লাল দূর্গের শেষ রাজা ও সিআইএ’র ৬৩৮ টি ব্যর্থ মিশন

বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ও বিচক্ষণ স্পাই এজেন্সি হল সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ। হলিউডের সিনেমায় সিআইএ নিয়ে যা দেখা হয়, তার কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও এই বাহিনীর সদস্যদের অনেকেই অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখেন।

সহজ ভাষায় বললে, সিআইএ হল দুনিয়ার একমাত্র স্পাই এজেন্সি যারা হুকুম পেলে গোটা বিশ্বর ৯০ শতাংশ রাষ্ট্রপ্রধানদের বেড রুমে চলে যেতে পারেন। চাইরে মেরেও ফেলতে পারেন। তাদের নেটওয়ার্ক কত বড় সেটা ঠিক আমাদের অনুমানেরও বাইরে।

সামান্য একজন মুচি, হোটেল বয় থেকে শুরু করে কর্পোরেট, সরকারি অফিস, আর্মি- নেভি- এয়ার, পার্লামেন্ট, শিল্পপতি – সবাই আছে তাদের লিস্টে। গোটা ‍বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নেটওয়ার্কের সবাই সিআইএ থেকে কোনো না কোনো ভাবে উপকৃত হয়, সেটা ডলার হতে পারে বা অন্য কিছুও হতে পারে।

এসব কিন্তু কোনো গালগল্প নয়, সিআইএ’র সাবেক কর্মীদের বিখ্যাত সব বই খুঁজে পাবেন ইন্টারনেটে। ডকুমেন্টারি পাবেন ইউটিউবে। সেখানেই এসবের ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই এজেন্সির বাজেট রীতিমত আমেরিকান সিনেটে পাস হয় ‘ব্ল্যাক বাজেট’ হিসেবে। কারণ, এটা কখন কোথায় কিভাবে ব্যয় হবে তার পুরোটাই গোপনীয়।

তবে, এত আয়োজনের পরও একজন মানুষ বরাবরই সিআইএ-কে বোকা বানাতে পেরেছেন। বরাবরই তার সামনে এসে বানচাল হয়ে যেত সিআইএ’র সকল পরিকল্পনা। তিনি হলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো – কিউবার প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান।

রোন্যাল্ড রিগ্যান যখন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হন, তখন তিনি কিউবার পিছনে ভালোভাবে লেগে থাকার সুযোগ পান। একে তো তখন কিউবায় আমেরিকার পুতুল বাতিস্তার দিন শেষ, তার ওপর আমেরিকান কোম্পানির রাষ্ট্রীয়করন চলছে কিউবায়। রিগ্যান তাই নাছোঁড়বান্দা।

সিআইএ-এর প্রধানকে ডেকে পাঠালেন। হুকুম দিলেন, ‘আই ওয়ান্ট হিম গন!’ সিআইএ এমন হুকুম শুনে অভ্যস্ত।  নাওয়া-খাওয়া ভুলে তারাও তাই ক্যাস্ত্রোর নাগাল পাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে।

একবার শেভিং ফোম পাঠানোহয় কুরিয়ারে। ফোমের ভেতরে মেশানো ছিল বিষ। ডেলিভারি হইছে ক্যাস্ত্রো নয়, তার দারোয়ানের কাছে। মিশন ফেইলড।

ক্যাস্ট্রো বরাবরই অনেক ভালো ডাইভার ছিল। সিআইএ তার স্কুবা গিয়ারে বিরল সামুদ্রিক বিষ ঢুকিয়ে পাঠিয়ে দেয়, যাতে সেটা তার জাহাজে থাকে। সেবার ক্যাস্ত্রো ওই গিয়ারই পরলেন না। ব্যর্থ হল সিআইএ’র আরেকটি প্রচেষ্টা।

ক্যাস্ত্রোর সিগার ছিল আইকনিক একটা ব্যাপার। তাকে এই সিগারকে ছাড়া কল্পনা করা দুস্কর। সবসময় মুখে সিগার থাকতো। তার কল্যানেই বিখ্যাত হয়ে যায় হাভানা সিগার।

একবার সিআইএ হুবহু হাভানা সিগার বানিয়ে তার মধ্যে দিয়েছিল এলএসডি বিস্ফোরক। ঠোটে নিয়ে আগুন জ্বালালেই বুম। পুরো এক প্যাকেট পাঠানো হয়, অনেক ফন্দী-ফিকির করেই পাঠানো হয় উপহার হিসেবে।

লাভ হয়নি। ক্যাস্ত্রোর হাতে পৌঁছানোর আগেই কিউবার সিক্রেট সার্ভিস (ইনটেলিজেন্স ডিরেক্টোরেট) সেটা ধরে ফেলে। আবারো মিশন ফেইলড! আরেকবার বলপয়েন্ট  কলমের নিবে বিষ মিশিয়ে পাঠানো হয়, সেটাও ব্যর্থ হয়।

ক্যাস্ত্রো রাষ্ট্রপ্রধান থাকার দীর্ঘ ৪৯ বছর সময়ের বড় একটা অংশ কিউবার সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান ছিলেন ফ্যাবিয়া এসকালেন্তে। তিনি একবার জানিয়েছিলেন, সিআইএ মোট ৬৩৮ বার ক্যাস্ত্রোকে মেরে ফেলার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল। এটা করতে সময় লাগে ১৫ বছর। পুরোটা চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

চ্যানেল ফোর এই ষড়যন্ত্রগুলো নিয়ে ‘৬৩৮ ওয়েজ টু কিল ক্যাস্ত্রো’ নামে একটি ডকুমেন্টারি বের করেছিল। সেটা ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার করা হয়।

ক্যাস্ত্রো আসলে ছিলেন আর সব নেতাদের থেকে আলাদা। এই মানুষটা না থাকলে হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকা আজো স্বাধীনতা পেত না, আজো রেহাই পেত না বর্ণবাদের হাত থেকে। তিনি বন্ধুত্বের গুরুত্ব দিতে জানতেন। তিনি প্রকাশ্যে নেলসন ম্যান্ডেলাকে ‘মাই প্রেসিডেন্ট’ বলে সম্বোধন করতেন।

১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) চতুর্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও কিউবা ছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাক্ষাৎ হয়। সে সময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান। এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম।’

তার সাহিত্য জ্ঞান ছিল অগাধ। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো বিশ্বখ্যাত লেখক তার লেখার খসড়া সবার আগে দেখাতেন ক্যাস্ত্রোকে। কারণ, তিনি ছিলেন ‘টপ ক্লাস’ সম্পাদক। দিনে কাজ করতেন ১৬-১৮ ঘণ্টা। সবার আগে অফিসে আসতেন, যেতেন সবার পরে।

ক্যাস্ত্রোর ছিল অসীম সাহস। পুঁচকে একটা দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধান হওয়ায় তিনি ‘কোল্ড ওয়ার’-এর ভোল পাল্টে ফেলেছিলেন। সাম্যবাদ ধারণার এত বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এর আগে আসেননি, সম্ভবত আর আসবেনও না।

লাল দুর্গের শেষ রাজা জীবনের শেষ দিন অবধি সিআইএকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গেছেন, শেষ হাসি পর্যন্ত সিআইএ’র বিপক্ষে তিনি হেসেছেন বিজয়ীর হাসি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।