শতবর্ষেও আসবেন না আরেকজন হুমায়ুন ফরীদি!

কোনো একটা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। সঞ্চালক প্রশ্ন করলেন, নিজের ব্যাপারে আপনার অভিব্যক্তি কি? তাঁর বরাবরের মতই সোজা সাপ্টা জবাব, ‘আগামী ১০০ বছরেও বাংলাদেশে দ্বিতীয় ফরীদির জন্ম হবে না!’

সত্যি মৃত্যুর ছয়টি বছর কেটে যাওয়ার পরও তাঁর জায়গা কেউ নিতে পারেনি। নতুন একজন হুমায়ুন ফরীদি পাওয়া তো দূরের কথা, তাঁর ধারের কাছেই কেউ আজ অবধি পৌঁছাতে পারেননি। আদৌ কেউ কখনো কেউ পারবে কি না সন্দেহ!

সেই উত্তাল ১৯৫২ সালে তাঁর জন্ম, ঢাকার নারিন্দায়। টেলিভিশনের পর্দায় খল চরিত্র করে দিনের পর দিন হল মাতিয়ে রাখা এই মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবের নায়ক। দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। কখনো সেসব নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। সনদেরও প্রয়োজন বোধ করেননি কখনো।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবচেয়ে সব্যসাচী প্রতিভা তিনি। যখন যেখানে ছুঁয়েছেন, সেখানেই ফুটেছে ফুল। কি অসাধারণ তাঁর অভিনয় দক্ষতা, কি নিখুঁত, কি মোহনীয়! ৮০-র দশকে বিটিভির সাদাকালো যুগে তিনি দাপট দেখিয়েছেন, সিনেমায় নিজেকে নিয়ে গেছেন কিংবদন্তির কাতারে। আমরা যারা ৮০ বা ৯০-এর দশকে বড় হয়েছি, তাঁরা খুবই সৌভাগ্যবান যে চোখের সামনে এই মানুষটার একের পর এক ক্যারিশম্যাটিক চরিত্র দেখতে পেয়েছি।

তাঁর শুরুটা হয়েছিল মঞ্চ নাটক দিয়েই। ফরীদিরা চার ভাই-বোন। তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। তিনি ১৯৬৫ সালে পিতার চাকরীর সুবাদে মাদারিপুরের ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মঞ্চে প্রথম অভিনয় করেন মাদারীপুরেই। নাটকের নাম ছিল ‘মুখোশ যখন খুলবে’।

সেখানে তাঁর গুরু ছিলেন নাট্যকার বাশার মাহমুদ। বাশার মাহমুদের শিল্পী নাট্যগোষ্ঠী নামের একটি সংগঠনের হয়ে ফরীদি ‘টাকা আনা পাই’, ‘দায়ী কে’, ‘সমাপ্তি’, ‘অবিচার’, ‘ত্রিরত্ন’সহ ছয়টি মঞ্চ নাটকে অংশ নেন।

এরপর অবশ্য তাঁকে মাদারীপুর ছেড়ে বাবার চাকরীর সুবাদে চলে আসতে হয় চাঁদপুর। সেটা ১৯৬৮ সালের কথা। চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর পাঁচবছর তার শিক্ষাজীবন বন্ধ থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল, দেশ ছিল উত্তাল। যুদ্ধ শেষে নিজেও খানিকটা বাউণ্ডুলে হয়ে গিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ফরীদির ক্যারিয়ারে বড় অবদান আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীনগর নাট্যোৎসবে তিনি ছিলেন অন্যতম আলোচিত মুখ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে থাকা থিয়েটারের সদস্যপদ পেয়ে যান। ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনে যোগ দিয়ে ফরীদির প্রথম নাটক- শকুন্তলা। অভিনয় করেন তক্ষক চরিত্রে। মঞ্চে অভিনয়ের ইতি টানেন ১৯৯২ সালে।

এর আগেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে গেছেন ছোট ও বড় পর্দায়। টেলিভিশনে এই গুণী অভিনেতার অভিনীত প্রথম নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর পরিচালনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’। সংশপ্তক নাটকের ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রটির মোহ বাঙালি আজো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। হঠাৎ একদিন, পাথর সময়, কোথাও কেউ নেই – নাটকগুলোতেও তিনি ছিলেন অনন্য।

বড় পর্দায় প্রথম অভিনয় করেন ১৯৮৫ সালে শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’ চলচ্চিত্রে। কালক্রমে জনপ্রিয়তা পান খল চরিত্রে। তাঁর প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ‘দিনমজুর’, মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম বাণিজ্যিক সিনেমা ‘সন্ত্রাস’- দু’টিতেই পরিচালনায় ছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকন। বীর পুরুষ, দুর্জয়, শাসন, মায়ের অধিকার, জয়যাত্রা, ভণ্ড, ব্যাচেলর – ইত্যাদি তাঁর আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কাজ করেছেন প্রায় শতাধিক সিনেমায়।

ব্যক্তিজীবনে তিনি স্বল্পাহারী। তবে, ভোজনরসিক। কম কম করে হলেও তিনি চার-পাঁচবার খেতেন। খেলাধুলার ভক্ত ছিলেন। আর সেটা কেবলই ক্রিকেট নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষবেলায় একবার ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসের খেলাধুলার সেকশনে এক পাঠকের ফোন আসলো। ফোন ধরলেন ক্রীড়া সম্পাদক। পাঠক প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, উইম্বলডনটা কবে শুরু হবে?’ আজকের দিনে দেশে টেনিস খুব জনপ্রিয় হলেও ওই সময়ের চিত্রটা এমন ছিল না। তাই ক্রীড়া সম্পাদক খানিকটা অবাকই হলেন। উত্তর দিয়ে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা আপনি কে বলছিলেন? নির্বিকার জবাব আসলো, ‘আমি হুমায়ুন ফরীদি।’

মজার ব্যাপার হল, এই অভিনেতার আসল নাম হল হুমায়ুন কামরুল ইসলাম। তার নামের সাথে তিনি ‘ফরীদি’ যোগ করেন মায়ের নাম থেকে। মায়ের নাম ছিল ফরিদা ইসলাম।

‘উত্থান পতন’ সিনেমায় তাঁর একটা ডায়লোগ ছিল – ‘আমারে যারা আইজ চিনো নাই কাইল চিনবা, কাইল না চিনলে পরশু চিনবা চিনতেই হইব নাম আমার রমজান আলী।’ হ্যা, সত্যিই তাই! দেরীতে হলেও তাঁকে চিনেছে বাংলাদেশ, মৃত্যুর এতগুলো বছর বাদে তিনি পেতে যাচ্ছেন একুশে পদক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।