লেখক হিসেবে আমি ১০০% সার্থক: ঝংকার মাহবুব

ভিন্ন ধারার একজন তরুণ লেখক হিসেবেই মূলত পাঠকসমাজে পরিচিতি পেয়েছেন ঝংকার মাহবুব।  বুয়েট থেকে পাশ করে, নর্থ ডাকোটা স্টেট্ ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করে বর্তমানে শিকাগো শহরে সিনিয়র ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। তবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে দিব্যি লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন এই লেখক। এবারের বইমেলায় আদর্শ প্রকাশনী থেকে তার দু’টি বই প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর প্রকাশিত বই দুটির পাশাপাশি আরো নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেই তাঁর মুখোমুখি হয়েছে অলিগলি.কম

কেমন আছেন ?

– চমৎকারের খুবই কাছাকাছি।

হা হা। পুরাপুরি চমৎকার না কেন?

– ভালো লাগার কিছু পার্সেন্টেজ, শীতের কামড়ে, মশার সংগীতে খেয়ে ফেলেছে তো, তাই।

উপমহাদেশীয় লেখকদের মাঝে গল্প- কবিতা লিখবার প্রবণতাই বেশি। অথচ আপনার অধিকাংশ বইগুলো প্রোগ্রামিংকে ঘিরেই । অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দেবার জন্যই কি লিখবার জন্য এই বিষয়বস্তুকে বেছে নিয়েছেন ?

– ভাইরে, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখে সুবিধা করে উঠতে পারিনি বলেই সুযোগের অভাবে প্রোগ্রামিং নিয়ে লিখি। একবারতো সাহস করে একটা ছড়া লিখেই ফেলছিলাম। এক ক্লোজ ফ্রেন্ড মন্তব্য করছে- দোস্ত, এক কাজ কর। কিছুদিনের জন্য ছড়া লেখা বন্ধ রাখ। ভাগ্যিস তখন ইমো ছিল না। নচেৎ ইমো খেতে খেতে কিমা হয়ে যাইতাম।

গল্প কবিতা লিখতে না পারলেও প্রোগ্রামিং নিয়ে লিখতেছি দুইটা কারণে –

এক, পাঠ্য বইতে যতোটুকু আছে সেটা দিয়ে প্রোগ্রামার হওয়া যায়। যারা কম্পিউটার সায়েন্স পড়তেছে না। তাদের জন্য একদম রাস্তা নাই। আবার যারা সাধারণ মানের স্টুডেন্ট তারা ইংরেজি বই বা ইংরেজি টিউটোরিয়াল দেখেও জিনিসগুলা হজম করতে পারে না।

দুই, পাঠ্য বইয়ের বাইরে যতভাবেই আমরা শিখি না কেন, সব কিছুই কটমটে টাইপের। একটা বই পড়ে বা একটা কিছু শিখে আজ পর্যন্ত কেউ বললো না। বাহ্ মজা পাইছি। একটা সিনেমা দেখে একটা নাটক দেখে বা ভালো একটা উপন্যাস পড়ে যে তৃপ্তি আসে সেটা প্রোগ্রামিং শিখতে গেলে বা অন্য কিছু শিখতে গেলে আসে না। এই জায়গাটা, এই গ্যাপটা একটু পূরণ করতে চেয়েছি।

মেইন কথা হচ্ছে- কমেডি করার চেষ্টা করেছি তেমন সুবিধা করতে পারিনি। গল্প লেখার চেষ্টা করেছি, ব্যাটে-বলে লাগেনি। তাই প্রোগ্রামিংয়ের মতো কাট খোট্টা জিনিসে একটু আড্ডা, মজা আনার জন্যই প্রোগ্রামিং নিয়ে বই লেখা।

আপনার বইয়ের নামগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। যেমনঃ হাবলুদের জন্য প্রোগ্রামিং, প্রোগ্রামিং এর বলদ টু বস ইত্যাদি। এই অদ্ভুত সব নামকরণের রহস্যটি যদি বলতেন।

– যারা ভালো স্টুডেন্ট তাদেরকে লোহা দিলেও খেয়ে হজম করে ফেলবে। টিচার ক্লাসে কিচ্ছু না পড়ালেও তারা হায়েস্ট পেয়ে যাবে। আর যারা পরীক্ষার খাতায় কয়েকটা নম্বরের কমতির জন্য গাধা, হাবলু, বলদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা কি করবে? তারা যেহেতু চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে পছন্দ করে তাই চায়ের দোকানের আড্ডার স্টাইলে এই বইগুলো লেখা হয়েছে।

আর একদম যারা কিছু জানে না তাদের যে উপমা ধরে উপহাস করা হয় সেই লেভেল থেকে উঠিয়ে আনার জন্যই এই বইগুলো লেখা। তাই এইগুলার নাম হাবলুদের জন্য প্রোগ্রামিং। প্রোগ্রামিংয়ের বলদ টু বস। যাতে হাবলু, বলদরা নিজেদের কানেক্ট করতে পারে। আর চাল্লু পোলাপানরা দূরে থাকে।

এবারের বইমেলায় আপনার দুটি বই বের হচ্ছে। রিচার্জ ইওর ডাউন ব্যাটারি এবং প্রোগ্রামিং এর চৌদ্দগোষ্ঠী। একই বইমেলায় দুটি বই বের করা একজন তরুণ লেখক হিসেবে কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

– লাল সুতা বের হয়ে গেছে।

কিছু একটা লিখার আগে, কোন আইডিয়া মাথায় আসলেই সেটা আমার স্ত্রীর সাথে শেয়ার করি। সে ইনস্ট্যান্ট ফিডব্যাক দেয়। তাই অবিবাহিত লেখকদের বলি- দ্রুত বিয়ে করে ফেলো। তারপর অল্প একটু লেখা হলেই সেটা কাছের বন্ধুদের দেই। এই অংশ ফিডব্যাক দেয়ার জন্য। একটা বইয়ের জন্য কিছুদিন করার পর আবার পরের বইতে যাই।

বই প্রোগ্রামিংয়ের জন্য হোক বা জীবন চেইঞ্জ করার জন্য হোক, বইতে ক্যারেক্টার আছে, গল্প আছে, পার্সোনালিটি আছে। তার মাঝে মাঝে হিউমার, চালাকি, ঢিলামি আছে। যাতে বইটা উপভোগ করতে পারে। একটা জার্নি থাকে যাতে পাঠক বই পড়তে পড়তে সামনে এগুতে পারে। বইয়ের ভিতরে নিজেকে দেখতে পায়।

তাই দুইটা বইয়ের পটভূমি, চরিত্র আলাদা রেখে তাদের ভিতরে প্রবেশ করে বুঝতে একটু সময় দেয়া লাগছে। আর বইমেলা যেহেতু এক সাথেই শুরু হয়ে গেছে। তাই লাস্টের দিকে আরেকটু বেশি প্রেসার পড়ে গেছে। তবে প্রেসার সমস্যা না। প্রেসার না দিলে বাঙালি সোজা হয় না।

বই দু’টোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। একটি প্রোগ্রামিং কেন্দ্রিক এবং অন্যটি মোটিভেশানাল। দু’টোর মাঝে কোন বইটি নিয়ে বেশি আশাবাদী এবং কেন?

– রিচার্জ ইওর ডাউন ব্যাটারি বইটা যাদের লাইফের ব্যাটারি একটু ডাউন খেয়ে গেছে তাদের জন্য। এদের অনেকেরই অনেক কিছু করার মতো শক্তি, সামর্থ, মেধা আছে। হয়তো বন্ধুত্বের ভাইরাসে ধরে, কিংবা ছুতার জং, ভালো না লাগা রোগের কারণে একটু ঝিমিয়ে গেছে। এখন একটু ঝাকি দিয়ে লাইফটাকে লাইনে আনার জন্য এই বই। প্রায় চল্লিশটা সিচুয়েশনে এই বই কাজে লাগবে। বইটা রকমারি প্রি অর্ডার বেস্ট সেলার। তাছাড়া বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে আদর্শ প্রকাশনীর স্টলে ৩২৬, ৩২৭, ৩২৮।

‘প্রোগ্রামিংয়ের চৌদ্দগোষ্ঠী’ বইটা হচ্ছে ওদের জন্য যারা প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক জিনিসগুলা জানে। দুই-একটা বইও পড়ছে। কিন্তু বুঝে উঠতে পারতেছে না তারপর কি করবে? আর কী কী জানলে একজন পরিপূর্ন প্রোগ্রামার হতে পারবে? কী কী করলে প্রোগ্রামিংয়ের চাকরির জন্য এপ্লাই করতে পারবে? কতদিন লাগবে? গুগল মাইক্রোসফট, ফেইসবুকের মতো বড় বড় কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার জন্য কি কি করা লাগবে? এপ্লাই করে যাচ্ছি কিন্তু ইন্টারভিউতে কল পাচ্ছি না, কি করবো?

এই প্রশ্নগুলোর যাদের মাথায় দীর্ঘদিন ধরে কুট কুট করে কামড়ে যাচ্ছে তাদের জন্য এই বই ‘প্রোগ্রামিংয়ের চৌদ্দগোষ্ঠী’।

গত বছর ছেলেমেয়েদের প্রোগ্রামিং শেখাবার জন্য একটি ইভেন্টের আয়োজন করেছিলেন। এবারো কি এরকম কিছু করবার ইচ্ছে রয়েছে? আর এসকল ইভেন্ট দিয়ে ছেলেমেয়েদের ঠিক কতখানি প্রোগ্রামিং শেখাতে পারা যাচ্ছে বলে মনে করেন?

– এই ইভেন্টের কাজ হচ্ছে, যারা শুরু করি করি বলে শুরু করছে না তাদেরকে দিয়ে শুরু করিয়ে দেয়া। যারা শিখতে চাচ্ছে তাদের রাস্তাটা দেখিয়ে দেয়া। দেখা যায় শুরু করে ২৫০০জন আর প্রথম সপ্তাহের কাজ শেষ করছে ৩০০জন। এর ভিতর চার সপ্তাহ পরে ফাইনাল কোড সাবমিট করতেছে ৭০ জন। কতজন করতেছে সেটা ইম্পরট্যান্ট না। ইম্পরট্যান্ট হচ্ছে- যদি একজনও করে, তাকেই আগ্রহী করে তোলা। তারপর তার কাজ সে চালিয়ে নিবে। কিছুদিন আগে একজন ইমেইল করে জানিয়েছে এক বছর সে এই কম্পিটিশন করার পর তার চেষ্টা চালিয়ে গেছে তারপর জুমশেপার নাম একটা কোম্পানিতে চাকরিতে জয়েন করেছে। এই একজনই আমার অর্জন।

এই বছর একটু অন্যভাবে করার ইচ্ছা। অনেকেই স্কিল ডেভেলপ করতে চায়। তাদের জন্য ‘Boost up your skill’ নামে একটা শিখার প্রতিযোগিতা। শুরু করবো। শিগ্রই ঘোষণা আসবে।

একজন লেখক হিসেবে নিজেকে কতটুকু সার্থক বলে মনে করেন?

লেখক হিসেবে আমি ১০০% সার্থক। ইনফ্যাক্ট, যত লেখকের বই ছাপানো হয়েছে তারা সবাই ১০০% সার্থক। বই বিক্রির সংখ্যা দিয়ে আমরা বিচার করি। বেস্ট সেলার বলি। কিন্তু এমন অনেক বিখ্যাত লেখক আছেন, এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পী আছেন যারা জীবিত অবস্থায় তেমন বই বিক্রি করতে পারেননি। মরনের পর পুরস্কার পেয়েছেন। তাদের বই কোনভাবেই খারাপ বলা যাবে না।

একজন লেখক একটা গল্প, একটা মেসেজ দিতে চেয়েছেন। লেখকের কাজ হচ্ছে লেখা। সেটা লেখা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা। ফুটিয়ে তুলে নিজের ভিতরে তৃপ্তি যখন ফুটে উঠবে তখনই একজন লেখক সার্থক। তারপর সেটা কতজনের কাছে পৌঁছাবে, সেই দায়িত্ব যায় প্রকাশকের উপরে, বাংলা একাডেমির উপরে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।