শতভাগ বিনোদনের সাথে শান্তির বার্তা

বছরের বহুল প্রত্যাশিত ছবি ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারহিট ‘এক থা টাইগার’ ছবির সিকুয়েল এটা। তবে এবার ডিরেকশনে আছেন আলী আব্বাস জাফর। প্রথম পর্ব ডিরেক্ট করেছিলেন কবির খান। অন্যদিকে এ বছরটা বলিউডের জন্য মোটেও ভালো ছিলো না। তাই বছর শেষে সবার চোখ এই ছবির দিকে। রেকর্ড সৃষ্টিকারী ট্রেলার ,সুপারহিট গান ,মুভির হাইপ সবকিছু মিলে আগাম দূর্দান্ত কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিলো।

এজেন্ট টাইগার এবং জয়া ইউরোপ এর বরফ ঢাকা কোনো এক এলাকায় থাকে। এদিকে ইরাকে ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠন আই এস ই র লিডার আবু উসমান ৪০ জন নার্সকে বন্দি বানিয়ে ফেলে যেখানে ২৫ জন ভারতীয় এবং ১৫ জন পাকিস্তানি ছিল। এমন একটি ঘটনা নিয়েই সিনেমাটি সাজানো।

টাইগারের ভুমিকায় সালমান খান ছিলেন দূর্দান্ত। হলিউডে র‍্যাম্বোর চেয়ে কম নয় বলিউডের টাইগার। ক্লাইমেক্সে শার্টলেস সালমান কে দেখে আপনি বিশ্বাস ই করতে পারবেন না যে কয়েক দিন পর লোকটার বয়স ৫২ পেরোবে।

জয়া চরিত্রে ক্যাটরিনা কাইফ সালমানের সাথে পাল্লা দিয়ে দূর্দান্ত সব অ্যাকশন করেছেন। ওনার অভিনয়ের ও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ভিলেন চরিত্রে সাজ্জাদ দিল আফরোজ জাস্ট অসাধারণ। পরেশ রাওয়াল স্যারের অসাধারণ অভিনয় দর্শক অনেকদিন মনে রাখবে। সহযোগী অভিনেতারাও যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছে।

মুভির প্লট একটি রিয়েল লাইফ ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। কিন্তু মুভিতে এর সাথে আরো অনেক গুলো সাবপ্লট ও আছে। একটা মিশনকে টার্গেটে রেখে অনেক কিছু দেখিয়েছেন পরিচালক। দেশপ্রেম,মানবতা, সিরিয়া-ইরাকের রাজনৈতিক অবস্থা, সেখানকার নারীদের ওপর নির্যাতনের নমুনা, মানুষের অসহায়ত্ব, ভারত-পাকিস্থানের মেলাবন্ধন ইত্যাদি বিষয় মুভিতে খুব ভালো ভাবে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে গল্প কিছুটা ছন্দ পতন করেছে এবং গল্পে থ্রিলের অভাব ছিলো। ফার্স্ট হাফে গল্পটা একটু স্লো মনে হলেও সেকেন্ড হাফে আপনি পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারবেন না। মুভিতে ভারত -পাকিস্থান সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে ।

লেখক নিলেশ মিশ্র ও আলি আব্বাস জাফর এই ছবিতে অ্যাকশন, আবেগ ও দেশপ্রেমের সাথে হালকা কমেডি এবং রোমান্সের টাচ রেখেছেন। বিশেষ করে টাইগার ও জয়ার রোমান্স খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। চিত্রনাট্য ভালো ছিলো তবে থ্রিল এবং টুইস্ট কম ছিলো। তবে সব বিবেচনা করলে এক থা টাইগারের সিকুয়েল হিসেবে ছবিটি নামের প্রতি সুবিচার করেছে।

ছবির ডায়লগ উচ্চমানের এবং মার্জিত ছিল। কিছু কিছু ডায়লগ দর্শকদের শীষ দিতে বাধ্য করবে। আলি আব্বাস জাফর এর ডিরেকশন প্রশংসাযোগ্য। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি পরিচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে যা দেখে দর্শক কখনো হাসবে কখনো কাঁদবে। আলি আব্বাস জাফর ছবিটির মাধ্যমে একধরণের শান্তির বার্তা সবার মধ্যে পৌঁছে দিয়েছেন।

এক থা টাইগার যখন এসেছিলো তখন সেখানে এমন টাইপের অ্যাকশন দেখানো হয়েছিলো যা তখন বলিউডে একদম নতুন ছিলো। এবার ও তাই হয়েছে, টাইগার জিন্দা হ্যায় অ্যাকশন হলিউডের কোনো ছবির তুলনায় কম মনে হয় নি। দারুন ভাবে অ্যাকশন পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেকড়ের সাথে ফাইট, ক্লাইমেক্সের ফায়ার করা, স্টান্ট, সালমান-ক্যাটরিনার ফাইট সবগুলো ছিলো দারুণ। নিঃসন্দেহে বলিউডের সেরা অ্যকশনের কাজ করা হয়েছে এই ছবিতে ।

টেকনিক্যাল দিক দিয়ে এই ছবি বলিউডের অন্যতম সেরা ছবি। ছবির সিনেমাট্রোগ্রাফি, ভিএফএক্স-এর কাজ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, লোকেশন সবকিছু আপনাকে মুগ্ধ করবে। দর্শকদের জন্য একপ্রকার ভিজুয়াল ট্রিট বলা যায় এটাকে ।

আলী আব্বাস জাফর অনেক বিগ স্কেলে এই ছবি নির্মান করেছেন আর প্রোডাকশন হাউজ ইয়াশরাজ ফিল্মস ও কোনো দিকে কমতি রাখেননি। মার্চিনের সিনেমাটোগ্রাফি, রামেশ্বর ভগতের এডিটিং ও টম স্ট্রুদার্সের অ্যাকশেন পুরো ছবি

জুড়ে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। তাদের কাজ ছিল আন্তর্জাতিক মানের।

ভিশাল-শেখরের সঙ্গিতায়োজনে সবগুলো গানই ভালো ছিল। ‘সোয়াগ সে সওগাত’ এবং ‘দিল দিয়া গাল্লা’ অলরেডি সুপারহিট হয়ে গেছে। মুভি দেখার সময় নুর কিংবা দাতা তু গানগুলো ও অনবদ্য লাগবো। গানগুলো সিচুয়েশনাল ছিলো।

বলিউডের সিকুয়েল মানেই সবাই মনে করে প্রথমটার ব্রান্ড ভ্যালু ব্যাবহার করে ব্যবসা করার প্রয়াস, আর যা ইচ্ছা তা বানিয়ে প্রথমটার সম্মান নষ্ট করা। কিন্তু টাইগার জিন্দা হ্যায় ছিল পুরো ব্যতিক্রম। টাইগার ব্র্যান্ডকে একটুও নিচে নামায়নি। বরং, দ্বিতীয় পর্ব টাইগার সিরিজকে আরো বড় করে তুলেছে । নতুন মাত্রার সব কিছু ব্যবহার করে টাইগার সিরিজকে বলিউডে অন্য এক স্তরে তুলে দিয়েছে।

সবশেষে এটাই বলবো টাইগার জিন্দা হ্যায় ফুল এন্টারটেইনিং প্যাকেজ। একটি সম্পূর্ণ মসলাদার ছবিতে যা যা থাকা উচিত তার সবই আছে টাইগার জিন্দা হ্যায় তে। সাথে আছে সুন্দর একটা বার্তা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।