শরৎচন্দ্র ও বলিউড

উপমহাদেশে যে উপন্যাসটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তা হলো ‘দেবদাস’, সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ বার বিভিন্ন ভাষায় সেলুলয়েডের পর্দায় ভেসে উঠেছে দেবদাসের জীবন কাহিনী। শুধু বাংলা কিংবা হিন্দী নয়, তামিল, তেলেগু, মালায়ালাম, আসামী, এমনকি উর্দু ভাষায়ও নির্মিত হয়েছে এই সিনেমাটি। এখানেই শেষ নয়, এই উপন্যাসটি দিয়ে নির্মিত হয়েছে নির্বাক চলচ্চিত্রও।

বহুল আলোচিত এই উপন্যাসের রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের এই গুনী সাহিত্যিক উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে পেয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। বিশেষ করে বলিউডে দেবদাস ছাড়াও তার আরো কয়েকটা উপন্যাসদিয়ে নির্মিত হয়েছে কালজয়ী সব সিনেমা।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার বিমল রায়ের হাত ধরে বলিউডের জগতে প্রবেশ করে শরৎ সাহিত্য। ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পরিনীতা’ উপন্যাস অবলম্বনে অশোক কুমার ও মীনা কুমারীকে নিয়ে একই শিরোনামে ছবি নির্মান করেন। এই ছবির সাফল্যের পর পরপর বিরাজ বাহু (১৯৫৪) ও দেবদাস (১৯৫৫) নির্মান করেন। দুটিই সেরা হিন্দি ছবির জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। হিন্দিতে এটা ‘দেবদাস’ নিয়ে করা দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, এতে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন ও বৈজয়ন্তীমালা। পরবর্তীতে ২০০২ সালে একই উপন্যাস থেকে অনুপ্রানিত হয়ে শাহরুখ খান, মাধুরী দীক্ষিত, ঐশ্বরিয়া রায়কে নিয়ে সঞ্জয় লীলা বানসালি নির্মান করেন ‘দেবদাস’।

মূল কাহিনী থেকে কিছুটা সরে আসায় সিনেবোদ্ধাদের কাছে সমালোচিত হলেও দারুন জনপ্রিয়তা পায় ছবিটি,সেরা জনপ্রিয় ছবি সহ একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি সেই বছর ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করে। এরপর ২০০৯ সালে এই উপন্যাস কেই আধুনিক প্রেক্ষাপটে রুপ দেন অনুরাগ কশ্যপ, অভিনয় করেছিলেন অভয় দেওল, মাহি গিল ও কালকি কোচলিন। এছাড়া সুধীর মিশ্রের নির্দেশনায় একই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে রাহুল ভাট, রিচা চাড্ডা ও অদিতি রাও হায়দারী অভিনিত ‘অওর দেবদাস’।

এছাড়া বিমল রায়ের পর প্রদীপ সরকারের হাত ধরে আবার উঠে আসে ‘পরিনীতা’র কাহিনী। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন নবাগত বিদ্যা বালান, সাইফ আলী খান, রাইমা সেন ও সঞ্জয় দত্ত।

১৯৬৭ সালে, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় নির্মান করেন ‘মেজলি দিদি’, এটি নির্মিত হয় ‘মেজ দিদি’ উপন্যাস থেকে, মূল ভূমিকায় ছিলেন মীনা কুমার ও ধর্মেন্দ্র। রাজেশ খান্না ও শর্মিলা ঠাকুর জুটির জনপ্রিয় ছবি ‘ছোটি বাহু’ নির্মিত হয় ‘বিন্দুর ছেলে’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রানিত হয়ে, যদিও ছবিটি ছিল একটি তেলেগু ছবির পুন:নির্মান। স্বনামধন্য গীতিকার, চলচ্চিত্রকার গুলজার, ১৯৭৫ সালে ‘পন্ডিত মশাই’ অবলম্বনে নির্মান করেন ‘খুশবু’, অভিনয় করেছিলেন জিতেন্দ্র, হেমা মালিনী।

বাসু চ্যাটার্জীর পরিচালনায় সেলুলয়েডের পর্দায় শরৎ বাবুর সৌদামিনী হয়ে উঠেছিলেন শাবানা আজমী, বিখ্যাত উপন্যাস ‘স্বামী’ অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি, এছাড়া আরো অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত, বিক্রম। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ছবির জন্য সেরা কাহিনীকার হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে বাসু চ্যাটার্জীই শাবানা আজমী ও অমল পালেকর কে নিয়ে ‘নিষ্কৃতি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মান করেন ‘আপনে পারায়ে’।

এই ছিল শরৎ সাহিত্যের বলিউড যাত্রা,বর্তমান সময়ে সাহিত্য নিয়ে বলিউডে আগের মত কাজ হয় না, যা-ও হয় তাতে বাংলা সাহিত্য অগোচরেই থেকে যায়, ওনার উপন্যাস ‘গৃহদাহ’ ও ‘শ্রীকান্ত’ নিয়েও দারুণ সিনেমা হতে পারে। বলিউড বিষয়টা একটু ভেবে দেখতে পারে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।