে যেতে পারেন, ডেপুটি চীফ মিনিস্টার অভয় সরকারের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করে আবারও এটা প্রমাণ করলেন। বাংলাদেশের অমিত হাসানও মন্দ না, ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। অন্যসব চরিত্রের ভিড়ে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন সাগ্নিক চ্যাটার্জি, এসিপি মাসুদ আখতার চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় মনে থাকবে অনেক দিন।

নবাব এন্টারটেইনমেন্টে ভরপুর একটা ঝকঝকে থ্রিলার মুভি। গেটআপ-মেকআপ, চোখ জুড়ানো কস্টিউম, খোঁচাখোঁচা দাড়ি, আকর্ষণীয় হেয়ার স্টাইল আর বাঁকানো গোঁফে শাকিব এক ভিন্ন অবতারে হাজির হয়েছেন। লোকেশন বলতে গেলে আহামরি কিছু ছিলো না, গল্পের সাথে চলনসই।  সিনেমাটোগ্রাফ, লাইটিং ও সাউন্ড কোয়ালিটি নিয়ে কথা নেই। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আরও ভালো করা যেতো। অ্যাকশন কম থাকায় ভিজুয়েল ইফেক্ট বেশি একটা চোখে পড়েনি। এই সিনেমায় সম্ভবত মোবাইলের ব্যবহারজনিত ভুলের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া আরো টুকটাক কিছু ভুল আছে, যেগুলো কমার্শিয়াল ছবিতে চোখে পড়ার মত নয়।

সবমিলিয়ে নবাব কেমন মুভি? দর্শকভরা সিনেমা হল, কিছুক্ষণ পরপর হাততালি, উল্লাসধ্বনি প্রমাণ করে ছবিটি খারাপ না। বরং গল্পের নিখুত গাঁথুনি আপনাকে দুই আড়াই ঘন্টা হলে বসিয়ে রাখবে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।